বন্দরে বোনাস বিলাস: ১১৭ কোটি টাকা পকেটে ভরার আয়োজন

গ্রাফিকস: আগামীর সময়
এক রেকর্ডকে দুবার দেখিয়ে দুটি ‘উৎসাহ বোনাস’ দেওয়ার নজিরবিহীন এক নজির গড়েছে চট্টগ্রাম বন্দর। ২০২৫ সালে কনটেইনার ওঠানামার রেকর্ড গড়ার খুশিতে একবার ‘ক্যালেন্ডার বছর’ (জানুয়ারি-ডিসেম্বর) হিসাবে প্রত্যেকে এক লাখ টাকা করে উৎসাহ বোনাস নিয়েছেন। একই রেকর্ডের খুশিতে এখন ‘অর্থবছর’ (জুলাই-জুন) দেখিয়ে দেড় লাখ টাকা করে নিতে অনুমোদন দিয়েছে বন্দর বোর্ড। নৌপরিবহন মন্ত্রণালয়ে ফাইল চূড়ান্ত অনুমোদনের অপেক্ষায়। অনুমোদন হলে চট্টগ্রাম বন্দরের ১৩৮ বছরের ইতিহাসে অনিয়মেরও রেকর্ড গড়বে।
বন্দরে বর্তমানে স্থায়ী কর্মরত কর্মকর্তা-কর্মচারীর সংখ্যা সাড়ে চার হাজার। নৌপরিবহন মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তা-কর্মচারী প্রায় ২০০ জনকে এর অন্তর্ভুক্ত করা হয়। মন্ত্রণালয়ের সচিব থেকে শুরু করে পিয়ন পর্যন্ত এবং বন্দরের চেয়ারম্যান-পিয়ন মিলে ৪ হাজার ৭০০ কর্মকর্তা-কর্মচারীর প্রত্যেককে এক লাখ টাকা করে বন্দর তহবিল থেকে দেওয়া হয়। গত মার্চে এ খাতে ৪৭ কোটি টাকার বেশি ব্যয় হয়েছিল।
এখন আবার একইভাবে প্রত্যেককে দেড় লাখ টাকা করে দেওয়ার প্রস্তাব করা হয়েছে। এতে ব্যয় হবে ৭০ কোটি টাকা। অর্থাৎ এক বছরে উৎসাহ বোনাস বাবদ ব্যয় হবে প্রায় ১১৭ কোটি টাকা। প্রতি বছর যদি এভাবে কনটেইনার ওঠানামার রেকর্ড হতে থাকে, তাহলে নিয়মনীতি ছাড়াই প্রতিবার এতগুলো টাকা বন্দর দিতে থাকবে? এটি এখন দেশের বন্দর ব্যবস্থাপনার ক্ষেত্রে এক বড় প্রশ্ন হয়ে দেখা দিয়েছে।
উল্লেখ করা প্রয়োজন, গত অর্থবছরে চট্টগ্রাম বন্দর মোট আয় করে সাড়ে ৫ হাজার কোটি। পরিচালন ব্যয়সহ বিভিন্ন খরচ বাদ দিয়ে নিট মুনাফা ৩ হাজার ১৪২ কোটি টাকা।
২০২৫ সালে চট্টগ্রাম বন্দর কনটেইনার ওঠানামার রেকর্ড গড়ে। আগের বছরের চেয়ে ৪ শতাংশ প্রবৃদ্ধি হয়েছে। আর ২০২৫-২৬ (জুলাই-জুন) অর্থবছরে কনটেইনার ওঠানামা করেছে সাড়ে ৬ শতাংশের বেশি। ক্যালেন্ডার বছর শুরু হয় জানুয়ারি-ডিসেম্বর দিয়ে। আর অর্থবছর শুরু হয় জুলাই-জুন দিয়ে। কনটেইনার ওঠানামার হিসাব হয় মাসভিত্তিক। ফলে একই পণ্যের হিসাব দুবার দেখিয়ে দুটি বোনাস নেওয়া বড়সড় অনিয়ম।
একই সঙ্গে তিন বছর ধরে চট্টগ্রাম বন্দরে কনটেইনার ওঠানামা ৪ থেকে ৫ শতাংশের মধ্যেই সীমাবদ্ধ রয়েছে। লয়েডস লিস্টে বিশ্বের ১০০ শীর্ষ কনটেইনার সমুদ্রবন্দরের সর্বশেষ তালিকায় চট্টগ্রাম বন্দর এখন আগের বছরের মতোই ৬৮তম অবস্থানে। তালিকায় এগোয়নি একধাপও। যে বছর দুটি উৎসাহ বোনাস নেওয়ার এত আয়োজন, সে বছর চট্টগ্রাম বন্দরে কনটেইনার হ্যান্ডলিং হয়েছে ৩২ লাখ ৫৭ হাজার। প্রবৃদ্ধি বছর ব্যবধানে না বাড়লেও উৎসাহ বোনাসের প্রবৃদ্ধি কিন্তু ঠিকই বেড়েছে।
কিন্তু মজার বিষয় হলো, চট্টগ্রাম বন্দরে ২০২১ সালে এর চেয়েও দ্বিগুণ, অর্থাৎ সাড়ে ১৩ শতাংশ প্রবৃদ্ধি (৩২ লাখ কনটেইনার) হয়েছিল। তখন এ ধরনের উৎসাহ বোনাস দেওয়া হয়নি কাউকে। নাম প্রকাশ না করার শর্তে সাবেক এক বন্দর চেয়ারম্যান বললেন, ‘পণ্য ওঠানামার ক্ষেত্রে প্রতি বছর টার্গেট ঠিক করা হয়। লক্ষ্যমাত্রা পূরণ হলে দুই বা আড়াইটা অতিরিক্ত বোনাস পেয়ে থাকে প্রত্যেকে। কিন্তু এভাবে জনগণের টাকা খরচ করার কোনো নিয়ম নেই। মন্ত্রণালয়ের পিয়ন কীভাবে টাকা পাবে? ওদের কি মাথা খারাপ হয়ে গেছে?’
একই রেকর্ড দুভাবে দেখিয়ে দুই উৎসাহ বোনাস দেওয়া অনিয়ম কি না— সরাসরি জবাব এড়িয়ে চট্টগ্রাম বন্দর মুখপাত্র সৈয়দ রেফায়েত হামিম বললেন, ‘এখনো তো দুটি পাইনি। একটি পেয়েছি। আরেকটি মন্ত্রণালয়ের অনুমোদনের অপেক্ষায়। মন্ত্রণালয় মনে করলে সেটি ছয় মাসের জন্যও দিতে পারে।’
নৌপরিবহন মন্ত্রণালয় সচিব জাকারিয়া বলেছেন, ‘মুনাফা বেশি করলে প্রণোদনা দিতে সমস্যা নেই; কিন্তু সেটা নিয়মের ভিত্তিতে হতে হবে। আমরা এমন একটা নিয়ম করতে চাই, যেটা মন্ত্রণালয়ের সব প্রতিষ্ঠান অনুসরণ করবে। ইচ্ছামতো প্রণোদনা বোনাস নেওয়ার সুযোগ থাকবে না। সেজন্য চট্টগ্রাম বন্দরের প্রস্তাব বিবেচনায় আছে।’
চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষের তত্ত্বাবধায়ক ও নিয়ন্ত্রক সংস্থা হলো নৌপরিবহন মন্ত্রণালয়। যার হাতে বন্দরের কর্মক্ষমতা মূল্যায়ন, নীতিনির্ধারণ এবং হাজার হাজার কোটি টাকার বাজেট অনুমোদনের মতো গুরুত্বপূর্ণ ক্ষমতা ন্যস্ত থাকে। এমন প্রেক্ষাপটে বন্দর কর্তৃপক্ষ যদি তার নিয়ন্ত্রক মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তাদের সরাসরি আর্থিক সুবিধা প্রদান করে, তাহলে ভবিষ্যতে মন্ত্রণালয়ের নিরপেক্ষ তদারকি ক্ষমতা, জবাবদিহি এবং সমালোচনামূলক মূল্যায়নের সক্ষমতা প্রশ্নবিদ্ধ হবে। এটা সরাসরি স্বার্থের সংঘাত।
দুদকের সাবেক মহাপরিচালক ও চট্টগ্রাম বন্দরের সাবেক ম্যাজিস্ট্রেট মুনীর চৌধুরী জানালেন, এ ধরনের কাজ অযৌক্তিক ও অনৈতিক। মন্ত্রণালয় হচ্ছে নীতিনির্ধারণী কর্তৃপক্ষ। বন্দরের কর্মচারীদের প্রাপ্য অংশ কোনোভাবেই মন্ত্রণালয় পাবে না। এসব কাজের জন্য ভবিষ্যতে অবধারিতভাবে অডিট আপত্তির মুখোমুখি হতে হবে। এই টাকা অবশ্যই কর্মকর্তাদের ফেরত দিতে হবে। এটা সরকারি প্রতিষ্ঠানের জন্যও খারাপ নজির হয়ে থাকবে।
কনটেইনার ওঠানামার রেকর্ড গড়লে জেটি, টার্মিনাল ও বহির্নোঙরে জাহাজ থেকে পণ্য ওঠানামায় সরাসরি জড়িত শ্রমিকদের প্রণোদনা বা বোনাস দেয় বন্দর। এই শ্রমিকদের নিয়োগ ও বেতন দেয় বন্দরের বেসরকারি ৪৫ অপারেটর। তাদের যে বোনাস দেওয়া হয়, সেটি বন্দরের কল্যাণ তহবিল থেকে। বেসরকারি অপারেটর নিয়োগের চুক্তিতে শ্রমিকদের প্রণোদনার টাকা আলাদা করে কল্যাণ তহবিলে রাখা হয়। এই টাকার পুরোটাই দেয় বেসরকারি অপারেটররা। বন্দরের নিজস্ব ফান্ড বা তহবিল থেকে সে ব্যয় মেটানো হয় না।
২০২৫ সালের কনটেইনার ওঠানামার প্রবৃদ্ধির জন্য তাদের প্রণোদনার জনপ্রতি ২৫ হাজার টাকার চেক দেওয়া শুরু হয়েছে গত মঙ্গলবার থেকে। রেকর্ডের আট মাস পর এসব বন্দর শ্রমিকদের প্রণোদনা দিচ্ছে। অথচ বন্দরের নিজস্ব কর্মকর্তা-কর্মচারীদের প্রণোদনা দেওয়া হয়েছে ছয় মাস আগে মার্চে। অর্থাৎ পণ্য ওঠানামার কাজে যেসব বেসরকারি শ্রমিক সরাসরি সংযুক্ত থাকে, তাদের বঞ্চিত করার একটি প্রবণতা এ ঘটনায় প্রতিভাত হচ্ছে বলে মত দিয়েছেন বন্দর ব্যবহারকারীরা।
চট্টগ্রাম চেম্বারের সভাপতি আমিরুল হক বিস্ময় প্রকাশ করে বললেন, ‘গৌরী সেনের টাকার ভাগবাটোয়ারা। একদিকে সরকার বলছে আর্থিক সংকট, অন্যদিকে এভাবে নয়ছয়। এক মন্ত্রণালয় যদি উৎসাহ বোনাস পায়, বাকি মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তা-কর্মচারীরা কেন পাবে না? আর যেসব আমদানি-রপ্তানিকারকের জন্য এ রেকর্ড হলো, তাদের জন্য তো কোনো প্রণোদনা নেই।’





