ভয়াল ২৯ এপ্রিল
দেড় লাখ মানুষের প্রাণ এক রাতেই শেষ

গ্রাফিকস: আগামীর সময়
১৯৯১ সালের ২৯ এপ্রিলের প্রলয়ংকরী ঘূর্ণিঝড় ও জলোচ্ছ্বাসে চট্টগ্রাম ও কক্সবাজার উপকূলে সরকারি হিসাবে ১ লাখ ৩৮ হাজার ৮৮২ জনের মৃত্যু হয়। এ হিসাবের বাইরেও নিখোঁজ ছিল অনেক মানুষ। লক্ষাধিক মানুষ গৃহহীন হয়ে পড়ে এবং বিস্তীর্ণ জনপদ পানির নিচে তলিয়ে যায়। সেই বিভীষিকাময় রাতের স্মৃতি এখনো বয়ে বেড়াচ্ছেন উপকূলের বেঁচে ফেরা মানুষ।
দিনটি শুরু হয়েছিল স্বাভাবিকভাবেই। ভোরে সূর্য উঠেছিল, পাখির কণ্ঠে শোনা গিয়েছিল গান, কৃষকরা গরুর পাল নিয়ে মাঠে গিয়েছিলেন। কিন্তু সন্ধ্যার পর আবহাওয়ার আকস্মিক পরিবর্তনই জানান দেয় আসন্ন বিপদের। রাত গভীর হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে প্রকৃতি রুদ্ররূপ ধারণ করে, শুরু হয় ঝড় ও জলোচ্ছ্বাসের তাণ্ডব।
চট্টগ্রামের বাঁশখালীর গণ্ডামারা ইউনিয়নের বাসিন্দা সোহেল সরওয়ার তখন আট বছরের শিশু। পরিবারসহ গ্রামের মাদরাসার সভা ও মেলায় গিয়েছিলেন। তার ভাষ্য, বিকেল থেকেই আবহাওয়া খারাপ হতে থাকে, তবে পরিস্থিতির ভয়াবহতা বুঝতে পারেননি তারা। রাতে ঘুমানোর পর গভীর রাতে প্রবল বাতাসে তাদের ঘরের চালা উড়ে যায়, ঘরে পানি ঢুকে পড়ে, দরজা ভেঙে যায়।
তিনি উল্লেখ করেছেন, মুহূর্তের মধ্যে গলাসমান পানি উঠে গেলে ঘর ছেড়ে বেরিয়ে আসতে বাধ্য হন তারা। বাবা তিন মাস বয়সী সুমনকে কাঁধে নেন, মা দেড় বছরের শাহেদকে বুকে জড়িয়ে রাখেন। সোহেল ও চার বছরের রাসেল মায়ের হাত ধরে ছিলেন। কিন্তু প্রবল স্রোতে বাবা ও সুমন আলাদা হয়ে যান।
পরিবারটি একটি ঘরের চালার ওপর আশ্রয় নিলেও সেটি ভেঙে পড়লে সবাই পানিতে ভেসে যান। তার ভাষ্য, মা শেষ চেষ্টা হিসেবে শাহেদের শার্টের বোতাম দাঁতে কামড়ে ধরে রাখেন। কিন্তু সন্তানকে আর বাঁচাতে পারেননি। রাতভর তারা কখনো গাছের সঙ্গে ধাক্কা খেয়েছেন, কখনো টিনের চালে আটকে থেকেছেন।
ভোর হলে চারদিকে শুধু লাশ দেখতে পান সোহেল। তার ভাষ্য, তখনো মায়ের মুখে শাহেদের শার্টের বোতাম আটকে ছিল, কিন্তু শিশুটি আর বেঁচে ছিল না। কিছুক্ষণ পর বাবাকে খুঁজে পাওয়া গেলেও ছোট ভাই সুমনের কোনো খোঁজ মেলেনি। দুই সন্তান হারিয়ে মা তাহেরা বেগম দীর্ঘদিন মানসিক ভারসাম্য হারিয়ে ফেলেন। এখনো সেই শোক তাকে তাড়িয়ে বেড়ায়।
আনোয়ারা উপজেলার পশ্চিম রায়পুর গ্রামের বাসিন্দা জাবেদুর রহিমও সেদিন অলৌকিকভাবে বেঁচে যান। ১৯ বছর বয়সী এইচএসসি পরীক্ষার্থী জাবেদুর পারিবারিক কাজে টেকনাফ থেকে ফিরে ক্লান্ত হয়ে ঘুমিয়ে পড়েছিলেন। পরিবারের সদস্যরা আশ্রয়ে গেলেও তিনি যাননি।
তার ভাষ্য, গভীর রাতে ঘরে পানি ঢুকতে শুরু করলে তিনি কোনোমতে ছাদে উঠে যান। পানি আরও বাড়তে থাকলে রান্নাঘরের চালায় আশ্রয় নেন। শরীরের কাপড় খুলে একটি গাছের সঙ্গে নিজেকে বেঁধে রেখে অজ্ঞান হয়ে পড়েন। সকালে জ্ঞান ফিরে দেখেন, তিনি প্রায় দেড় কিলোমিটার দূরে ভেসে গেছেন।
তিনি উল্লেখ করেছেন, পরিবারের সদস্যরা ভেবেছিলেন তিনি মারা গেছেন। পরে জীবিত ফিরে আসায় তারা বিস্মিত হন। পথে এক নারীর কাছ থেকে একটি চাদর নিয়ে তিনি বাড়ি ফেরেন, পরে বুঝতে পারেন সেটি তাদের নিজেদের ঘরেরই চাদর ছিল।
ঘূর্ণিঝড়ের পরদিন চট্টগ্রাম শহর এবং উপকূল জুড়ে ছিল ধ্বংসস্তূপ ও মৃতদেহের স্তূপ। ১৯৯১ সালে আলী আব্বাস ছিলেন দৈনিক বাংলার বাণীর চট্টগ্রাম ব্যুরোর দাপুটে আলোকচিত্রী। সেই বিভীষিকাময় দৃশ্য ক্যামেরায় ধারণ করেন তিনি।
তিনি উল্লেখ করেছেন, কর্ণফুলী নদী থেকে পতেঙ্গা সমুদ্রসৈকত পর্যন্ত সর্বত্র লাশ ভেসে থাকতে দেখেছেন। কোথাও গাছের ডালে ঝুলছে, কোথাও পানিতে ভাসছে মানুষ ও পশুর দেহ।
তার ভাষ্য, পতেঙ্গায় শত শত মৃতদেহ পড়ে ছিল এবং কাক তা ঠুকরে খাচ্ছিল। এক নববধূর লাশ দেখে তিনি স্তব্ধ হয়ে পড়েন, যার হাতে তখনো মেহেদির রঙ স্পষ্ট ছিল। সেই ছবি পরদিন পত্রিকায় প্রকাশিত হলে দেশ জুড়ে আলোড়ন সৃষ্টি হয়। যোগাযোগব্যবস্থা সম্পূর্ণ ভেঙে পড়ায় ছবি ঢাকায় পাঠানো কঠিন হয়ে পড়ে। তার বন্ধুর একটা প্রাইভেট কার ছিল। সেই গাড়িতে করে ফেনীতে যান এবং সেখানে তৎকালীন ফেনী প্রতিনিধি জয়নাল হাজারীর সহযোগিতায় ফ্যাক্সের মাধ্যমে ছবিগুলো ঢাকায় পাঠাতে সক্ষম হন। এ উদ্যোগে দুর্যোগের ভয়াবহতা দ্রুত সারা দেশে ছড়িয়ে পড়ে। পরে তিনি আনোয়ারা, বাঁশখালী ও কক্সবাজারের কুতুবদিয়ায় গিয়ে আরও ভয়াবহ পরিস্থিতির ছবি ধারণ করেন।
সে সময় যোগাযোগমন্ত্রী কর্নেল অলি আহমদ এবং মন্ত্রী ব্যারিস্টার রফিকুল ইসলাম মিয়া বিমানবাহিনীর হেলিকপ্টারে চট্টগ্রাম সফরে এসে ক্ষতিগ্রস্ত এলাকা পরিদর্শন করেন। তাদের সঙ্গে আলী আব্বাস ও সাংবাদিক এম নাসিরুল হক কুতুবদিয়ায় যান। সেখানে পরিস্থিতি ছিল আরও বিপর্যস্ত উল্লেখ করেন আলী আব্বাস।
প্রলয়ংকরী সেই ঘূর্ণিঝড়ের ৩৫ বছর পরও উপকূলবাসীর জীবনে এর ক্ষত অমলিন। অনেক পরিবার আজও হারানো স্বজনের অপেক্ষায় দিন গুনছে। প্রকৃতির এ নির্মম স্মৃতি তাদের জীবনে স্থায়ী এক দুঃসহ অধ্যায়।



