তদন্ত কমিটির রিপোর্ট ছাড়াই কেন জেটিতে বিদেশি জাহাজ

চট্টগ্রাম বন্দরের জিসিবি-১১ নম্বর জেটিতে ভিড়েছে বিদেশি জাহাজ ‘সিএনসি ইউরেনাস’
তদন্ত কমিটির রিপোর্ট ছাড়াই চট্টগ্রাম বন্দরের জিসিবি-১১ নম্বর জেটিতে ভিড়েছে বিদেশি জাহাজ ‘সিএনসি ইউরেনাস’। শনিবার সকালে চট্টগ্রাম বন্দরের দুজন পাইলট বিশেষ নজরদারিতে বহির্নোঙর থেকে জাহাজটি জেটিতে নিয়ে আসেন।
সাধারণত বহির্নোঙর থেকে জেটিতে জাহাজ ভেড়ানোর সময় প্রায় দুই কিলোমিটার দূর থেকে একটি টাগবোট সঙ্গে রাখা হয়। তবে স্টিয়ারিং বিকল হয়ে যাওয়া ‘সিএনসি ইউরেনাস’ জাহাজটিকে জেটিতে আনতে পুরো ১৩ কিলোমিটার পথেই দুটি টাগবোট প্রস্তুত রাখা হয়। জাহাজটি বিকল হওয়ার ঝুঁকি এড়াতে কম গতিতে সতর্কতার সঙ্গে চালিয়ে আনা হয়।
বন্দর ব্যবহারকারীদের অভিযোগ, তথ্য গোপন করে বন্দরকে ঝুঁকিতে ফেলার মতো অনিয়মের পরও বিদেশি সিএমএ-সিজিএম শিপিং লাইনের বিরুদ্ধে কোনো আইনি পদক্ষেপ না নিয়েই জাহাজটিকে জেটিতে ভেড়ানো হয়েছে। তাদের ধারণা, প্রভাব খাটিয়ে জাহাজটি জেটিতে ভেড়ানো হয়েছে। এ সিদ্ধান্তে বন্দরের মেরিন বিভাগের মধ্যেও অসন্তোষ তৈরি হয়েছে। কোন সমঝোতার ভিত্তিতে জাহাজটি জেটিতে ভেড়ানো হয়েছে, তা নিয়ে আলোচনা চলছে।
তবে সমঝোতার বিষয়টি নাকচ করেছেন চট্টগ্রাম বন্দর সদস্য (হারবার ও মেরিন) কমডোর আহমেদ আমিন আবদুল্লাহ। তিনি বললেন, ‘বন্দরে ঢোকার টেকনিক্যাল রিকোয়ারমেন্ট—স্টিয়ারিং গিয়ারের অ্যালার্ম সিস্টেম সচল এবং সার্ভে রিপোর্ট—পেয়েই আমরা জাহাজটি জেটিতে ভিড়িয়েছি। তবে কী কারণে জাহাজ গ্রাউন্ডেড হলো, সেই তদন্ত চলমান। বন্দরে জাহাজ ভেড়ানোর সঙ্গে সেই তদন্তে কোনো প্রভাব পড়বে না। তদন্তের সুপারিশ পেলে আমাদের জিরো টলারেন্স থাকবে।’
চীনের শিকো বন্দর থেকে চট্টগ্রামের উদ্দেশে যাত্রা করেছিল ‘সিএনসি ইউরেনাস’। মাঝপথে সিঙ্গাপুর বন্দরে থামে জাহাজটি। গত ৩০ জুলাই সিঙ্গাপুর থেকে যাত্রা শুরুর আগে জাহাজটির স্টিয়ারিং গিয়ারের হাইড্রোলিক লক অ্যালার্ম সিস্টেমে ত্রুটি শনাক্ত হয়। আন্তর্জাতিক সার্ভে প্রতিষ্ঠান ডিএনভি জাহাজটির মালিককে চট্টগ্রাম বন্দরে প্রবেশের আগে পাইলট ও বন্দর কর্তৃপক্ষকে এই যান্ত্রিক ত্রুটির বিষয়ে বাধ্যতামূলকভাবে অবহিত করতে বলেছিল।
কিন্তু জাহাজটির ক্রু বা সিএমএ-সিজিএম কর্তৃপক্ষ চট্টগ্রাম বন্দরে প্রবেশের আগে বিষয়টি জানায়নি বলে অভিযোগ রয়েছে। এমনকি গত সোমবার জাহাজটি বহির্নোঙর থেকে চট্টগ্রাম বন্দরের জেটির উদ্দেশে যাত্রা শুরু করার সময়ও পাইলটকে বিষয়টি জানানো হয়নি বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে।
জেটিতে প্রবেশের আগে কর্ণফুলী নদীর মোহনায় জাহাজটি আনার সময় এর স্টিয়ারিং বিকল হয়ে যায়। একপর্যায়ে জাহাজটি ভাসতে ভাসতে রিটেইনিং দেয়ালের পাশে চরে আটকা পড়ে। অর্থাৎ যে ত্রুটির বিষয়ে সতর্ক করা হয়েছিল, শেষ পর্যন্ত সেই সমস্যাতেই পড়তে হয় জাহাজটিকে।
সেদিন মোহনায় জাহাজটি আটকে গেলে বা ডুবে গেলে দেশের অর্থনীতির লাইফলাইন হিসেবে পরিচিত চট্টগ্রাম বন্দর অচল হয়ে পড়ার আশঙ্কা ছিল। ডুবে যাওয়া জাহাজটি উদ্ধারের সক্ষমতা বাংলাদেশে নেই। বিদেশ থেকে বিশেষায়িত দল ও টাগ এনে জাহাজটি উদ্ধারে প্রায় ১০ দিন সময় লাগতে পারত। এতে দেশের অর্থনীতিতে বড় ধরনের বিপর্যয় ঘটতে পারত বলে সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন।
এমন ঝুঁকি নিয়ে আসা জাহাজটিকেই কোনো আইনি পদক্ষেপ না নিয়ে শনিবার সকালে জেটিতে ভেড়ানোর অনুমতি দেওয়া হয়েছে।
চট্টগ্রাম বন্দরে নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট ও সমুদ্র পরিবহন অধিদপ্তরের স্পেশাল অফিসার (মেরিন সেইফটি) হিসেবে ছয় বছর কাজ করে সাত হাজার দেশি-বিদেশি জাহাজ আটক-জরিমানা করে দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছিলেন মোহাম্মদ মুনীর চৌধুরী। তার ভাষ্য, মার্চেন্ট শিপিং আইন অনুযায়ী, ত্রুটিপূর্ণ জাহাজ পাঠানো সম্পূর্ণ অনৈতিক। জাহাজের কাঠামো ও পরিচালনগত ত্রুটি দুটোই শাস্তিযোগ্য অপরাধ। বন্দর তদন্তের মাধ্যমে প্রমাণ করতে পারলে জাহাজটি আটক, জরিমানা, ক্ষতিপুরণ আদায় করে দৃষ্টান্ত স্থাপন করতে পারে। ভবিষ্যতে বন্দরকে এমন ঝুঁকিতে ফেলার চেষ্টা যাতে কেউ না করে।
জাহাজ অচল হয়ে যাওয়া এবং এতে বন্দর সম্পদের কোনো আর্থিক ক্ষতি হয়েছে কি না, তা নিরূপণে পৃথক দুটি সরকারি প্রতিষ্ঠান দুটি তদন্ত কমিটি করেছে। নৌ বাণিজ্য অধিদপ্তরের গঠিত তদন্ত কমিটিতে বন্দরের ডক মাস্টার আবু সুফিয়ান ও নৌ বাণিজ্য দপ্তরের ইঞ্জিনিয়ার মাহমুদুর রহমানকে সদস্য করা হয়েছে। কমিটিকে সাত দিনের মধ্যে প্রতিবেদন দিতে বলা হয়েছে।
এ ছাড়া চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষও তিন সদস্যের একটি তদন্ত কমিটি করেছে। ওই কমিটিতেও ডক মাস্টার আবু সুফিয়ান রয়েছেন। তবে দুটি তদন্ত কমিটির কোনো প্রতিবেদনই এখনো জমা পড়েনি।
কিসের বা কোন সমঝোতার ভিত্তিতে জাহাজটি জেটিতে ভেড়ানো হয়েছে, সে বিষয়ে কিছু জানেন না নৌ বাণিজ্য দপ্তরের প্রধান ক্যাপ্টেন শেখ জালাল উদ্দিন গাজী। তিনি বললেন, ‘শিপিং লাইন আমাদের জানায়নি। তদন্ত শেষ না হওয়ার আগে জাহাজ বন্দর ছাড়তে পারবে কি না, এখনই বলা যাচ্ছে না। তবে জাহাজ বন্দর ছাড়তে আমাদের কাছ থেকে নোট অবজেকশন সার্টিফিকেট (এনওসি) লাগবে। তখন আমরা বিষয়টি দেখব।’
তবে বন্দরের মেরিন বিভাগের ভাষ্য, ‘সিএনসি ইউরেনাস’ জাহাজ বন্দর ছাড়ার আগে ইন্স্যুরেন্স কোম্পানি মুচলেকা দিলে জাহাজটি বন্দর ছাড়তে বাধা থাকবে না।






