মামদো ভূত

প্রতীকী ছবি
অমাবস্যার রাত। চারপাশ নিস্তব্ধ। আকাশে চাঁদ নেই, শুধু মেঘের ফাঁক গলে ভেসে আসছে ফ্যাকাসে আলো। দূরে কোথাও শোনা যাচ্ছে শেয়ালের ডাক। মাঠের পথ ধরে বাড়ি ফিরছিল কৃষক কলিমুদ্দিন। সারা দিনের পরিশ্রমের ক্লান্তি তার চোখ-মুখে। পা থামানোর জো নেই, বাড়ি ফিরতে হবে দ্রুতই। কারণ এই পথটা নিয়ে গ্রামের লোকজন নানা কথা বলে। হঠাৎ রাস্তার পাশে কাঁঠালগাছের ছায়া থেকে কেউ ডেকে উঠল, এই ভাই, একটু দাঁড়ান না। গলায় এক অদ্ভুত টান।
কলিমুদ্দিন থেমে গেল। সামনে তাকিয়ে দেখে এক লোক দাঁড়িয়ে আছে। চেহারা স্পষ্ট বোঝা যায় না, তবে মনে হয় হাসছে। লোকটা বলল, আমার সঙ্গে একটু হাঁটবেন? একা যেতে ভয় লাগে।
বুকের ভেতরটা ধক করে উঠল কলিমুদ্দিনের। তবে মাথা ঠান্ডা রাখল। গ্রামের লোকদের কথা মনে পড়ল। তারা বলত, এমন ডাকে সাড়া দিলে বিপদ।
কলিমুদ্দিন বলল, হাঁটব তো; কিন্তু আগে একটা কথা বলো। লোকটা এগিয়ে এলো একটু। বলল, কী কথা?
কলিমুদ্দিন নিচের দিকে তাকিয়ে শান্ত গলায় বলল, তোমার পা কি মাটিতে লাগছে?
সময় যেন স্থির হয়ে গেল। ঝিঁঝি পোকার শব্দও থেমে গেল হঠাৎ। লোকটা আর কিছু বলল না। তারপর আচমকা যেন কুয়াশার মতো মিলিয়ে গেল অন্ধকারে।
কলিমুদ্দিন আর পেছনে তাকায়নি। দ্রুত পা চালিয়ে বাড়ির দিকে হাঁটতে লাগল। পরদিন সকালে সে গল্পটা সবাইকে বলল। কেউ হাসল, কেউ ভয় পেল। কিন্তু গ্রামের বৃদ্ধরা চুপচাপ মাথা নেড়ে বলল, ঠিকই ধরেছিস, ওটা মানুষ ছিল না। মামদো ভূত ছিল।
বাংলার ঘুটঘুটে অন্ধকার রাত আর শেয়ালের হুক্কাহুয়া ডাকের সঙ্গে যার নাম সবচেয়ে বেশি জড়িয়ে আছে, সে মামদো ভূত। গ্রামবাংলার প্রাচীন বটগাছ কিংবা পোড়োবাড়ির চিলেকোঠায় এদের আনাগোনা নিয়ে মুখরোচক গল্পের অভাব নেই। পেত্নী শাঁখচুন্নি কিংবা ব্রহ্মদত্যি তো আছেই; কিন্তু মামদো ভূতের দাপট যেন একটু আলাদা। ছোটবেলায় দাদি-নানি কিংবা দিদিমা-ঠাকুমার মুখে আমরা কতই না ভূতের গল্প শুনেছি! কিন্তু মামদো ভূতের নাম শুনলে আজও কেমন যেন গায়ের লোম খাড়া হয়ে ওঠে।
মামদো ভূত বলতে সাধারণত এমন একধরনের ভূতকে বোঝানো হয়, যে জীবদ্দশায় মুসলমান ছিল। লোকবিশ্বাস বলে, কোনো মুসলমান পুরুষ যদি অতৃপ্ত বাসনা নিয়ে মারা যায় তবে মামদো ভূত হয়ে পৃথিবীতে ফিরে আসে। এদের চেহারার বর্ণনাও বেশ মজার এবং কিছুটা ভয়ের। বলা হয়, মামদো ভূতেরা সাধারণত লম্বা-চওড়া হয়। তাদের মুখে লম্বা সাদা দাড়ি থাকে এবং পরনে থাকে লুঙ্গি ও মাথায় গোল টুপি। তবে এই ভূতকে খুব ভয়ংকর হিসেবে দেখা হয় না। বরং তাকে একটু বোকাসোকা, কখনো দুষ্টু আর কখনো হাস্যকর রূপেই বেশি তুলে ধরা হয়। এরা সাধারণত খুব একটা ক্ষতিকর হয় না, যদি না কেউ তাদের বিরক্ত করে। শান্ত স্বভাবের হয় এবং এক জায়গায় চুপচাপ বসে থাকতে পছন্দ করে।
বাংলার গ্রামগঞ্জে বিশ্বাস করা হয় যে, মামদো ভূতের প্রধান আস্তানা হলো অনেক পুরনো শেওলা ধরা বড় গাছ। বিশেষ করে পুরনো বটগাছ, বেলগাছ কিংবা পাকুড়গাছে এদের বসতি বেশি দেখা যায়। আবার গ্রাম এলাকায় কোনো পরিত্যক্ত মসজিদ কিংবা পুরনো কবরস্থানের আশপাশেও এদের দেখা মেলে বলে অনেকে দাবি করেন। মাঝরাতে যদি কেউ এসব এলাকার পাশ দিয়ে যায়, তবে নাকি নাকে কড়া আতরের গন্ধ পাওয়া যায়। এই আতরের গন্ধই হলো মামদো ভূতের উপস্থিতির জানান।
লোকগাথায় বলা হয়, মামদো ভূত সাধারণত রাতের বেলা দেখা দেয়। কখনো সে পথচারীকে ভুল পথে নিয়ে যায়, আবার কখনো অদ্ভুত প্রশ্ন করে বসে। কেউ যদি ভয় পেয়ে যায়, তাহলে সে আরও মজা পায়। কিন্তু কেউ যদি সাহস করে কথা বলে বা তাকে ফাঁকি দেয়, তখন উল্টো সে নিজেই বিপদে পড়ে যায়।
বাংলা সাহিত্যে মামদো ভূতের উপস্থিতি খুবই প্রাণবন্ত। শিশুদের ছড়া আর গল্পে এই ভূতকে প্রায়ই দেখা যায়। শিশুদের সঙ্গে খেলা বা ঘুম পাড়ানোর সময় একটা ছড়া গান খুবই জনপ্রিয়-
মামদো ভূতের ছানা
ছানা ছানা
যার একটা চোখ কানা
কানা কানা
সেই একটা চোখ রাঙিয়ে বলে
আমায় দেখে যা না
আমি মামদো ভূতের ছানা
আছে সবার জানা
আমি মামদো ভূতের ছানা
আছে সবার জানা
মামদো ভূত আসলে বাঙালির কল্পনার এক অবিচ্ছেদ্য অংশ। আমাদের লোকসংস্কৃতির রসে এ চরিত্রটি এমনভাবে মিশে রয়েছে যে, একে ছাড়া বাংলার ভূতের জগৎ যেন অসম্পূর্ণ। আধুনিক যুগে বিজ্ঞানের ভিড়ে ভূতেরা হয়তো হারিয়ে যাচ্ছে; কিন্তু বর্ষা রাতের আড্ডায় কিংবা লোডশেডিংয়ের অন্ধকারে এখনো মামদো ভূতের গল্প শুনলে আমাদের বুকটা একটু হলেও দুরুদুরু করে ওঠে। এই ভয় আর মজার মিশেলই হলো মামদো ভূতের আসল জাদু। আমাদের শৈশবের স্মৃতিতে এই সাদা দাড়িওয়ালা শান্ত ভূতটি চিরকাল বেঁচে থাকবে।




