উলিপুর
অনিশ্চয়তা-অভাব আর নিঃসঙ্গতায় দিন কাটছে আলেকজনের

চর বজরাটারী পাড়ার আলেকজন বেওয়ার (৫৬)
স্বামী-সন্তান ও স্বজনদের কাছ থেকে বিচ্ছিন্ন। মাথা গোঁজার ঠাঁই বলতে তিস্তা নদীঘেঁষা ওয়াপদা বাঁধের স্লোপে একটি ভাঙাচোরা টিনের ছাপরা। পেলে খান, না পেলে উপোস থাকেন। ঝড়-বৃষ্টিতে ঘর কাঁপে, প্রচণ্ড গরমে টিনের ছাপরায় থাকা দায়। এমনই চরম অনিশ্চয়তা, অভাব আর নিঃসঙ্গতায় দিন কাটছে কুড়িগ্রামের উলিপুরের বজরা ইউনিয়নের চর বজরাটারী পাড়ার আলেকজন বেওয়ার (৫৬)।
জানা গেছে, প্রায় দুই দশক ধরে ভিক্ষাবৃত্তি করে কোনোভাবে জীবনধারণ করছেন তিনি। তিস্তার ভাঙনে হারিয়েছেন ভিটেমাটি। হারিয়েছেন স্বজনদের আশ্রয়ও। বিবাহিত তিন মেয়ে ঢাকায় স্বামী-সন্তান নিয়ে বসবাস করলেও মায়ের কোনো খোঁজখবর রাখেন না। অথচ দীর্ঘদিন ধরে এমন অসহায় অবস্থায় থাকলেও এখনো মেলেনি বয়স্ক বা বিধবা ভাতাসহ কোনো সামাজিক নিরাপত্তা সহায়তা।
সরেজমিনে চর বজরাটারীপাড়ায় গিয়ে দেখা যায়, ওয়াপদা বাঁধের পাশে খাসজমিতে বাঁশ ও টিন দিয়ে তৈরি ছোট্ট একটি ছাপরায় বসবাস করছেন আলেকজন। ঘরের ভেতর কুড়িয়ে পাওয়া নানা জিনিসপত্রে ঠাসা। নড়াচড়া করার মতো জায়গাও খুবই কম। এক পাশে লাকড়ি রাখার মাচা, অন্য পাশে তিন পায়ার একটি চৌকি। বাঁশ দিয়ে কোনো রকমে ঠেস দিয়ে রাখা হয়েছে চৌকি ও টিনের চালা। চারদিকে টিন দিয়ে ঘেরা ঘরটিতে প্রচণ্ড গরমে অবস্থান করাই কঠিন হয়ে পড়ে। আর ঝোড়ো বাতাস উঠলে টিনের চালা দুলতে থাকে। তখন আতঙ্কে ঘর ছেড়ে অন্যের বাড়িতে আশ্রয় নিতে হয় তাকে। দিনের বেলা বাইরে কোথাও বসে থাকলেও রাত নামলেই শুরু হয় তার দুশ্চিন্তা।
স্থানীয়দের অভিযোগ, আলেকজনের অসহায়ত্বের কথা জনপ্রতিনিধি ও গ্রামের মানুষের জানা থাকলেও কার্যকর সরকারি সহায়তা তার কাছে পৌঁছায়নি। এনআইডি না থাকায় সরকারি ভাতার তালিকায়ও অন্তর্ভুক্ত হতে পারেননি তিনি। আলেকজনের এখন একমাত্র ভরসা মানুষের সহানুভূতি। সরকারি সামাজিক নিরাপত্তার আওতায় দ্রুত তাকে অন্তর্ভুক্ত করে একটি নিরাপদ আশ্রয়ের ব্যবস্থা করার দাবি স্থানীয়দের।
আলেকজন জানালেন, প্রায় ২০ বছর আগে স্বামী তাকে মৌখিকভাবে তালাক দিয়ে বাড়ি থেকে বের করে দেন। এর আগে দিনাজপুর শহরের বিদ্যুৎ অফিসের পাশের একটি বস্তিতে তাদের বিয়ে হয়েছিল। সংসারে জন্ম নেয় তিন কন্যাসন্তান। মেয়েরা বড় হয়ে ঢাকায় গিয়ে গার্মেন্টে চাকরি শুরু করেন এবং সেখানেই তাদের বিয়ে হয়।
আলেকজনের ভাষ্য, ছেলেসন্তান জন্ম দিতে না পারায় তার স্বামী আরেকটি বিয়ে করেন। এরপর তাকে বাড়ি থেকে বের করে দেওয়া হয়। কিছুদিন মেয়েদের কাছে ঢাকায় থাকলেও একপর্যায়ে তারাও মায়ের কাছ থেকে মুখ ফিরিয়ে নেন বলে অভিযোগ তার। বাধ্য হয়ে ঢাকার পাট চুকিয়ে গ্রামে ফিরে আসেন তিনি।
গ্রামে ফিরে আত্মীয়স্বজনদের কাছে আশ্রয়ের চেষ্টা করেও ব্যর্থ হন আলেকজন। তারাও তাকে নিজেদের জন্য বোঝা মনে করে দূরে সরিয়ে দেন বলে জানালেন তিনি। পরে তিস্তার ভাঙনে ভিটেমাটিও হারিয়ে ওয়াপদা বাঁধের পাশে খাসজমিতে ঠাঁই হয় তার। এরপর থেকেই ভিক্ষাবৃত্তি করে চলছে তার জীবন। নিজের দুর্বিষহ জীবনের কথা বলতে গিয়ে চোখের পানি ধরে রাখতে পারেননি আলেকজন।
স্থানীয় আঞ্চলিক ভাষায় তিনি বলেছেন, ‘প্রথমে বাপে, তারপর ছাওয়ারা মোক ঘর থাকি বাইর করি দিলে। এটে ভাই-ভাবীরাও নিলে না। মুই এলা কোটে যাং?’
স্থানীয় আব্দুর রশিদ বলেছেন, ‘মহিলাটা খুব কষ্টে আছে। ঘর-দুয়ার নাই, শুধু একটা চালা। ঝড়-বৃষ্টি আর বাতাস হলে দৌড়াদৌড়ি করে অন্যের বাড়িতে যায়। দিনের বেলা বাইরে থাকে। রাত হলে খুব কষ্ট হয়। গরমেও থাকা যায় না।’
রুপালি বেগম বলেছেন, ‘মহিলার কপালটা খুবই খারাপ। ভাইয়েরা নেয় না, বেটিরাও নেয় না। স্বামী তো তালাক দিয়ে বের করে দিয়েছে। তার আইডি কার্ডও ছিঁড়ে ফেলাইছে। ফলে বয়স্ক ভাতা বা সরকারি কোনো ভাতাই পায় না।’
আলেকজনের ভাতিজা সাইফুল ইসলাম বলেছেন, ‘আমার ফুপু ৬-৭ বার নদীভাঙনের শিকার হয়েছে। তার বাপ-মা মারা গেছেন। ভাইয়েরা আছে, তারাও দিনমজুরি করে খায়। গ্রামের লোকজন চাঁদা তুলে একটা টিনের চালা করে দিয়েছে। ভিক্ষা করে যা পায়, তা দিয়েই চলে। এখন আপনারা যদি সহযোগিতা করেন, তাহলে আমার ফুপুর খুব উপকার হবে।’
এ বিষয়ে উপজেলা সমাজসেবা কর্মকর্তা লুৎফর রহমান জানালেন, ওই নারীর কোনো এনআইডি কার্ড নেই। সংশ্লিষ্ট ওয়ার্ডের মেম্বারকে বলা হয়েছে, তিনি নির্বাচন অফিসের মাধ্যমে এনআইডি কার্ডের ব্যবস্থা করবেন। এনআইডি হলে তাকে সামাজিক নিরাপত্তা বেষ্টনীর আওতায় বিধবা ভাতার অন্তর্ভুক্ত করা সম্ভব হবে।
উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা এ টি এম আরিফ জানালেন, খোঁজখবর নিয়ে ওই নারীর নিরাপদ বাসস্থানসহ প্রয়োজনীয় সহযোগিতা করা হবে।




