টাঙ্গাইলে সড়ক দুর্ঘটনা
এখন প্যান্ট-শার্ট লাগবে না, তোমাকে লাগবে বাবা— ছেলের আর্তনাদ

ছবি: আগামীর সময়
ঈদ উদযাপনে চট্টগ্রামের হালিশহর থেকে অন্য অনেকের সঙ্গে উত্তরাঞ্চলে বাড়ি ফিরছিলেন তুহিন ও তার বাবা। কম খরচে বাড়ি ফিরতে চেয়েছিলেন তারা।
এই চাওয়াটাই হলো কাল। আজ সোমবার ঢাকা-টাঙ্গাইল-যমুনা সেতু মহাসড়কে তাদের বহন করা রডবোঝাই ট্রাকটি দুর্ঘটনায় পড়লে নিহত হন ১৫ জন। নিহতদের মধ্যে রয়েছে তুহিনের বাবাও।
বাবাকে হারিয়ে পাগলের মতো হয়ে গেছেন তুহিন। কান্নাজড়িত কণ্ঠে তিনি বলেছেন, ‘বাবা তুমি না আমাকে বাড়িতে নিয়ে প্যান্ট-শার্ট কিনে দেবে! এখন আমার প্যান্ট-শার্ট লাগবে না, লাগবে বাবা তোমাকে।’
চট্টগ্রামে হকার ছিলেন তুহিন ও তার বাবা। ট্রাকে বাবার কোলে মাথা রেখেই ঘুমাচ্ছিলেন আনুমানিক ২৪-২৫ বছর বয়সী এই যুবক। ঘুম থেকে উঠেই দেখেন হয়ে গেছে সর্বনাশ। বাবা আর নেই। ‘তোমাকে আমি কোথায় পাব।’
হতাশা গ্রাস করেছে বাড়ি ফেরার জন্য উদগ্রীব হয়ে থাকা এ যুবককে। নিজেকে ভাবছেন দোষী। বললেন, ‘আগে কেন ঘুম থেকে জাগনা পেলাম না। ঘুম থেকে জেগে দেখলাম তোমার (বাবা) শরীর ট্রাকে আটকা। ট্রাকটিও উল্টে পড়ে গেছে খাদে। যদিও আমি বেঁচে গেলাম। আমার আব্বুর বডি ট্রাকের মধ্যেই আটকা পড়েছিল।’
তুহিনের অভিযোগ, উদ্ধারকর্মীরা এসেছেন দুর্ঘটনা ঘটার প্রায় তিন ঘণ্টা পর। তাৎক্ষণিক উদ্ধারকর্মীরা ঘটনাস্থলে এলে আরও কয়েকজনকে বাঁচানো সম্ভব হতো, হয়তো।
এই যুবক জানালেন, তাদের বাড়ি চাঁপাইনবাবগঞ্জের শিবগঞ্জে। তার বাবার নাম নজরুল ইসলাম। ঈদে কম খরচে বাড়ি যেতে রডবোঝাই ট্রাকে ওঠেন চট্টগ্রামের হালিশহর থেকে।
‘সেখান থেকে উঠেছি আমরা আটজন যাত্রী। এ ছাড়া ফেনী থেকে উঠেছিল ১৯ জন। আমরা সবাই চাঁপাইনবাবগঞ্জ ও রাজশাহীর যাত্রী ছিলাম।’
চট্টগ্রাম থেকে চাঁপাইনবাবগঞ্জের নন এসি বাস ভাড়া প্রায় এক হাজার ৬০০ টাকা। তুহিন জানান, চট্টগ্রাম থেকে তারা চারজন রডবোঝাই ট্রাকে উঠেছিলেন ২৩০০ টাকা চুক্তিতে। সেখান থেকে ওঠা আরও কয়েকজন এবং ফেনীর যাত্রীরা কত ভাড়ায় চুক্তিবদ্ধ হয়েছিলেন তা জানা নেই তার।
হয়তো তারাও চুক্তিবদ্ধ হয়েছিলেন কম ভাড়ায়। অর্থাৎ গড়ে এক হাজার টাকা বাঁচাতে গিয়ে দুনিয়ার যাত্র শেষ হলো ১৫ জনের।
ভোর সাড়ে ৪টার দিকে উত্তরবঙ্গগামী লেনে টাঙ্গাইলের কালিহাতী উপজেলার সরাতৈল এলাকায় রডবোঝাই ট্রাকটি নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে পড়ে যায় মহাসড়কের পাশে খাদে। এতেই ঘটেছে হতাহতের এ ঘটনা। আহতদের ভর্তি করা হয়েছে টাঙ্গাইল জেনারেল হাসপাতালে।
স্থানীয় এবং পুলিশ সূত্রে জানা যায়, দুর্ঘটনার সময় অধিকাংশ যাত্রী ঘুমিয়ে থাকায় হতাহতের সংখ্যা বেশি হয়েছে বলে ধারণা করা হচ্ছে। ট্রাকটি খাদে পড়ে দুমড়েমুচড়ে গেলে ঘটনাস্থলেই হয় অনেকের মৃত্যু।
দুর্ঘটনার খবর পেয়ে এলেঙ্গা ফায়ার সার্ভিস, যমুনা সেতু পূর্ব থানা-পুলিশ ও যমুনা সেতু কর্তৃপক্ষের সদস্যরা দ্রুত ঘটনাস্থলে পৌঁছে শুরু করেন উদ্ধার অভিযান। পরে ১৫ জনের মরদেহ উদ্ধার করা হয় ঘটনাস্থল থেকে।
উদ্ধারকাজের কারণে ভোর প্রায় সাড়ে ৫টা পর্যন্ত মহাসড়কের ঢাকামুখী লেনে বন্ধ ছিল যান চলাচল। পরে ভূঞাপুর লিংক রোড দিয়ে ঢাকাগামী এবং পুরাতন সড়ক ব্যবহার করে উত্তরবঙ্গগামী যানবাহন চলাচলের ব্যবস্থা করা হলে স্বাভাবিক হতে শুরু করে পরিস্থিতি।
যমুনা সেতু পূর্ব থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা খন্দকার ফুয়াদ রুহানি বলেছেন, বর্তমানে মহাসড়কে যান চলাচল আগের তুলনায় স্বাভাবিক রয়েছে। উদ্ধার অভিযান শেষ হয়েছে এবং এ ঘটনায় প্রয়োজনীয় আইনগত প্রক্রিয়া চলমান।
দুর্ঘটনার খবর পেয়ে টাঙ্গাইলের পুলিশ সুপার ঘটনাস্থলে উপস্থিত হয়ে তদারকি করেন উদ্ধার কার্যক্রম। পুলিশের প্রাথমিক ধারণা, চালক নিয়ন্ত্রণ হারানোর কারণেই ঘটেছে এ দুর্ঘটনা।







