‘সমর্থকরাই আমাকে বাঁচিয়েছে’
- ক্রিকেটার নাঈমকে মারধরে ওসিসহ ৩ পুলিশ প্রত্যাহার

ছবি: আগামীর সময়
জাতীয় দলের ক্রিকেটার নাঈম হাসানকে হেনস্তার অভিযোগ ওঠার পর দুই পুলিশ সদস্যকে সাময়িক বরখাস্তের তথ্য জানিয়েছে চট্টগ্রাম মেট্রোপলিটন পুলিশ (সিএমপি)। যদিও শুধু ওই দুই পুলিশ সদস্য ও তাদের সোর্স নয়, থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) আরিফুল ইসলামও ক্রিকেটার নাঈম হাসানের সঙ্গে শুরু থেকে খারাপ ব্যবহার করেছেন। থানায় ঢোকার সঙ্গে সঙ্গে ‘চোখ নামিয়ে কথা বল, তুই আসামি’— এমন রূঢ় ভাষায় কথা বলেন ওসি। এ ছাড়া বিসিবি সভাপতি তামিম ইকবালকে ফোনে পুরো ঘটনা নিয়ে মিথ্যা তথ্য দেন ওসি। গত শুক্রবার রাতে নগরের লালখান বাজারে পুলিশি হেনস্তার শিকার হওয়ার পর গতকাল শনিবার বিকালে গণমাধ্যমের মুখোমুখি হয়ে এসব তথ্য জানান নাঈম নিজেই।
বহদ্দারহাটের ফরিদারপাড়ার বাড়িতে নাঈম হাসান সাংবাদিকদের বলেন, ঘটনার আকস্মিকতায় তিনি মানসিকভাবে কিছুটা বিপর্যস্ত।
নাঈম ঘটনার সময় পাশে থাকা সমর্থকদের প্রতি কৃতজ্ঞতা জানান। তিনি বলেছেন, ‘যদি তারা না থাকত তাহলে ঘটনা আরও অন্যরকম হতে পারত। তারা আমার পক্ষে ছিলেন।’
নাঈম বলছিলেন, ‘ওরা (পুলিশ) তো আমার মোবাইল নিয়ে নিয়েছে। যখন মোবাইল পেয়েছি, সঙ্গে সঙ্গে তামিম ভাইকে ফোন দিয়েছি। উনি একবারেই কলটা রিসিভ করছেন। আমার জন্য খুবই উপকার হয়েছে। তখন ওসি আমার ফোনে তামিম ভাইয়ের সঙ্গে কথা বলেন। তিনি মিথ্যা তথ্য দিচ্ছিলেন। আর আমাকে ইশারায় চুপ থাকতে বলেন। ওসি বলছিলেন, একটা ইনফরমেশন ছিল। তাই ব্যাগ তল্লাশি করা হচ্ছিল।’
বিমানবন্দর থেকে বাসায় ফেরার পথে শুক্রবার রাতে লালখান বাজার ফ্লাইওভারে নামার সময় নাঈমের সিএনজিচালিত অটোরিকশাকে থামার সংকেত দেয় পুলিশ। সেখানে তাকে তল্লাশি করার পাশাপাশি পুলিশ সদস্য ও তাদের সোর্স গালাগাল এবং মারধর করে বলে অভিযোগ। তল্লাশির সময় এসআই শফিক, কনস্টেবল রাসেল ও সোর্স সোহেল ছিলেন। সেখান থেকে থানায় নিয়ে যাওয়া হয় নাঈমকে।
হেনস্তার এ ঘটনার পর গতকাল দুপুরে নগর পুলিশ কমিশনার হাসান মোহাম্মদ শওকত আলী নাঈমের বাসায় যান। তিনি নাঈম ও তার বাবা মাহবুব আলমের কাছে দুঃখপ্রকাশ করেন। এ ছাড়া দোষীদের শাস্তির আশ্বাস দেন। পরে কমিশনার সাংবাদিকদের বলেন, দুই পুলিশ সদস্যকে সাময়িক বরখাস্ত করা হয়েছে। তাদের বিরুদ্ধে বিভাগীয় মামলা প্রক্রিয়াধীন। এ ছাড়া এ ঘটনা তদন্ত তিন সদস্যের কমিটি গঠন করা হয়েছে। কমিটি পাঁচ দিনের মধ্যে প্রতিবেদন জমা দেবে।
ক্রিকেটার নাঈমকে মারধর করে থানায় নেওয়া এবং থানায় দুর্ব্যবহার নিয়ে দিনভর আলোচনার পর খুলশী থানার ওসি মো. আরিফুল ইসলামকেও প্রত্যাহার করা হয়েছে। গতকাল রাত ১২টার দিকে সিএমপির সহকারী কমিশনার (পিআর) আমিনুর রশিদ গণমাধ্যমকে বিষয়টি নিশ্চিত করেন।
শুক্রবার রাতের ঘটনার বর্ণনা দিয়ে নাঈম বললেন, ‘পুলিশ যদি আমাকে বলত, ব্যাগ তল্লাশি করতে দিতাম। কিন্তু ব্যাগ তল্লাশি করেনি। ওখানে আমাকে সিএনজি থেকে নামানো হয়। পরে আমাকে বলছে সিএনজিতে ওঠো। আমি ভেবেছি চলে যাওয়ার জন্য উঠতে বলছে। সিএনজিতে ওঠার পর আমাকে গলা টিপে ধরবে, আমি জানতাম না। তখন ভয় পেয়ে গেছি।’
এই ক্রিকেটার জানান, থানায় পরিচয় দেওয়ার পর ওসি তাকে বলেন, ‘চোখ নিচে নামায়া কথা বল’। এ কথা বলার পর ওসির মোবাইল ফোনে একটা কল আসে। নাঈম বললেন, “কল আসার পর যখন কথা হয়, এরপর ওসি বললেন, ‘ভাইয়া আপনি বসেন।’ তখন তার সুর পরিবর্তন হয়। প্রথমে অন্য রকম ছিল।”
পুলিশ ব্যাগ তল্লাশি করেনি। ঘটনাস্থল থেকে নাঈমের ব্যাগগুলো থানায় নিয়ে যায়। নাঈম নিজে ব্যাগ খুলে গ্লাভস, ব্যাট, হেলমেট, সব জিনিস, কাপড়চোপড় একটি একটি করে সব বের করে পুলিশকে দেখান। ‘সবকিছু দেখানোর পর আমি ব্যাগ নিয়ে বাসায় আসছি যাতে বলতে না পারে, আমার ব্যাগটা তল্লাশি করা হয়নি। ডিসির সামনেই আমি এটা করেছি, ভিডিও করেছি’— জানালেন নাঈম।
নাঈমের মতে ঘটনাটা এত বড় হতো না যদি পুলিশের খারাপ উদ্দেশ্য না থাকত। সাধারণ মানুষের সঙ্গে পুলিশের আচরণ কেমন হয়, তার একটা ধারণাও নাঈম এ ঘটনার মাধ্যমে পেয়েছেন। নাঈম জানালেন, ‘যখন হাসপাতালে যাচ্ছিলাম আমার মাথায় একটা জিনিস কাজ করছিল— যদি আজ স্টেপটা না নিই, তাহলে দেখা গেল কাল সাধারণ মানুষের সঙ্গে এমন হলে কেউ জানবে না। আজ যদি স্টেপটা নেওয়া হয়, তাহলে হয়তো ১০টা মানুষের উপকার হবে। আমাদের দেশের জন্য ভালো হবে।’
এ ঘটনায় জড়িত ব্যক্তিদের আইনানুগভাবে সর্বোচ্চ শাস্তি চান নাঈম হাসান। পাশাপাশি তার চাওয়া ‘এমন ঘটনা যেন ভবিষ্যতে আরেকটা মানুষের সঙ্গে না হয়।’
এ ঘটনায় দুই পুলিশ সদস্যকে সাময়িক বরখাস্তের পাশাপাশি বিভাগীয় মামলা করার কথা জানালেন পুলিশ কমিশনার। সোহেলকে আটক করার বিষয়টিও জানালেন তিনি। এ ছাড়া তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে।
তবে খুলশী থানার সেকেন্ড অফিসার মনির হোসেনের তথ্যের ভিত্তিতে মূলত এ তল্লাশি কার্যক্রম চালানো হয় বলে জানা গেছে। ওসি আরিফুলও জানিয়েছেন, তাদের কাছে একটা চোরাচালানের তথ্য ছিল। তবে চোরাচালানের তথ্য থাকলে ব্যাগ তল্লাশি না করে সিএনজির আরোহীকে কেন এভাবে হেনস্তা করা হবে— এমন প্রশ্ন নাঈম হাসানের।
এ বিষয়ে বক্তব্য জানতে চাইলে ওসি আরিফুল ইসলাম জানালেন, দোষীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে।


