চট্টগ্রামে হাম উপসর্গ থাকলেই দরজা বন্ধ বেসরকারি হাসপাতালের

গ্রাফিকস: আগামীর সময়
সাত মাসের ছেলেটিকে নিয়ে কী বিপাকেই না পড়লেন ফারহানুল মুনিরা নিশা। কয়েক দিন ধরে তার জ্বর। একজন চিকিৎসকের তত্ত্বাবধানে চলছিল চিকিৎসা। কিন্তু গত বৃহস্পতিবার হঠাৎ তার শরীরের তাপমাত্রা নিচে নামতে শুরু করে। কিছু উপসর্গ মিলে যায় হামের সঙ্গে। যদিও নিশ্চিত হাম বলা যাচ্ছে না। এ অবস্থায় হাসপাতালে ভর্তির পরামর্শ দেন চিকিৎসক। ভর্তির জন্য ছেলেকে নিয়ে স্বামী-স্ত্রী ছুটছেন এক ক্লিনিক থেকে অন্য হাসপাতালে।
প্রথমে মেট্রোপলিটন হাসপাতাল। সেখানে চিকিৎসা দেওয়া হয় না হাম রোগীদের। নানা মাধ্যমে যোগাযোগ করে তারা গেলেন ল্যাবএইড হসপিটালে। কিন্তু নিষ্ফলা সেখানেও, হাম উপসর্গ থাকায় করানো গেল না ভর্তি। বিফল মনোরথে তারা এবার গেলেন পার্কভিউ হাসপাতালে। জরুরি বিভাগে হলো পরীক্ষা-নিরীক্ষা। তারা হাম ব্লকে ভর্তি করতে রাজি হলো। কিন্তু বাচ্চাটির হাম তখনো নিশ্চিত নয়। তাই ব্যক্তিগত চিকিৎসকের পরামর্শ, আলাদা কেবিনে ভর্তির। কিন্তু মিলল না কেবিন। পরে অনেক চেষ্টা-তদবির করে শিশুটিকে ভর্তি করানো হলো আসকার দীঘিরপাড়ের লাইফ কেয়ার হসপিটালে। এ চিত্র চট্টগ্রাম নগরীর।
ফারহানুল মুনিরা বললেন, ‘ভাগ্যিস আমার ছেলেকে হাম ব্লকে ভর্তি করিনি। কারণ একদিন পর তার হাম পরীক্ষার রিপোর্ট এসেছে নেগেটিভ। যদি ভর্তি করাতাম তাহলে সে হয়তো হামে আক্রান্ত হয়ে পড়ত।’
এভাবে হাম উপসর্গের শিশুদের নিয়ে হাসপাতাল-ক্লিনিকে ঘুরছেন অভিভাবকরা। বেশিরভাগ বেসরকারি হাসপাতাল চিকিৎসা দিচ্ছে না হাম রোগীদের। উচ্চ সংক্রমণ ঝুঁকির কারণে তারা ভর্তি করায় না রোগী। ফলে হাম চিকিৎসায় সরকারি হাসপাতালই প্রধান ভরসা। এ কারণে চাপ বেড়েছে চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ (চমেক) হাসপাতাল ও জেনারেল হাসপাতালে। হাসপাতাল দুটিতে জায়গা পেতে হিমশিম খেতে হচ্ছে।
চমেক হাসপাতালে গতকাল সোমবারও হাম ও হাম উপসর্গের রোগী ছিল শয্যার প্রায় দ্বিগুণ, ১২০ জন। জেনারেল হাসপাতালে রোগী ছিল ৩০ জন। অথচ এখানে হাম ব্লকে শয্যা মাত্র ১৬টি। ফলে গাদাগাদি করে চিকিৎসা দেওয়া হচ্ছে হামের। এ ছাড়া ফৌজদারহাটের বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব ট্রপিক্যাল অ্যান্ড ইনফেকশাস ডিজিজেস (বিআইটিআইডি) হাসপাতালে রয়েছে আরও প্রায় ৫০ রোগী।
জেলার সিভিল সার্জন সাজেদুর রহমান আগামীর সময়কে বলছিলেন, ‘হাম অতিমাত্রায় ছোঁয়াচে। এ কারণে শতভাগ আইসোলেশন করা না গেলে ছড়ানোর ঝুঁকি থাকে। শিশুদের পাশাপাশি বড়দেরও হাম হচ্ছে। তাই বেসরকারি হাসপাতালগুলোকে নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে আইসোলেশন মেনটেইন করে চিকিৎসা দেওয়ার।’
বেসরকারি হাসপাতালের না: চট্টগ্রামের ছোট-বড় বেশিরভাগ বেসরকারি হাসপাতাল ভর্তি করছে না হামের রোগী। সংক্রমণ ঝুঁকির কারণে তারা ভর্তি করে না রোগী। নগরের জিইসি মোড়ের মেডিকেল সেন্টার হাসপাতালে ব্যবস্থা রয়েছে ১৫০ জন রোগী রাখার। কিন্তু এখানেও রাখা হয় না হাম রোগী। হাসপাতালটির ব্যবস্থাপক মোহাম্মদ ইয়াসিন জানালেন, হামের জন্য আলাদা ব্লক করার মতো জায়গা নেই। যার জন্য রাখা যাচ্ছে না রোগী।
একইভাবে মেট্রোপলিটন হাসপাতাল, ম্যাক্স হাসপাতাল, ন্যাশনাল হাসপাতাল, সিএসসিআরসহ কোনো বেসরকারি হাসপাতালে দেওয়া হয় না হামের চিকিৎসা।
পার্কভিউ হাসপাতালে আলাদা একটি ব্লক করা হয়েছে হাম রোগীর জন্য। যদিও ওই ব্লকটিতে থাকে শয্যার চেয়ে বেশি রোগী। এ ছাড়া বেসরকারি হাসপাতালের মধ্যে আগ্রাবাদ মা ও শিশু জেনারেল হাসপাতালে করা হয়েছে হামের আইসোলেশন ব্লক।
হাসপাতালটির পরিচালক মোহাম্মদ মহিউদ্দিন জানালেন, ওই হাসপাতালে গতকাল হামের রোগী ছিল ২৯ জন। এ ছাড়া আরও পাঁচ রোগী ছিল আইসিইউতে।
চমেক হাসপাতালের পরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মোহাম্মদ তসলিম উদ্দীন মনে করেন, বেসরকারি হাসপাতালগুলোয় ভর্তির সুযোগ কম থাকায় হামের রোগী তার হাসপাতালে বেশি। বললেন, ‘হামের জন্য আলাদা বিভাগ করা হয়েছে। তারপরও সামাল দেওয়া যাচ্ছে না। নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্রও (আইসিইউ) আলাদা করা হয়েছে। করোনার মতো কঠোর আইসোলেশন করা গেলে হাম আরও কমে আসত। এখন সুস্থ বাচ্চাকে নিয়ে অসুস্থ বাচ্চার সঙ্গে চিকিৎসা করতে আসছেন অভিভাবকরা। ফলে ঝুঁকিতে পড়ছে।’



