অচল চুয়েট, ১৬ দিনে ৬ লাখ শিক্ষাঘণ্টা নষ্ট!
- ১৮টি বিভাগে স্থগিত ৩৫০০ ক্লাস ও ২৫-৩০টি পরীক্ষা
- প্রতি বিভাগের ৪৮টি তাত্ত্বিক ক্লাস ও ২৪ ঘণ্টার ল্যাব বাতিল
- শিক্ষা মন্ত্রণালয় নির্বিকার শিক্ষার্থীরা চাইলেন প্রধানমন্ত্রীর হস্তক্ষেপ

নতুন উপাচার্যের নিয়োগ বাতিল এবং সাবেক উপাচার্যকে পুনর্বহালের দাবিতে আন্দোলনে চুয়েট শিক্ষার্থীরা। ফাইল ছবি
সাবেক উপাচার্যকে পুনর্বহালের দাবিতে ১৬ দিন ধরে অচলাবস্থায় চট্টগ্রাম প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় (চুয়েট)। এতে স্থবির হয়ে পড়েছে সব ধরনের অ্যাকাডেমিক ও প্রশাসনিক কার্যক্রম। এ সময় ৬ হাজার ৮০৩ জন শিক্ষার্থীর প্রায় পৌনে ছয় লাখ শিক্ষাঘণ্টা নষ্ট হলো। মাঝপথে আটকে গেছে বিভিন্ন বিভাগের চূড়ান্ত পরীক্ষা। বড় ধরনের সেশনজটের শঙ্কা তৈরি হলেও এ বিষয়ে দৃশ্যত নির্বিকার শিক্ষা মন্ত্রণালয় ও বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশন (ইউজিসি)।
বিশ্ববিদ্যালয়ের নিয়মিত সূচি অনুযায়ী প্রতিদিন গড়ে সাত ঘণ্টা অ্যাকাডেমিক কার্যক্রম চলে। এর মধ্যে চারটি তাত্ত্বিক ক্লাস ও ল্যাব সেশন থাকে। ১৬ দিনের মধ্যে সাপ্তাহিক ছুটি বাদ দিয়ে কর্মদিবস ছিল ১২ দিন। কর্মদিবসে প্রতিটি বিভাগের অন্তত ৪৮টি তাত্ত্বিক ক্লাস ও প্রায় ২৪ ঘণ্টার ল্যাব সেশন বাতিল হয়েছে। ১৮টি বিভাগে সব মিলিয়ে প্রায় সাড়ে তিন হাজার ক্লাস হতে পারেনি। মাথাপিছু ৮৪ ঘণ্টা হিসাবে বিশ্ববিদ্যালয়ের সব শিক্ষার্থীর ৫ লাখ ৭১ হাজার ৪৫২ শিক্ষাঘণ্টা নষ্ট হয়েছে।
পরীক্ষা নিয়ন্ত্রক কার্যালয়ের ডেপুটি রেজিস্ট্রার মাহমুদুল হক খন্দকার আগামীর সময়কে জানালেন, এরই মধ্যে ১৮টি বিভাগের ২৫ থেকে ৩০টি পরীক্ষা স্থগিত করা হয়েছে।
অচলাবস্থায় সবচেয়ে বেশি বিপাকে শেষ বর্ষের শিক্ষার্থীরা। সিভিল ইঞ্জিনিয়ারিং, ইলেকট্রনিকস অ্যান্ড টেলিকমিউনিকেশন্স ইঞ্জিনিয়ারিং, ম্যাটেরিয়ালস অ্যান্ড মেটালার্জিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিং এবং মেকাট্রনিকস অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রিয়াল ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের ২০২১-২২ শিক্ষাবর্ষের সপ্তম সেমিস্টার ফাইনাল পরীক্ষা চলাকালে হঠাৎ বন্ধ হয়ে যায়। অন্যদিকে পেট্রোলিয়াম অ্যান্ড মাইনিং ইঞ্জিনিয়ারিং, কম্পিউটার সায়েন্স অ্যান্ড ইঞ্জিনিয়ারিং ও মেকানিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের ক্লাস শেষ হলেও চূড়ান্ত পরীক্ষা শুরু করা যায়নি। এ ছাড়া জুনিয়র ব্যাচগুলোর ক্লাসও মাঝপথে থমকে আছে।
চতুর্থ বর্ষের শিক্ষার্থী তানভীর রেজা বলেছেন, টানা ক্লাস-পরীক্ষা বন্ধ থাকায় অনেকটাই পিছিয়ে পড়েছি। দ্রুত সংকটের সমাধান না হলে পূজার ছুটির আগে ক্লাস-পরীক্ষা শুরু করা কঠিন হবে। এতে প্রায় এক মাস অ্যাকাডেমিক কার্যক্রমের বাইরে থাকতে হবে, যা দীর্ঘমেয়াদি সেশনজটের শঙ্কা তৈরি করছে।
তবে পরীক্ষা নিয়ন্ত্রক অধ্যাপক ড. মঈনুল ইসলাম আশ্বস্ত করে বলেছেন, পরিস্থিতি স্বাভাবিক হলে টার্ম পরীক্ষার মাঝের ছুটি কমিয়ে এবং রমজান ও শীতকালীন ছুটির সময়ে ক্লাস-পরীক্ষা নিয়ে এই ক্ষতি পুষিয়ে নেওয়া হবে। এ নিয়ে শিক্ষার্থীদের উদ্বিগ্ন না হওয়ার পরামর্শ দেন তিনি।
গত ২১ সেপ্টেম্বর অধ্যাপক ড. আবু সাদাত মুহাম্মদ সায়েমকে সরিয়ে চুয়েটের উপাচার্য হিসেবে খুলনা প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের (কুয়েট) অধ্যাপক ড. শেখ শরীফুল আলমকে নিয়োগ দেওয়া হয়। এরপর থেকেই নতুন উপাচার্যের নিয়োগ বাতিল এবং সাবেক উপাচার্যকে পুনর্বহালের দাবিতে আন্দোলন শুরু করেন শিক্ষার্থীরা। পরে তাদের দাবির সঙ্গে সংহতি জানিয়ে শিক্ষক, কর্মকর্তা ও কর্মচারীরাও কর্মবিরতিতে যান।
আন্দোলনের যৌক্তিকতা তুলে ধরে ২৩তম ব্যাচের যন্ত্রকৌশল বিভাগের শিক্ষার্থী রাত্রি বড়ুয়া বলেছেন, ‘যে শিক্ষক দেশ-বিদেশে সুনাম অর্জন করেছেন, শিক্ষার্থীদের জন্য একের পর এক শিক্ষার্থীবান্ধব কাজ করেছেন, এমন একজনকে ৫৬ দিনের মাথায় সরিয়ে দেওয়ার কোনো মানে হতে পারে না। সায়েম স্যারকে পুনর্বহাল না করা পর্যন্ত আমাদের আন্দোলন চলবে। আমরা এ বিষয়ে প্রধানমন্ত্রীর হস্তক্ষেপ চাই।’
আন্দোলনের বিষয়ে স্থাপত্য ও পরিকল্পনা অনুষদের ডিন অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ রাশিদুল হাসান বলেছেন, ‘সরকার ও ইউজিসির সিদ্ধান্তের অপেক্ষায় আছি আমরা। সাবেক উপাচার্য ড. সায়েম তার স্বল্পসময়ে যে দক্ষতা দেখিয়েছেন, তাতে বিশ্ববিদ্যালয়ের সার্বিক কার্যক্রমে ইতিবাচক পরিবর্তন এসেছিল। তাকে পুনর্বহাল অথবা চুয়েটের জ্যেষ্ঠ অধ্যাপকদের মধ্য থেকে কাউকে দায়িত্ব দেওয়ার দাবি জানিয়ে আসছি আমরা।’
এ বিষয়ে সাবেক উপাচার্য ড. আবু সাদাত মুহাম্মদ সায়েমের বক্তব্য জানতে একাধিকবার কল দেওয়া হলেও তার মোবাইল ফোন বন্ধ পাওয়া যায়।
বিশ্ববিদ্যালয়ের এমন অচলাবস্থা নিরসনে শিক্ষা মন্ত্রণালয় বা ইউজিসির কোনো দৃশ্যমান উদ্যোগ নেই। এ বিষয়ে জানতে ইউজিসির সদস্য অধ্যাপক ড. আব্দুল্লাহ আল মামুনের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি কোনো মন্তব্য করতে রাজি হননি। শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে যোগাযোগের পরামর্শ দেন তিনি। পরে শিক্ষামন্ত্রী ড. আ ন ম এহছানুল হক মিলনকে ফোন করা হলে তার দপ্তর থেকে জানানো হয়, ‘তিনি একটি সভায় ব্যস্ত আছেন।’
তবে সার্বিক বিষয়ে চুয়েটের নতুন উপাচার্য অধ্যাপক ড. শেখ শরীফুল আলম বলেছেন, ‘বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষা কার্যক্রম স্বাভাবিক করতে সরকারের বিভিন্ন দপ্তর কাজ করছে। হয়তো সেটি দৃশ্যমান হচ্ছে না। কোনো অপ্রীতিকর ঘটনা যেন না ঘটে, সেজন্য সরকার ধৈর্যের পরিচয় দিচ্ছে। আশা করছি, দ্রুত পরিস্থিতি স্বাভাবিক হবে।’



