চালক-জ্বালানি নেই, অকেজো দুই সি অ্যাম্বুলেন্স
- সন্দ্বীপে বৈরী আবহাওয়ায় রোগী পরিবহনে দুর্ভোগ

সি অ্যাম্বুলেন্সের জন্য সন্দ্বীপের মানুষকে পোহাতে হচ্ছে অবর্ণনীয় দুর্ভোগ। ছবি: ভিডিও থেকে নেওয়া
চালক ও জ্বালানির বরাদ্দ ছাড়াই দ্বীপ উপজেলা সন্দ্বীপে দেওয়া হয়েছিল দুটি সি অ্যাম্বুলেন্স। এমনকি বরাদ্দ দেওয়ার সময় অ্যাম্বুলেন্স দুটি বৈরী আবহাওয়ায় চলাচল উপযোগী কি না, তাও যাচাই করা হয়নি। ফলে রোগী পরিবহনে কার্যত ব্যবহার না হওয়া অ্যাম্বুলেন্স দুটি দিনের পর দিন পড়ে থেকে এখন হয়ে পড়েছে বিকল ও অকেজো।
সি অ্যাম্বুলেন্স না থাকায় সন্দ্বীপের প্রসূতি, হৃদরোগীসহ জটিল রোগে আক্রান্ত মানুষকে চট্টগ্রামে চিকিৎসা নিতে চরম দুর্ভোগ পোহাতে হচ্ছে। উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে প্রয়োজনীয় চিকিৎসাসেবা না পাওয়ার অভিযোগ রয়েছে। উন্নত চিকিৎসার জন্য রোগীদের কাঠের ট্রলার বা স্পিডবোটে চট্টগ্রামে যেতে হয়। কিন্তু বৈরী আবহাওয়ায় সন্দ্বীপ চ্যানেলে এসব নৌযান চলাচল বন্ধ থাকে। ফলে স্থানীয়দের দীর্ঘদিনের দাবি, বৈরী আবহাওয়ায়ও চলাচল করতে সক্ষম উন্নতমানের সি অ্যাম্বুলেন্সের ব্যবস্থা করা।
গত রবিবার এক অসুস্থ বৃদ্ধাকে সাধারণ স্পিডবোটে উত্তাল সাগর পাড়ি দিয়ে চট্টগ্রামে নেওয়ার একটি ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়লে বিষয়টি নতুন করে আলোচনায় আসে। খোলা স্পিডবোটে উত্তাল ঢেউ ও অঝোর বৃষ্টির মধ্যে জীবনের ঝুঁকি নিয়ে ওই বৃদ্ধাকে চট্টগ্রামে নেওয়া হয়। রওশন আরা বেগম নামের ওই বৃদ্ধাকে স্পিডবোটে তিনজনের কোলে কোনোরকমে রেখে স্বজনরা সাগর পাড়ি দেন। তার ছেলে জাহাঙ্গীর কবির জানান, এর আগে সন্দ্বীপের একটি বেসরকারি হাসপাতাল থেকে তার মাকে চট্টগ্রামে নেওয়ার পরামর্শ দেওয়া হয়।
এ বিষয়ে সন্দ্বীপ উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা মানস বিশ্বাস আগামীর সময়কে বলেন, ‘ওই বৃদ্ধা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে যাননি। বেসরকারি হাসপাতাল থেকে তাকে চট্টগ্রাম নিয়ে যাওয়ার পরামর্শ দেওয়া হয় বলে শুনেছি।’
সি অ্যাম্বুলেন্সের বর্তমান অবস্থা সম্পর্কে জানতে চাইলে মানস বিশ্বাস আগামীর সময়কে বলেন, ‘এক দশকের বেশি সময় ধরে দুটি অ্যাম্বুলেন্সের একটি দেখছি জঙ্গলে (গুপ্তছড়া ঘাটে) পড়ে আছে। অন্যটি হারামিয়া স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের পেছনে আছে। এগুলো অচল।’
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, ২০০৮ সালে প্রায় ৩০ লাখ টাকা ব্যয়ে সন্দ্বীপ স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সকে একটি সি অ্যাম্বুলেন্স দেওয়া হয়। স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় থেকে অ্যাম্বুলেন্স দেওয়া হলেও এর জন্য চালক ও জ্বালানির বরাদ্দ ছিল না। ফলে এটি ঘাটেই পড়ে থাকে। ২০১১ সালে সাময়িকভাবে চালু করা হলেও ছয় মাসের মাথায় সেটি আবার বন্ধ হয়ে যায়। ধীরে ধীরে অ্যাম্বুলেন্সটি বিকল হয়ে পড়ে। বর্তমানে হারামিয়া স্বাস্থ্যকেন্দ্রের পেছনে পরিত্যক্ত অবস্থায় রয়েছে এটি।
এরপর ২০১৫ সালে দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয় প্রায় ৬৫ লাখ টাকা ব্যয়ে সন্দ্বীপ উপজেলা প্রশাসনকে আরেকটি সি অ্যাম্বুলেন্স দেয়। এটিও রোগী পরিবহনে এক দিনের জন্যও ব্যবহার করা হয়নি। আগেরটির মতো এটিও গুপ্তছড়া ঘাটে পড়ে রয়েছে। উপজেলা প্রশাসন ও স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স সূত্রে জানা গেছে, চালক ও জ্বালানির বরাদ্দ না থাকায় অ্যাম্বুলেন্স দুটি চালানো সম্ভব হয়নি। বর্তমানে দুটিই নষ্ট হয়ে পড়ে আছে।
এ ছাড়া সাধারণ স্পিডবোটের আদলে তৈরি হওয়ায় অ্যাম্বুলেন্স দুটি উত্তাল সাগর পাড়ি দেওয়ার উপযোগী নয়। বৈরী আবহাওয়ায় সন্দ্বীপ চ্যানেলে চলাচল করতে পারে, এমন উচ্চক্ষমতাসম্পন্ন সি অ্যাম্বুলেন্স প্রয়োজন বলে মনে করেন উপজেলা স্বাস্থ্য কর্মকর্তা মানস বিশ্বাস। তিনি বলেন, ‘বছরে অন্তত ৫০ দিন বৈরী আবহাওয়ায় সন্দ্বীপ চ্যানেলে স্বাভাবিক নৌ চলাচল বন্ধ থাকে। ওই সময়টায় চলাচল উপযোগী উচ্চ ক্ষমতাসম্পন্ন অ্যাম্বুলেন্স হলে রোগী পারাপার সম্ভব। তবে এজন্য অন্যান্য লজিস্টিক সাপোর্টও দরকার।’
তবে এমন উচ্চক্ষমতাসম্পন্ন অ্যাম্বুলেন্স থাকলে বৈরী আবহাওয়ার মধ্যেও অনেক সুস্থ মানুষ রোগী সেজে সাগর পাড়ি দেওয়ার চেষ্টা করতে পারেন বলেও আশঙ্কা করছেন চিকিৎসক ও সংশ্লিষ্টরা।
সন্দ্বীপ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা আমজাদ হোসেন বলেন, ‘উপজেলা প্রশাসনকে যে অ্যাম্বুলেন্স দেওয়া হয়েছিল, তার জন্য চালক ও জ্বালানির বরাদ্দ ছিল না। সেটি অকেজো অবস্থায় পড়ে আছে।’
সাধারণ একটি স্পিডবোটে একবার সন্দ্বীপ থেকে চট্টগ্রাম যেতে প্রায় ৩ থেকে ৪ হাজার টাকার জ্বালানি খরচ হয়। ফলে জরুরি রোগীদের ক্ষেত্রে বৈরী আবহাওয়ায় নিরাপদ ও নির্ভরযোগ্য নৌযানের অভাবই বড় সমস্যা হয়ে দাঁড়িয়েছে।
সন্দ্বীপের জনসংখ্যা বর্তমানে তিন লাখের বেশি। কিন্তু স্থানীয়দের অভিযোগ, উপজেলার স্বাস্থ্যসেবা ব্যবস্থা এখনও নাজুক। ১৯৭৩ সালে এখানে রুরাল হেলথ সেন্টার নামে একটি স্বাস্থ্যকেন্দ্র চালু ছিল। তখন সেখানে একজন চিকিৎসক নিয়োগপ্রাপ্ত ছিলেন। ১৯৯৭ সালে ছিল ১০ শয্যার হাসপাতাল। বর্তমানে সন্দ্বীপ উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স ৫০ শয্যায় উন্নীত হলেও সেখানে নিয়মিত চিকিৎসক পাওয়া যায় না বলে অভিযোগ করেছেন স্থানীয়রা।
উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা মানস বিশ্বাসের দাবি, স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে ১০ জন চিকিৎসক ও ২০ জন নার্সের পদ রয়েছে। তবে সাধারণ মানুষের অভিযোগ, সার্বক্ষণিকভাবে এখানে কোনো চিকিৎসক পাওয়া যায় না। দিনের একটি সময়ে চিকিৎসক একবার এসে চলে যান। বাকি সময় নার্স ও ওয়ার্ডবয়দের মাধ্যমেই বেশিরভাগ চিকিৎসাসেবা দেওয়া হয়।
এ বিষয়ে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা আমজাদ হোসেন বলেন, ‘আমি নিজেও চিকিৎসক সংক্রান্ত অভিযোগ শুনেছি। বারবার বলেছি তাদের সেবার মান বাড়াতে। কিন্তু হয়নি। যদি এখানে চিকিৎসাসেবা উন্নত করা যেত, তাহলে চট্টগ্রাম যেতে হতো না। এ ব্যাপারে সিভিল সার্জনকে চিঠি লিখব।’
তবে চিকিৎসাসেবা নিয়ে অভিযোগের বিষয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করেন উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা মানস বিশ্বাস। তিনি বলেন, ‘যারা এমন অভিযোগ করেন বা লেখেন, তারা না জেনেই করেন। এখানে সুন্দর চিকিৎসা হয়। একজন শিশুস্বাস্থ্য কনসালট্যান্টসহ ১০ জন চিকিৎসক রয়েছেন। গড়ে ২০ জন রোগী থাকেন। আগে রোগী থাকত না।’








