হাম
ছোট্ট তানহার জন্য শেষ অপেক্ষায় বাবা-মা

চমেকের আইসিইউর বাইরে অপেক্ষায় তানহার বাবা আবুল কালাম ও স্বজনরা। হাম আক্রান্ত ছোট্ট তানহা ভেতরে মৃত্যুর সঙ্গে লড়ছে। ছবি: আগামীর সময়
বাঁশখালীর কৃষক আবুল কালাম ও তার বড় মেয়ে শিশুদের নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্রের (আইসিইউ) সামনে বিমর্ষ মুখে বসে আছেন। মন খারাপ কেন, জিজ্ঞেস করতেই কেঁদে ফেললেন কালাম। বললেন, ‘ছোট মেয়ে তানহা আইসিইউতে। ডাক্তার বলেছেন শেষ দেখা দেখে আসতে। আর বাঁচার সম্ভাবনা নেই। ভেতরে গিয়ে দেখে এসেছি।’
কালাম বসে বসে কাঁদছেন। মেয়ের চোখেও জল। পাশে বসা তাদের এক স্বজনও বিষণ্ন। আইসিইউ ইউনিটের ভেতরে এক বছরের তানহার পাশে মা রুনা বেগমের অপেক্ষা। মেয়েটি হাম উপসর্গে ভুগছিল। এক সপ্তাহ আগে হাসপাতালে আসে। তিন দিন ধরে আইসিইউতে।
আজ মঙ্গলবার দুপুর দেড়টায় তাদের সঙ্গে কথা হয়। পাশে শিশু স্বাস্থ্য বিভাগের হাম ব্লক। একই সময়ে সেখানে চিকিৎসাধীন নোয়াখালীর মাইজদী এলাকার ১০ মাসের তামিম। তারও আইসিইউ দরকার বলে এক দিন আগে জানিয়েছিলেন চিকিৎসক। খালি না থাকায় ওয়ার্ডেই অক্সিজেন লাইন দিয়ে চিকিৎসা দেওয়া হচ্ছে। তামিমের বাবা হানিফ জানালেন, আইসিইউর কথা বলছিল। কিন্তু খালি নেই, দিতে পারেনি।’
শুধু তামিম নয়, হাম উপসর্গ নিয়ে চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ (চমেক) হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অনেক শিশুরই আইসিইউ প্রয়োজন। এই সংখ্যা কখনো ১০, কখনো বা ১৫ জন। তাদের অপেক্ষায় থাকতে হয় আইসিইউ শয্যার জন্য। ১৫ শয্যার স্বতন্ত্র আইসিইউ ইউনিটের একটি শয্যা কখন খালি হবে, এমন প্রহর গুনতে থাকেন অভিভাবকরা।
হাসপাতালটির নিচতলায় হাম বিভাগ, শিশু স্বাস্থ্য ওয়ার্ড ও আইসিইউ মিলে মঙ্গলবার ১১২ জন হাম উপসর্গের রোগী ছিল। স্বল্প আয়ের এসব লোকজনের সামর্থ্য নেই বেসরকারি আইসিইউতে সন্তানকে নিয়ে যাওয়ার। সরকারি এই হাসপাতালই তাদের কাছে উন্নত চিকিৎসার শেষ ঠিকানা, আশা-ভরসার বাতিঘর। তারা চেয়ে থাকেন, কখন ১৫ শয্যার একটি খালি হবে।
হাসপাতালের পরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মোহাম্মদ তসলিম উদ্দিন বললেন, ‘শতাধিক হাম উপসর্গের রোগী চিকিৎসা নিচ্ছে। শিশুদের ১৫টি আইসিইউ সব সময় ভর্তি থাকে। আরও কিছু রোগী আইসিইউর জন্য অপেক্ষায় থাকে। তাদের তখন ওয়ার্ডেই হাই-ফ্লো ন্যাজাল ক্যানোলা দিয়ে অক্সিজেন দেওয়া হয়। উপায় নেই। ৪১টি হাই-ফ্লো রয়েছে।’
চমেকে এখন পর্যন্ত সহস্রাধিক হাম উপসর্গের রোগীকে চিকিৎসা দেওয়া হয়েছে। এর মধ্যে নিশ্চিত হাম ও উপসর্গে মারা গেছে প্রায় ৩৫ জন। আইসিইউতে যেসব রোগী যায়, তাদের অবস্থাই গুরুতর থাকে। সঠিক সময়ে আইসিইউ না পেলে জটিলতা আরও বেড়ে যায়।
যেমন- আনোয়ারার তেকোটা এলাকার মো. শওকত ১০ দিন ধরে সাড়ে তিন মাস বয়সী মেয়ে সাবিহাকে নিয়ে যুদ্ধ করছেন। তিন দিন আগে তাকে আইসিইউতে দেওয়া হয়। শওকত জানালেন, হাম উপসর্গে ভোগা সাবিহাকে শিশু স্বাস্থ্য বিভাগ থেকে আইসিইউতে নিতে বলা হয়েছিল। কিন্তু আইসিইউর জন্য এক দিন অপেক্ষা করতে হয়। এখন মেয়ের অবস্থা আরও জটিল।
শওকতের সঙ্গে কথা হচ্ছিল আইসিইউ ইউনিটের দরজার পাশে ৮ নম্বর ওয়ার্ডের ভেতরে। তার পাশে মেঝেতে গড়াগড়ি দিচ্ছিলেন খাগড়াছড়ির নুরুন্নবী। এই সিএনজি অটোরিকশাচালকের চার মাস বয়সী ছেলে নাহিদের খিঁচুনি হয়েছে। দুই মেয়ের পর নাহিদের জন্ম। তাকে সোমবার রাতে ৮ নম্বর ওয়ার্ডে (হাম ছাড়া অন্যান্য রোগের বিভাগ) ভর্তি করা হয়। অক্সিজেন দেওয়া হয়েছে।
চিকিৎসক জানিয়েছেন, আইসিইউ লাগবে। কিন্তু শিশুদের অন্যান্য রোগের জন্য বরাদ্দ পাঁচটি আইসিইউ শয্যার একটিও খালি নেই।
একজন চিকিৎসক জানালেন, হামের জন্য ১৫টি আইসিইউ শয্যা আলাদা করা হয়েছে। ফলে অন্যান্য রোগাক্রান্ত শিশুর জন্য আইসিইউ কমে গেছে। হামের কয়েকজন রোগী এখনো আইসিইউর জন্য অপেক্ষা করছে। কাউকে তো সিট থেকে নামিয়ে দেওয়া যাবে না। তাই অপেক্ষা।
বিকেল সাড়ে ৪টার দিকে কালামের স্ত্রী রুনার সঙ্গে মুঠোফোনে কথা হয়। তিনি তখনো আইসিইউর ভেতরে মেয়ে তানহার পাশে। বললেন, ‘ডাক্তার বলে দিয়েছেন বাঁচানো যাবে না। এখন দুপুরের চেয়ে আরও খারাপ। কেবল ছটফট করছে মেয়ে।’
এই একটি শয্যা খালি হলে হাম উপসর্গে ভোগা গুরুতর অবস্থায় অপেক্ষমাণ আরেকজন শিশুকে সেখানে ওঠানো হবে—জীবন বাঁচানোর শেষ চেষ্টায়।




