ডেঙ্গুতে অন্তঃসত্ত্বা স্ত্রীকে হারানোর পর ছেলেকে বাঁচানোর যুদ্ধ

ডেঙ্গুতে অন্তসত্ত্বা স্ত্রীকে হারানোর পর ছেলেকে নিয়ে হাসপাতালে আল আমীন। ছবি: আগামীর সময়
‘আমি গত চার দিন ধরে দুই চোখের পাতা এক করতে পারিনি। এক ডেঙ্গু ১৩ ঘণ্টায় আমার জীবন এলোমেলো করে দিয়েছে। অনাগত সন্তানসহ স্ত্রীকে হারালাম। এখন ছেলেকে নিয়ে হাসপাতালে। এই চিকিৎসা করাতে গিয়ে অনেক ধারদেনা হয়েছে। ছেলেটির প্লাটিলেট কমে গেছে। আল্লাহ যেন ছেলেটাকে রক্ষা করেন।’
চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ (চমেক) হাসপাতালের ৮ নম্বর শিশু ওয়ার্ডের ফটকের বাইরে বসে কথাগুলো বলতে গিয়ে চোখ মুছলেন হকার আল আমীন। তার পাশে শুয়ে আছে একমাত্র সন্তান আবু জাহেদ (৮)। সদ্য মা হারা ছেলেটি নির্বাক চেয়ে রয়েছে। হাতে স্যালাইন লাগানো। বাবার চোখে-মুখে উদ্বেগ উৎকণ্ঠা।
স্ত্রী মনি আকতার শনিবার সন্ধ্যায় মৃত্যুবরণ করেছেন। বেসরকারি সাজিনাস হাসপাতালের আইসিইউতে চিকিৎসাধীন ছিলেন তিনি। একপর্যায়ে লাইফ সাপোর্টে দেওয়ার পর্যায়ে চলে যায়। তখন আল আমীন হাসপাতালের বিলের (টাকা) কথা চিন্তা করে মুচলেকা দিয়ে স্ত্রীকে আইসিইউ থেকে নামিয়ে নেন।
আল আমীন বলেন, ‘ডাক্তারেরা অনেক চেষ্টা করেছেন। কিন্তু ডেঙ্গু তার সবকিছু খেয়ে ফেলে। অ্যাম্বুলেন্সযোগে বাসায় ফেরার পথে ৬ মিনিটের মাথায় সে মারা যায়। এর মধ্যে ১ লাখ ২১ হাজার টাকা বিল হয় হাসপাতালটিতে। তারা ৯০ হাজার টাকা দিলে হবে বলে জানান। আমি ৪০ হাজার টাকা দিয়ে স্ত্রীকে নিয়ে যাই। বাকিটা ৩০ তারিখের মধ্যে দেব বলেছি।’
মনি আকতারের পাশাপাশি ১৬ সেপ্টেম্বর একমাত্র সন্তান জাহেদেরও জ্বর হয়। স্ত্রীর সংকটাপন্ন অবস্থার কারণে তাকে দেখতে পারেননি এতদিন। এক প্রতিবেশীর বাসায় রেখে স্ত্রীর চিকিৎসায় হাসপাতালে পড়েছিলেন আল আমীন। শুক্রবার ভর্তি করে শনিবার লাশ নিয়ে ফিরতে হয়।
মায়ের মৃত্যুতে হঠাৎ একা হয়ে পড়ে জাহেদ। বিষণ্নতা ভর করেছে তাকে। চুপচাপ। মা চলে যাওয়ার পরদিন রবিবার থেকে ছেলেটির অবস্থা খারাপ হয়। জ্বর, বমি, মাথা ব্যথা। রবিবার সন্ধ্যায় তাকে নিয়ে চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ (চমেক) হাসপাতালে ছোটেন আল আমীন।
আজ মঙ্গলবার চমেক হাসপাতালের শিশু ওয়ার্ডের সামনে দেখা যায় আল আমীন ছেলের মাথায় হাত বুলিয়ে দিচ্ছেন। এত রোগী যে, ভেতরে শয্যা পায়নি এখনো। তাই ওয়ার্ডের বাইরে জাহেদকে রাখা হয়েছে। আর কেউ নেই। ছেলের সুস্থতা তার কাছে এখন খুব গুরুত্বপূর্ণ।
আল আমীন বললেন, ‘আমার ছেলের ডেঙ্গু নেগেটিভ এসেছে। প্লাটিলেট কমে ৪৫ হাজার হয়েছে। আজও আবার পরীক্ষা করাব। তারপর বলা যাবে। ডাক্তাররা বলেছেন রক্তশূন্যতাও আছে তার। মায়ের চিকিৎসার জন্য অনেক ধারদেনা করেছি। ৫০ হাজার টাকা বকেয়া পরিশোধ করতে হবে সাজিনাস হাসপাতালে। আমাকে বিশ্বাস করেছে, এটাই অনেক বেশি। তারপরও তাদের টাকা দেব। ছেলেটা একটু সুস্থ হোক আগে।’
জাহেদ প্রথম শ্রেণিতে পড়ে। বাবা যখন মায়ের কথা বলে কাঁদছিলেন তখন চোখের কোণ ভিজে যায় ছেলেটির। সদ্য মা হারা জাহেদের যেন এখনো বিশ্বাসই হচ্ছে না তার মা নেই। এই ছেলেকে নিয়েই এখন আল আমীনের যুদ্ধ।
কুমিল্লার বাসিন্দা আল আমীন ভাসমান হকার। থাকেন পাহাড়তলী এলাকায়। কয়দিন আগেও তার পৃথিবীটা খুব সুন্দর ছিল। অনাগত সন্তানের স্বপ্নে সুন্দর কেটে যাচ্ছিল আল আমীন-মনির জীবন। হঠাৎ এক ঝড়ে সব তছনছ। নিজের অভিজ্ঞতায় আল আমীন শুধু বললেন, ‘জ্বর হলে কেউ দেরি করবেন না। হাসপাতালে চলে যাবেন।’



