১৪ হাজার কোটির প্রকল্পেও কেন ডুবছে চট্টগ্রাম

গ্রাফিকস: আগামীর সময়
চট্টগ্রাম নগরের জলাবদ্ধতা নিরসনে সরকারি তিনটি সংস্থা ১৪ হাজার ২৫৭ কোটি টাকা ব্যয়ে চারটি প্রকল্প বাস্তবায়ন করছে। প্রকল্পগুলোর কাজ প্রায় শেষ পর্যায়ে। এরপরও ভারী বৃষ্টিতে সোমবার দুপুর পর্যন্ত নগরের বিভিন্ন এলাকা হাঁটু থেকে কোমরসমান পানিতে ডুবে ছিল। বিপুল অর্থ খরচের পরও কেন ডুবছে চট্টগ্রাম—এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে গিয়ে মাস্টারপ্ল্যানের খসড়া পর্যালোচনা এবং নগর পরিকল্পনাবিদদের সঙ্গে কথা বলে মূলত তিনটি কারণ উঠে এসেছে। এগুলো হলো- খণ্ডিত প্রকল্প বাস্তবায়ন, কারিগরি বা নকশায় ত্রুটি এবং সংস্থাগুলোর মধ্যে সমন্বয়হীনতা।
রবিবার রাত থেকে টানা বৃষ্টিতে নগরের পাঁচলাইশ, কাতালগঞ্জ, চকবাজার, কাপাসগোলা, আগ্রাবাদ, রিয়াজউদ্দিন বাজারসহ নগরের বিভিন্ন এলাকায় পানি জমেছে। অনেকের বাসা-বাড়িতে পানি ঢুকে পড়েছে। পানিতে ভাসছে আসবাবপত্র। রান্নার সরঞ্জাম। মার্কেটে পানি ঢুকে পণ্য নষ্ট হয়েছে ব্যবসায়ীদের। সীমাহীন দূর্ভোগে পড়েছে নগরের বাসিন্দারা।
নকশায় ত্রুটি ও অকার্যকর অবকাঠামো
নতুন মহাপরিকল্পনার (মাস্টারপ্ল্যান) নথি বিশ্লেষণে দেখা যায়, চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (সিডিএ) ও পানি উন্নয়ন বোর্ডের তিনটি প্রকল্পের আওতায় ৩৯টি স্লুইসগেট নির্মাণ করা হয়েছে। কিন্তু এগুলো খালের স্বাভাবিক প্রস্থের চেয়ে অনেক সরু। ফলে পানির স্বাভাবিক প্রবাহ বাধাগ্রস্ত হচ্ছে এবং বর্জ্য জমে খাল দ্রুত ভরাট হয়ে যাচ্ছে। এ ছাড়া পাহাড় কাটার পলি ও গৃহস্থালী বর্জ্য মিশে খালের তলদেশে এমন এক শক্ত স্তর তৈরি করেছে, যা পানির সাধারণ স্রোতে পরিষ্কার হয় না। ফলে খালের গভীরতা ও পানি ধারণক্ষমতা আশঙ্কাজনকভাবে কমে গেছে।
সবচেয়ে বড় কারিগরি ত্রুটি ধরা পড়েছে সিল্ট ট্র্যাপ বা পলি ধরার ফাঁদগুলোতে। এগুলো আয়তনে এতই ছোট যে, বর্ষার শুরুতে মাত্র এক বা দুই দিনের বৃষ্টিতেই তা ভরে অকার্যকর হয়ে পড়ছে। এর বাইরে জোয়ারের সময় বৃষ্টির পানি অপসারণের জন্য প্রয়োজনীয় পাম্প হাউসের অভাব এবং খালের ভেতর দিয়ে বিভিন্ন সংস্থার পাইপ ও কেব্ল নেওয়ায় পানির প্রবাহ মারাত্মকভাবে বাধাগ্রস্ত হচ্ছে।
মেগা প্রকল্পের বাইরে বিশাল এলাকা
নথিতে দেখা যায়, চলমান মেগা প্রকল্পগুলোর আওতায় নগরের ৩৬টি খাল সংস্কার করা হচ্ছে। কিন্তু এর বাইরে থেকে গেছে ২১টি খাল, যার মোট দৈর্ঘ্য ৩৪ দশমিক ৭৫ কিলোমিটার। জলাবদ্ধতা নিরসনে মেগা প্রকল্প বাস্তবায়নকারী বাংলাদেশ সেনাবাহিনীও তাদের প্রকল্পের বাইরে থাকা কাটা খাল, কৃষ্ণা খাল ও কুয়াইশ খাল পরিষ্কার করতে সিটি করপোরেশনকে চিঠি দিয়েছে। অন্যদিকে, মাস্টারপ্ল্যানে ৩১টি স্বয়ংক্রিয় আবর্জনা পরিষ্কারক যন্ত্রের (মেকানিক্যাল ট্র্যাশ স্ক্রিন) প্রস্তাব করা হলেও চলমান প্রকল্পগুলোতে এর কোনো সংস্থান নেই।
প্রকল্প পরিচালকের দাবি—‘ভোগান্তি কমেছে’
নকশার ত্রুটি ও নগরবাসীর দুর্ভোগের বিষয়ে জানতে চাইলে জলাবদ্ধতা নিরসন মেগা প্রকল্পের পরিচালক লেফটেন্যান্ট কর্নেল মোহাম্মদ মহসিনুল হক চৌধুরী পরিস্থিতির উন্নতি হয়েছে বলে দাবি করেন। তিনি বলেছেন, ‘২০২৩ সালে চট্টগ্রাম শহরের ১২১টি জায়গায় জলাবদ্ধতা হতো, যা ২০২৪ সালে কমে ৬১টি এবং ২০২৫ সালে ১৭টিতে নেমে এসেছে। প্রকল্পের কাজ শেষ পর্যায়ে আসায় এখন কেবল চার-পাঁচটি নিচু জায়গায় সাময়িক পানি জমছে। চলতি বছরই জলাবদ্ধতার ভোগান্তি ৮০ থেকে ৯০ শতাংশ পর্যন্ত কমে আসবে এবং ২০২৭ সালের ফেব্রুয়ারি নাগাদ কাজ পুরোপুরি শেষ হলে আশপাশের এলাকাগুলোতে আর পানি উঠবে না।’
তিনি আরও বলেছেন, ‘জলাবদ্ধতা সামলাতে আমরা ১৬টি কুইক রিঅ্যাকশন টিম গঠন করেছি, যারা দিনরাত ২৪ ঘণ্টা মাঠে নিয়োজিত। এ ছাড়া কাতালগঞ্জ ও বৌদ্ধবিহার এলাকার নিচু রাস্তাগুলো সিটি করপোরেশনের সহায়তায় দেড় থেকে দুই ফুট উঁচু করা হচ্ছে। আগামী শুষ্ক মৌসুমে কাপাসগোলা ব্রিজ নতুন করে নির্মাণ এবং হিজরা খালের বাকি ২৩ শতাংশ কাজ শেষ হলে চকবাজার ও কাপাসগোলা অংশে আর পানি জমার সুযোগ থাকবে না।’
বিশেষজ্ঞদের শঙ্কা ও স্থায়ী সমাধানের পথ
বিপুল ব্যয়ের এসব প্রকল্প নিয়ে শুরু থেকেই আপত্তি জানিয়ে আসছিলেন বিশেষজ্ঞরা। ইঞ্জিনিয়ার্স ইনস্টিটিউশন বাংলাদেশের (আইইবি) চট্টগ্রাম কেন্দ্রের সাবেক চেয়ারম্যান প্রকৌশলী দেলোয়ার মজুমদার বলেছেন, ‘যেকোনো বড় প্রকল্প চূড়ান্ত করার আগে গণশুনানির মাধ্যমে এর অবস্থান, পরিবেশগত প্রভাব এবং অর্থনৈতিক-কারিগরি সম্ভাব্যতা যাচাই করার কথা। কিন্তু চট্টগ্রামের জলাবদ্ধতা নিরসনের প্রকল্পগুলো নেওয়া হয়েছে অপরিকল্পিতভাবে, যার ফল এখন নগরবাসীকে ভোগ করতে হচ্ছে।’
এদিকে, জলাবদ্ধতা থেকে স্থায়ী মুক্তির জন্য নতুন মাস্টারপ্ল্যানে ৫৯টি নতুন রেগুলেটর, ৭৯টি সিল্ট ট্র্যাপ এবং ৫৮৭ কিলোমিটার সেকেন্ডারি ড্রেন নির্মাণের সুপারিশ করা হয়েছে। শুধু অবকাঠামো নয়, প্রকৃতিভিত্তিক সমাধানের ওপর জোর দিয়ে বৃষ্টির পানি সংরক্ষণের জন্য ২১ হাজার ৫৬০ একর এবং খোলা জায়গার জন্য ৪৩ হাজার ১২৭ একর জমি ব্যবহারের প্রয়োজনীয়তার কথা বলা হয়েছে। একই সঙ্গে সব সংস্থার কাজকে এক সুতায় গাঁথতে একটি একক ‘স্টর্মওয়াটার ম্যানেজমেন্ট অথরিটি’ গঠনের সুপারিশ করা হয়েছে খসড়া মহাপরিকল্পনায়।






