‘এখানে পাহাড়ধস হয় না’
- পাহাড়ধসে প্রাণহানির ঘটনা ঘটে প্রায় প্রতিবছর
- সতর্কবার্তা কানে তুলছেন না বাসিন্দারা

ছবি: আগামীর সময়
প্রতি বর্ষা মৌসুমে পাহাড়ের ঝুঁকিপূর্ণ বসতি নিয়ে শুরু হয় তোড়জোড়। এবার কালবৈশাখী মৌসুমেই পাহাড়ধসের ঝুঁকি দেখা দিল। টানা বৃষ্টির কারণে আবহাওয়া অধিদপ্তর জারি করেছে পাহাড়ধসের সতর্কবার্তা। তবে তা নিয়ে প্রশাসনের খুব বেশি হেলদোল রয়েছে বলে মনে হলো না। বৃষ্টি মাথায় দিব্যি আছে নগরের পাহাড়ের নিচে বসবাসকারী লোকজন। তাদের এক আওয়াজ, ‘এখানে পাহাড়ধস হবে না’।
পাহাড় ব্যবস্থাপনা কমিটির প্রতিটি সভায় কথা হয় অবৈধ বসতি উচ্ছেদের। সিদ্ধান্ত হয় সেবা সংযোগ বিচ্ছিন্ন করার। এগুলো আবার চাপা পড়ে যায় অদৃশ্য ইশারায়। ফলে দিব্যি বসবাস করেন নিম্ন আয়ের লোকজন। পাহাড়ধসে প্রাণহানির ঘটনাও ঘটে প্রায় প্রতিবছর। এ কারণে মঙ্গলবার সকালে চট্টগ্রামসহ পাঁচ বিভাগে ভারী বর্ষণের পূর্বাভাস দিয়েছে আবহাওয়া অধিদপ্তর। পাশাপাশি পাহাড়ধসের আশঙ্কা দেয় সতর্কবার্তায়।
তবে সতর্কবার্তা কানে তুলছেন না বাসিন্দারা। যেমন- বুধবার দুপুরে নগরের লালখান বাজার টাংকি পাহাড়ের কথাই ধরুন। পাহাড়চূড়ায় চট্টগ্রাম ওয়াসার সংরক্ষণাগারে ৮০ লাখ লিটার পানির অবস্থান। এর আশপাশে পাহাড়ের খাঁজে গড়ে তোলা হয়েছে সেমিপাকা ও কাঁচা ঘর। পাহাড় কেটে দালানও উঠেছে কোনো কোনো জায়গায়।
বৃষ্টি মাথায় দিব্যি আছে নগরের পাহাড়ের নিচে বসবাসকারী লোকজন। তাদের এক আওয়াজ, ‘এখানে পাহাড়ধস হবে না’
জাফর সাহেবের টিনের ঘরে থাকেন টাইলস মিস্ত্রি মোহাম্মদ ফারুক। ভাড়া তিন হাজার টাকা। ফারুকের ছেলে মোহাম্মদ ফরহাদকে পাওয়া গেল টাংকির পাশে। কিশোরটি ভিজছিল বৃষ্টিতে। জানাল, ছোটবেলা থেকেই এই এলাকায়। পাহাড়ধস হয় না এখানে। বৃষ্টি হলে পাহাড় থেকে নেমে যেতে বলা হয় তাদের। কিন্তু এবার এখনো কেউ আসেনি।
টাংকির পাহাড়ের ওপর মাজার রয়েছে একটা। সেখানে পাওয়া গেল চার তরুণকে। তারাও বসবাস করেন পাহাড়ের খাঁজে। আবহাওয়া অধিদপ্তরের সতর্কবার্তার কথা জানেন না। সামনে দাঁড়ানো সাংবাদিকদের কাছ থেকে শুনেছে। তবুও নির্লিপ্ত।
অথচ অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক সাখাওয়াত জামিল সৈকত বললেন ভিন্ন কথা। ‘পাহাড়ের বাসিন্দাদের সতর্ক করার বিষয়ে আমাদের অফিসারদের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। সরিয়ে নিতে বলা হয়েছে নগর এবং উপজেলার পাহাড়ে বা কোলঘেঁষে ঝুঁকিতে বসবাসরত বাসিন্দাদের। আশা করব এবার পাহাড়ধস বা এতে হতাহতের ঘটনা ঘটবে না। বাসিন্দারা সরতে চায় না এটা আমাদের জন্য চ্যালেঞ্জিং।’
পাহাড়ে অবৈধ বসতি আসলে কত
সরকারি হিসাবে নগরের ২৬টি পাহাড়ে ঝুঁকিপূর্ণভাবে বসবাস করছে প্রায় সাড়ে ৭ হাজার পরিবার। তবে বাস্তব পরিস্থিতির সঙ্গে এই হিসাবের মিল নেই। স্থানীয় সূত্র ও সিটি করপোরেশনের মতে প্রকৃত সংখ্যা কয়েক গুণ বেশি।
২০০৭ সালে পাহাড়ধসে চট্টগ্রামে মৃত্যু হয় ১২৭ জনের। এরপর গঠিত তদন্ত কমিটি পাহাড় রক্ষায় ৩৬টি সুপারিশ করে। তবে বাস্তবে দেখা যায়নি তেমন কার্যকর পদক্ষেপ
সংখ্যা যে দিন দিন বেড়েছে— তা মানছে সবাই। যেমন, ২০১৪ সালে অনুষ্ঠিত পাহাড় ব্যবস্থাপনা কমিটির ১২তম সভায় মাত্র ৬৬৬টি পরিবারের অবৈধভাবে বসবাসের কথা উল্লেখ ছিল। এর মধ্যে ১১টি পাহাড় ব্যক্তি মালিকানাধীন, বাকি ১৫টি রেলওয়ে, গণপূর্ত, ওয়াসা, জেলা প্রশাসনসহ বিভিন্ন সরকারি সংস্থার।
গত বছরের ২ জানুয়ারি পাহাড় ব্যবস্থাপনা কমিটির ৩০তম সভায় সিটি করপোরেশনের তখনকার প্রধান নির্বাহী শেখ মুহম্মদ তৌহিদুল ইসলাম বলেছিলেন, মতিঝর্ণা ও বাটালি পাহাড়ে ঝুঁকিপূর্ণভাবে বসবাস করছে প্রায় ১০ হাজার পরিবার।
আকবরশাহ ১ নম্বর ঝিল সমাজকল্যাণ সমিতির অধীনে পাহাড়ে ১৫ হাজার পরিবার বসবাস করছে বলে জানান সমিতির সভাপতি মনির হোসেন। ২ ও ৩ নম্বর ঝিলে আরও ১৫ হাজার পরিবার এবং জিয়া নগর, বিজয়নগর, মধ্যম নগরে আছে আরও প্রায় ১০ হাজার পরিবার।
২০০৭ সালে পাহাড়ধসে চট্টগ্রামে মৃত্যু হয় ১২৭ জনের। এরপর গঠিত তদন্ত কমিটি পাহাড় রক্ষায় ৩৬টি সুপারিশ করে। তবে বাস্তবে দেখা যায়নি তেমন কার্যকর পদক্ষেপ।




