স্থানীয়রা ৫ লাখ রোহিঙ্গা ১৫ ভীতিকর প্রভাব
- শরণার্থী দিবস আজ

সংগৃহীত ছবি
মিয়ানমারের বাস্তুচ্যুত রোহিঙ্গাদের প্রত্যাবাসন নিয়ে কোনো আশার আলো আপাতত নেই। এ নিয়ে নতুন করে আলোচনা শুরু করা যায়নি। রাখাইনের পরিবেশ অনুকূল না থাকা, মিয়ানমারের জান্তা সরকারের বিরুদ্ধে আরাকান আর্মির চলমান বিদ্রোহসহ নানা কারণে প্রত্যাবাসন প্রক্রিয়া থমকে রয়েছে। মিয়ানমার সরকারের সদিচ্ছার ওপর প্রত্যাবাসন অনেকটা নির্ভর করছে বলে মনে করছে বাংলাদেশ।
বিশ্ব শরণার্থী দিবস আজ। দিনটি সামনে রেখে আবারও আলোচনায় এসেছে রোহিঙ্গা সংকট। প্রায় এক দশক পরও বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ এ শরণার্থী সংকটের কোনো টেকসই সমাধান দৃশ্যমান নয়। পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শামা ওবায়েদ ইসলাম রোহিঙ্গাদের নিরাপদ ও স্বেচ্ছায় প্রত্যাবাসনে আরও জোরালো বৈশ্বিক পদক্ষেপের আহ্বান জানিয়েছেন। গত বৃহস্পতিবার যুক্তরাষ্ট্রের নিউ ইয়র্কে জাতিসংঘের সদর দপ্তরে অনুষ্ঠিত এক আলোচনায় দেওয়া বক্তব্যে তিনি এ আহ্বান জানান। গতকাল শুক্রবার এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে এ তথ্য জানিয়েছে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়।
রোহিঙ্গাদের জোরপূর্বক ফেরত পাঠানোর সুযোগও নেই। এ অবস্থায় আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের মাধ্যমে চাপ তৈরি এবং ফের সংলাপ চালুর ওপর জোর দিচ্ছেন বিশ্লেষকরা। তারা মনে করছেন, মিয়ানমারে জান্তা সরকারের সঙ্গে আরাকান আর্মির যুদ্ধাবস্থা এবং জাতিগত যে সংঘাত চলছে, তাতে রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন ইস্যু ঝুলেই গেল।
জান্তা সরকার যদি প্রত্যাবাসনে রাজিও হয় তাও সম্ভব নয় বলছেন বিশেষজ্ঞরা। এক্ষেত্রে বাংলাদেশ সরকার উভয় সংকটে পড়েছে বলে মনে করছেন রোহিঙ্গাবিষয়ক গবেষক ও চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের নৃবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক রাহমান নাসির উদ্দিন।
তিনি জানালেন, আগে দুই দফা প্রত্যাবাসন চেষ্টা করেও ব্যর্থ হয়। ২০২১ সালে মিয়ানমারে সামরিক সরকার ক্ষমতায় আসে। এরপর জাতিগত সংঘাত শুরু হয় আরাকান আর্মি ও জান্তা সরকারের সঙ্গে। এ অবস্থায় বাংলাদেশ জান্তা সরকারকে রাজি করালেও, তা আরাকান আর্মির কারণে সম্ভব হবে না। রাখাইনের নিয়ন্ত্রণ আরাকান আর্মির হাতে। সীমান্ত এলাকাগুলোতেও তাদের আধিপত্য। এ অবস্থায় অনিরাপদ প্রত্যাবাসন আন্তর্জাতিক সংস্থা সমর্থন করে না। তাই নানামুখী আলোচনা চালাতে হবে।
২০১৭ সালের ২৫ আগস্ট রোহিঙ্গা ঢলের পর ওই বছর ২৩ নভেম্বর রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসনের মূল চুক্তি হয়। পরের বছর ২০১৮ সালের ১৬ জানুয়ারি হয় মাঠপর্যায়ে চুক্তি। ওই বছর ১৫ নভেম্বর প্রত্যাবাসনের প্রথম চেষ্টা হয়। সেটা ব্যর্থ হয়। ২০১৯ সালের ২৩ আগস্ট চীনের মধ্যস্থতায় প্রত্যাবাসনের দ্বিতীয় চেষ্টাও ব্যর্থ হয়।
অন্তর্বর্তী সরকারের সময় ২০২৫ সালের ১৪ মার্চ জাতিসংঘ মহাসচিব আন্তোনিও গুতেরেসকে নিয়ে কক্সবাজারের রোহিঙ্গা শিবির পরিদর্শন করেন প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূস। তখন তিনি এক বছরের মধ্যে রোহিঙ্গারা দেশে ফেরত যাবে বলে জানিয়েছিলেন। পরে ওই প্রক্রিয়া থমকে যায়। বরং ওই সময়ে নতুন করে দেড় লাখ রোহিঙ্গা বাংলাদেশে ঢোকে।
শরণার্থী ত্রাণ ও প্রত্যাবাসন কমিশনার (আরআরআরসি) মোহাম্মদ মিজানুর রহমান জানালেন, রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসনের কোনো অগ্রগতি বর্তমানে নেই। জন্মহার আগের চেয়ে কমলেও রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীর চাপ ক্রমাগত বেড়েই চলছে।
বর্তমান সরকারের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. খলিলুর রহমান বুধবার সংসদে জানিয়েছেন, রোহিঙ্গা সমস্যা সমাধানের গতি-প্রকৃতি অনেকাংশেই নির্ভর করে রাখাইন রাজ্যের নিরাপত্তা পরিস্থিতি, আন্তর্জাতিক চাপ, সর্বোপরি মিয়ানমার কর্তৃপক্ষের সদিচ্ছার ওপর।
বাংলাদেশে অবস্থানরত রোহিঙ্গাদের মধ্যে ২ লাখ ৮৩ হাজার ব্যক্তিকে ‘পূর্বে মিয়ানমারে বসবাসকারী ব্যক্তি’ হিসেবে মিয়ানমার স্বীকৃতি দিয়েছে বলেও পররাষ্ট্রমন্ত্রী খলিলুর রহমান জানান। তিনি বলেছেন, ‘রাখাইন রাজ্যে একটি স্থিতিশীল পরিবেশ সৃষ্টির জন্য মিয়ানমার সরকার ও আরাকান আর্মির মধ্যে কার্যকর সংলাপের ক্ষেত্র তৈরি করার বিষয়টিকে গুরুত্বপূর্ণ মনে করছি আমরা। সেই লক্ষ্যে প্রচেষ্টা চালাচ্ছি।’
প্রত্যাবাসন প্রক্রিয়া বিলম্ব হলে দিন দিন রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীর চাপ বাড়বে। এ ছাড়া তাদের ব্যবস্থাপনা ব্যয় যেমন বাড়বে, তেমনি আইনশৃঙ্খলাসহ নানা দিকে এর নেতিবাচক প্রভাব আরও প্রকট হবে। অধ্যাপক রাহমান নাসির উদ্দিন বললেন, ‘সবচেয়ে বড় সংকট হয়েছে স্থানীয় লোকজনের সঙ্গে রোহিঙ্গাদের ভারসাম্যহীনতা। স্থানীয়রা হলো ৫ লাখ। রোহিঙ্গারা ১৫ লাখ। স্থানীয় জনগোষ্ঠীর মনে এটার একটা নেতিবাচক ও ভীতিকর প্রভাব লক্ষ করা যাচ্ছে।




