চবি শিক্ষার্থীর ‘পরীক্ষাদাও এআই’, এক অ্যাপেই সবকিছু

মোহাম্মদ জালাল উদ্দীন
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে অকারণে স্ক্রল করে সময় নষ্ট করেন শিক্ষার্থীরা। তা না করে সেই স্ক্রলিংয়েই যেন শিক্ষার্থীরা শিখতে পারেন, প্রস্তুতি নিতে পারেন চাকরি ও ভর্তি পরীক্ষার— এমন ভাবনা থেকেই ‘পরীক্ষাদাও এআই’ নামে একটি শিক্ষাভিত্তিক অ্যাপের জন্ম। এটি তৈরি করেছেন চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের (চবি) রসায়ন বিভাগের সাবেক শিক্ষার্থী মোহাম্মদ জালাল উদ্দীন। সম্প্রতি অ্যাপটি প্রকাশিত হয়েছে গুগল প্লে স্টোরে।
অ্যাপটির বিশেষত্ব হলো— এতে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম, পড়াশোনা, পরীক্ষার প্রস্তুতি, চাকরির তথ্য, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) সহায়তা ও সহপাঠীদের সঙ্গে যোগাযোগের সুবিধা একত্র করা হয়েছে। বিসিএস, সরকারি চাকরি, বিশ্ববিদ্যালয় ভর্তি, শিক্ষক নিবন্ধন, ব্যাংক নিয়োগসহ স্কুল-কলেজের শিক্ষার্থীদের প্রস্তুতির জন্যও এতে রয়েছে নানা ফিচার।
জালাল উদ্দীনের ভাবনা ছিল শিক্ষার্থীরা যেহেতু সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দীর্ঘ সময় কাটান, তাই তাদের নিউজফিডে বিনোদনমূলক কনটেন্টের পাশাপাশি প্রশ্ন, উত্তর, পড়াশোনার আলোচনা ও চাকরির খবর তুলে ধরা। এ ভাবনা থেকে প্রথমে চালু করেন ‘কিউফিড’। পরে এতে পরীক্ষার প্রস্তুতি, মডেল টেস্ট ও এআই সহায়তাসহ বিভিন্ন সুবিধা যুক্ত করে পূর্ণাঙ্গ অ্যাপ হিসেবে গড়ে তোলেন ‘পরীক্ষাদাও এআই’।
অ্যাপটির কাস্টম এক্সাম মোডে পরীক্ষার্থীরা নিজেদের প্রয়োজন অনুযায়ী বিষয়, অধ্যায়, প্রশ্নসংখ্যা, সময়, নেগেটিভ মার্কিং ও প্রশ্নের কঠিনতার মাত্রা নির্ধারণ করে পরীক্ষা দিতে পারবেন। পাশাপাশি রয়েছে বিসিএস, শিক্ষক নিবন্ধন ও ব্যাংক নিয়োগসহ বিভিন্ন পরীক্ষার আদলে হাজারো মডেল টেস্ট।
‘স্ট্রিক গেম’র মাধ্যমে একটানা কতটি প্রশ্নের সঠিক উত্তর দেওয়া যায়, তা যাচাই করা যাবে। এ ছাড়া পরীক্ষার ফলাফল ও পারফরম্যান্স বিশ্লেষণ করে এআইয়ের সাহায্যে দুর্বল বিষয়গুলো শনাক্ত করার সুবিধা রয়েছে।
কিউফিডে শিক্ষার্থীরা প্রশ্ন করতে ও অন্যদের প্রশ্নের উত্তর দিতে পারবেন। উত্তর সঠিক না ভুল, তা যাচাইয়ের পাশাপাশি ব্যাখ্যাও পাওয়া যাবে। কোনো বিষয় বুঝতে সমস্যা হলে ‘গুরু’ ও ‘হাদী’ নামের দুটি এআই মডেলের সহায়তা নেওয়া যাবে।
চাকরিপ্রত্যাশীরা বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের নিয়োগ বিজ্ঞপ্তি দেখা, সরাসরি আবেদন এবং আবেদনের অগ্রগতি অনুসরণ করতে পারবেন। প্রবেশপত্র প্রকাশ, পরীক্ষার তারিখ ও ফলাফলের মতো গুরুত্বপূর্ণ তথ্য হোয়াটসঅ্যাপে রিমাইন্ডার হিসেবে পাওয়ার ব্যবস্থাও রয়েছে।
এ ছাড়া অ্যাটেনডেন্স ট্র্যাকারের মাধ্যমে মাসে কত দিন, কত ঘণ্টা এবং কোন বিষয়ে পড়াশোনা হয়েছে, তার হিসাব রাখা যাবে। নিজের লক্ষ্য নির্ধারণের পাশাপাশি অগ্রগতি ও পারফরম্যান্স শিটও দেখা যাবে।
শুধু শিক্ষার্থী নয়, শিক্ষকরাও এতে উপকৃত হতে পারবেন। শিক্ষক ও কোচিং পরিচালকদের জন্য রয়েছে ‘এডুকেটর জোন’। এর মাধ্যমে ভার্চুয়াল ক্লাসরুম তৈরি, মডেল টেস্ট নেওয়া, ফলাফল বিশ্লেষণ এবং শিক্ষার্থীদের সঙ্গে প্রয়োজনীয় ফাইল আদান-প্রদান করা যাবে। পাশাপাশি সহপাঠীদের সঙ্গে ছবি, ফাইল ও ভয়েস নোট বিনিময়ের সুবিধাও রয়েছে।
নতুন ব্যবহারকারীরা নির্ধারিত প্রমো কোড ব্যবহার করে অ্যাপটি ১৫ মাস বিনামূল্যে ব্যবহার করতে পারবেন। নিজের আমন্ত্রণ লিংকের মাধ্যমে নতুন ব্যবহারকারী নিবন্ধন করালে প্রতিটি নিবন্ধনের বিপরীতে এক মাস করে অতিরিক্ত বিনামূল্যে ব্যবহারের সুযোগ পাবেন আমন্ত্রণকারী।
অ্যাপের উদ্ভাবক ফটিকছড়ির লেলাং গ্রামের বাসিন্দা জালাল উদ্দীন সাত ভাইবোনের মধ্যে সবার ছোট। চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের রসায়ন বিভাগে পড়াশোনা করেছেন তিনি। প্রযুক্তি, গবেষণা ও উদ্ভাবনের প্রতি আগ্রহ থেকেই শিক্ষার্থীদের জন্য সমন্বিত এই প্ল্যাটফর্ম তৈরির উদ্যোগ নেন।
ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা সম্পর্কে তিনি জানান, তরুণদের দক্ষতা উন্নয়ন এবং বাংলাদেশের গবেষণা ও উদ্ভাবন খাতে অবদান রাখতে চান। বর্তমানে বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ে (বুয়েট) এমফিল করার সুযোগ পেয়েছেন তিনি। এমফিল শেষে উচ্চশিক্ষার জন্য বিদেশে যাবেন, নাকি দেশে থেকেই কাজ করবেন, সে সিদ্ধান্ত পরে নেবেন।
জালাল উদ্দীনের প্রত্যাশা, শিক্ষার্থীদের পড়াশোনার জন্য যেন একাধিক অ্যাপ বা প্ল্যাটফর্মের ওপর নির্ভর করতে না হয়। একটি অ্যাপেই মিলবে প্রয়োজনীয় সব সুবিধা। আর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে অকারণে স্ক্রল করে কাটানো সময়ই হয়ে উঠবে শেখা, দক্ষতা অর্জন ও ভবিষ্যৎ গড়ার হাতিয়ার।



