সিলেটের গলার কাঁটা হাই-টেক পার্ক
- ১২ প্রতিষ্ঠান জায়গা-জমি বরাদ্দ নিলেও কোনোরকমে চলছে একটি
- বিপুল অর্থ ব্যয়ের পরও কাঙ্ক্ষিত সুফল মিলছে না

কথা ছিল অনেক কিছু হবে। তথ্যপ্রযুক্তি খাতে সূচিত হবে নতুন দিগন্তের। কর্মসংস্থান হবে অর্ধলক্ষাধিক মানুষের। পাঁচতারকা মানের হোটেল, আবাসন, স্কুল-কলেজ, হাসপাতাল, শপিং সেন্টারসহ ৪০টি স্থাপনা, সেবা প্রতিষ্ঠান এবং আরও কতকিছু। এখানের উৎপাদিত পণ্য ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলীয় সাত রাজ্যে বাজার ধরতে পারবে। অবশ্য সিলেট হাই-টেক পার্ক নিয়ে সেসব স্বপ্ন শুধু স্বপ্নই থেকে গেছে। কিছুই বাস্তবায়ন হয়নি। উল্টো অন্তর্বর্তী সরকার প্রকল্পটি বাতিল করে দিয়েছে। ৩২৪ কোটি টাকা ব্যয়ে গড়া অনেক সাধের সেই হাই-টেক পার্ক এখন সিলেটবাসীর গলার কাঁটায় পরিণত হয়েছে।
২০১৬ সালের ৮ মার্চ জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটির (একনেক) বৈঠকে প্রকল্পটির অনুমোদন হয়। ব্যয় ধরা হয় ৩৩৬ কোটি টাকা। ২০২১ সালের ১২ ডিসেম্বর সিলেটের কোম্পানীগঞ্জ উপজেলার বর্ণি এলাকায় ১৭২ একর জমি জুড়ে ৩২৪ কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মিত হাই-টেক পার্কের উদ্বোধন করেন তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। প্রকল্পের মেয়াদ শেষ হয় ২০২২ সালের ডিসেম্বরে। পরে ছয় মাস সময় বাড়িয়ে ২০২৩ সালের জুন পর্যন্ত করা হয়। অগ্রগতি কম হওয়ায় ২০২৪ সালের নভেম্বরে অন্তর্বর্তী সরকারের সময় প্রকল্পটি স্থগিত বা বাতিল ঘোষণা করার নীতিগত সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছিল।
অবশ্য সম্প্রতি প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান সফরকালে সিলেটে আইটি পার্ক চালুর আশ্বাস দিয়েছেন। এর আগে বাণিজ্যমন্ত্রী ও সিলেট-১ আসনের সংসদ সদস্য খন্দকার আব্দুল মুক্তাদির এবং প্রবাসী কল্যাণমন্ত্রী ও সিলেট-৪ আসনের সংসদ সদস্য আরিফুল হক চৌধুরীও হাই-টেক প্রকল্পটি চালু হবে বলে জানিয়েছেন।
এ প্রকল্প ঘিরে ছিল বিপুল প্রত্যাশা। কর্মসংস্থান, বিনিয়োগ এবং আঞ্চলিক অর্থনীতিতে গতি সঞ্চারের স্বপ্ন। কিন্তু দীর্ঘদিনেও কাঙ্ক্ষিত কার্যক্রম শুরু না হওয়া এবং প্রকল্প বাস্তবায়ন নিয়ে নানা প্রশ্ন ওঠায় এখন এ উদ্যোগ ঘিরে সৃষ্টি হয়েছে অনিশ্চয়তা।
প্রকল্পটি বাস্তবায়ন করছে বাংলাদেশ হাই-টেক পার্ক কর্তৃপক্ষ (বিএইচটিপিএ)। সংস্থাটির এক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা জানালেন, ‘অবকাঠামোগত কাজের বড় অংশ শেষ হয়েছে। তবে বিনিয়োগকারীদের কার্যক্রম শুরু এবং কিছু নীতিগত প্রক্রিয়া সম্পন্ন না হওয়ায় পার্কটি পুরোপুরি চালু করা সম্ভব হয়নি। প্রকল্পটি সচল করতে নতুন করে উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে।’
হাই-টেক পার্কটি নির্মাণের মাধ্যমে দেশে তথ্যপ্রযুক্তি শিল্পের বিকেন্দ্রীকরণ এবং সিলেট অঞ্চলে আইটি খাতের বিকাশ ত্বরান্বিত করার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছিল। পরিকল্পনা অনুযায়ী, এখানে দেশি-বিদেশি বিনিয়োগকারীদের জন্য আধুনিক অবকাঠামো, সফটওয়্যার উন্নয়ন কেন্দ্র, ডেটা সেন্টারসহ নানা সুবিধা গড়ে তোলার কথা ছিল। একই সঙ্গে সরাসরি ও পরোক্ষভাবে হাজার হাজার মানুষের কর্মসংস্থানের সম্ভাবনাও তুলে ধরা হয়েছিল।
তবে বাস্তব চিত্র ভিন্ন। স্থানীয়দের অভিযোগ, প্রকল্প এলাকায় অবকাঠামোর কিছু অংশ দৃশ্যমান হলেও পূর্ণাঙ্গ কার্যক্রম শুরু হয়নি। কোথাও ভবন নির্মাণ শেষ হলেও ব্যবহার নেই, কোথাও আবার কাজ অসম্পূর্ণ অবস্থায় পড়ে রয়েছে।
পার্কটি সচল করতে সরকারিভাবে একটি কমিটি গঠন করা হয়েছে বলে জানালেন সিলেট হাই-টেক পার্কের সহকারী পরিচালক এস এম আল মামুন। ২০২৪ সালের নভেম্বর নাগাদ এটি স্থগিত বা বাতিলের নীতিগত সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছিল। পরে ২০২৬ সালের জাতীয় নির্বাচনের পর সরকারকে প্রকল্পের অগ্রগতি ও অর্থায়ন পরিস্থিতি পর্যালোচনা করে কিছু পুনর্বিন্যাসের প্রস্তাব দেওয়া হয়। এদিকে, সম্ভাব্য বিনিয়োগকারীদের একটি অংশ এখনো কার্যক্রম শুরু করেনি। ফলে পার্কটি চালু হলেও তা পূর্ণ সক্ষমতায় পরিচালিত হবে কি না, এ নিয়েও রয়েছে সংশয়। খাতসংশ্লিষ্টরা বলছেন, শুধু অবকাঠামো নির্মাণ করলেই একটি হাই-টেক পার্ক সফল হয় না, প্রয়োজন কার্যকর নীতি, দক্ষ মানবসম্পদ এবং বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ।
বাংলাদেশ হাই-টেক পার্ক কর্তৃপক্ষের তথ্য অনুযায়ী, এ পর্যন্ত ৯টি প্রতিষ্ঠানকে মোট ৪৩ দশমিক ৮ একর জমি এবং তিনটি প্রতিষ্ঠানকে ৯ হাজার ১০ বর্গফুট জায়গা বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। কিন্তু এতগুলো প্রতিষ্ঠান জমি ও স্পেস বরাদ্দ নেওয়ার পরও কিছুটা তৎপর মাত্র একটি প্রতিষ্ঠান র্যাংগস ইলেকট্রনিকস, আর সেটিও চলছে কোনো রকমে।
এ বিষয়ে র্যাংগস ইলেকট্রনিকস লিমিটেডের এক কর্মকর্তা আগামীর সময়কে বললেন, ‘হাই-টেক কর্তৃপক্ষ আমাদের বলেছিল নিরাপত্তা, বিদ্যুৎ আর গ্যাস— এই তিনটি সুবিধা সবসময় নির্বিঘ্ন পাব। কিন্তু এখন পর্যন্ত এই তিনটির কোনোটিই নিরবচ্ছিন্নভাবে পাচ্ছি না। তবে পরিবেশ ও সুবিধা পুরোপুরি প্রস্তুত হলে আমরা বিনিয়োগ কার্যক্রম পুরোদমে শুরু করার পরিকল্পনা করছি।’
স্থানীয় তরুণদের মধ্যেও হতাশা স্পষ্ট। অনেকেই আশা করেছিলেন, এই পার্কের মাধ্যমে আইটি খাতে কাজের সুযোগ তৈরি হবে, রাজধানীমুখী চাপ কমবে। কিন্তু দীর্ঘসূত্রতা এবং অনিশ্চয়তায় সে স্বপ্ন ঝুলে আছে এখন।
তবে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান গত ২ মে সিলেট সফর করেন। সেদিন সিলেটবাসীর উদ্দেশে তিনি বলেছিলেন, ‘সিলেটে একটি আইটি পার্ক করা হয়েছিল, তবে পার্কটি সেভাবে সচল নেই। এটি নিয়ে এরই মধ্যে আলোচনা হয়েছে। সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় এ নিয়ে কাজ করছে। আমি আত্মবিশ্বাসী, ইনশাআল্লাহ দ্রুততম সময়ের মধ্যে আমরা এটি চালু করতে সক্ষম হব।’
শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক মো. ফরহাদ রাব্বি জানালেন, ‘হাই-টেক পার্ক সফল করতে হলে দক্ষ জনবল, নিরবচ্ছিন্ন নীতি-সহায়তা এবং বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ নিশ্চিত করতে হয়। এসবের ঘাটতি থাকলে অবকাঠামো অব্যবহৃত থেকে যায়।’
তার মতে, দেশের বিভিন্ন স্থানে গড়ে ওঠা বড় উন্নয়ন প্রকল্পগুলোর মতো এ হাই-টেক পার্কের ক্ষেত্রেও পরিকল্পনা ও বাস্তবায়নের মধ্যে ফাঁক স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। সময়মতো সিদ্ধান্ত, স্বচ্ছতা এবং জবাবদিহি নিশ্চিত না হলে এ ধরনের প্রকল্প পারে না কাঙ্ক্ষিত ফল দিতে।
সিলেট চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির সাবেক সভাপতি খন্দকার শিপার আহমদ বললেন, ‘বর্তমানে এটি ভুতুড়ে ঘরে পরিণত হয়েছে। এটা এখন অনেকটা গলার কাঁটা হয়ে দাঁড়িয়েছে। না পারছি গিলতে, না পারছি উগরাতে।’ তিনি মনে করেন, প্রকল্পটি বাস্তবায়ন হওয়া দরকার। এটি বাস্তবায়িত হলে বৃহত্তর সিলেটের ব্যবসায়ীরা উপকৃত হবেন। হবে তরুণদের কর্মসংস্থান।




