পূর্ণিমার রাতে কালিকাবাড়ির আতঙ্ক

আজ থেকে প্রায় এক যুগ আগের ঘটনা। মৌলভীবাজারের বড়লেখা উপজেলার সীমান্তঘেঁষা কালিকাবাড়ি চা বাগানের ম্যানেজার বাংলোতে কয়েক রাত থাকার সুযোগ হয়েছিল আমার। উঁচু টিলার ওপর বাংলোটি, নিচে বাগানের অফিস। পাশে শতবর্ষী বিশাল কড়ই গাছ, আর চারদিকে যতদূর চোখ যায় শুধু চা বাগান। তখন বাগানে বিদ্যুৎ ছিল না। অতিথি এলে পেট্রোলচালিত জেনারেটর এক-দেড় ঘণ্টা আলো দিত। এরপর পুরো রাত কেটে যেত সৌরবিদ্যুতের ক্ষীণ আলো আর প্রকৃতির নিস্তব্ধতার মধ্যে।
সেদিন রাত প্রায় একটা। আকাশজুড়ে পূর্ণিমার আলো। দক্ষিণ পাশের বাঁশঝাড়ের ফাঁক গলে জ্যোৎস্না এসে পড়েছে কড়ই গাছের গোড়ায়। চারদিকে ঝিঁঝিঁ পোকার ডাক, জোনাকির ঝিলিক আর হালকা বাতাসে পাতার মৃদু শব্দ। ঘুম আসছিল না। তাই সিঁড়ি বেয়ে নিচে নেমে কড়ই গাছের নিচে গিয়ে বসি। সেখানে পড়ে থাকা একটি কাটা গাছের গুঁড়ির ওপর বসে চারপাশের নিস্তব্ধতা উপভোগ করছিলাম।
হঠাৎ পশ্চিম পাশের ছোট্ট পুকুরের ধারে দুজন মানুষকে গল্প করতে দেখি। মনে হলো, হয়তো বাগানের পরিচিত শ্রমিক ব্রিটিশ ও তার সঙ্গী। সাহস করে তাদের দিকে হাঁটতে শুরু করলাম। কিন্তু আমি যতই এগোই, তারা ততই উত্তর পাশের রাস্তা ধরে পাহাড়ের দিকে এগিয়ে যেতে থাকে। হঠাৎ এক মুহূর্তে তারা দুজনই অদৃশ্য হয়ে গেল। চারপাশে তাকিয়েও তাদের আর কোনো চিহ্ন খুঁজে পেলাম না। বুকের ভেতর কেমন যেন শীতল একটা ভয় নেমে এলো।
ফিরে আসার জন্য পা বাড়াতেই দেখি দুটি ঘোড়া ধীর পায়ে অফিসের আঙিনার দিকে যাচ্ছে। আশ্চর্যের বিষয়, তাদের চলার কোনো শব্দ নেই। মনে হচ্ছিল, তারা যেন মাটিতে নয়, বাতাসে ভেসে চলছে। কিছুক্ষণ পর তারাও অন্ধকারে মিলিয়ে গেল।
মনের সাহস জড়ো করে বাংলোর দিকে এগোলাম। সিঁড়ির কাছে পৌঁছেই শরীর ঠাণ্ডা হয়ে গেল। সিঁড়ির মাঝখানে পাশাপাশি বসে আছে এক নারী ও এক পুরুষ। তাদের মুখে কোনো অভিব্যক্তি নেই, শুধু স্থির দৃষ্টিতে আমার দিকে তাকিয়ে আছে। আমি চোখের পলক ফেলতেই তারা ধোঁয়ার মতো মিলিয়ে গেল। আর এক মুহূর্তও দাঁড়াইনি। দৌড়ে বাংলোতে উঠে দরজা বন্ধ করে সারা রাত জেগে কাটিয়েছিলাম।
পরদিন সকালে বিষয়টি জানালে প্রবীণ শ্রমিকরা জানান, বহু বছর আগে ওই কড়ই গাছের নিচে এক দম্পতির রহস্যজনক মৃত্যু হয়েছিল। কেউ বলেন দুর্ঘটনা, কেউ বলেন আত্মহত্যা, আবার অনেকে বলেন এটি ছিল এক অমীমাংসিত হত্যাকাণ্ড। আরও শোনা যায়, এক ব্রিটিশ ম্যানেজারের দুটি প্রিয় ঘোড়া মৃত্যুর পরও নাকি পূর্ণিমার রাতে বাংলোর আশপাশে দেখা যায়। সেই রাতের ঘটনাগুলো আজও আমার কাছে রহস্য। সত্যিই কি সেদিন অশরীরী কিছু দেখেছিলাম, নাকি জ্যোৎস্না আর নিস্তব্ধ রাত আমার চোখকে বিভ্রমে ফেলেছিল—উত্তর আজও অজানা।
লেখক : প্রতিনিধি, আগামীর সময়





