শিক থেকে সিংহাসন: সবখানেই দাপিয়েছে কাবাব

ছবি: কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার তৈরি
ইতিহাসের গতিপথ কি কেবল রক্তক্ষয়ী যুদ্ধ, কূটনীতি আর সিংহাসন দখলের লড়াইয়েই নির্ধারিত হয়? ইতিহাসের পাতা ওল্টালে চেনা এই ধারণার বাইরে অন্যরকম অনেক গল্পের দেখা মেলে। কখনো কখনো কোনো এক রাজকীয় হেঁশেল থেকে ভেসে আসা পোড়া মাংস আর জাফরানের সুবাস বদলে দিয়েছে আস্ত একটা সাম্রাজ্যের সিদ্ধান্ত। তলোয়ারের ধার যেখানে কাজ করেনি, সেখানে ম্যাজিকের মতো কাজ করেছে মশলাদার তুলতুলে কাবাবের একেকটি টুকরো।
আজ ১০ জুলাই, বিশ্ব কাবাব দিবস। পোড়া মাংসের এই ধোঁয়াটে সুবাসের পেছনে লুকিয়ে আছে শত শত বছরের রাজকীয় উপাখ্যান, গোপন ষড়যন্ত্র আর ক্ষমতার পালাবদল। বিশেষ করে মোগলাই সালতানাত এবং এ অঞ্চলের বহু নবাবদের হাত ধরে কাবাব যেভাবে আভিজাত্যের শিখরে পৌঁছেছিল, তা কোনো রূপকথার চেয়ে কম নয়। তবে এও মাথায় রাখতে হবে- অনেক কিছুই এখানে লোকমুখে ছড়ায়। ঐতিহাসিকভাবে সত্যতা কতটুকু? তা নিয়ে হয়ত বিতর্ক করা যায়। কিন্তু ভোজনরসিকদের বিতর্ক করার কী দরকার?
চলুন, বিশ্ব কাবাব দিবসের এই বিশেষ ক্ষণে আমরা পাড়ি জমাই ইতিহাসের সেই মহাসড়কে, যেখানে মোগলদের রাজকীয় মাটন কাবাব আর নবাব ওয়াজেদ আলী শাহর দরবারের কিংবদন্তি গিলাফি কাবাব বদলে দিয়েছিল ইতিহাসের চাকা।
মোগলদের তলোয়ার থেকে শিক: রাজকীয় মাটন কাবাবের আদিপর্ব
ইতিহাসের মহাসড়কে আমাদের প্রথম স্টপেজ ষোড়শ শতাব্দীর হিন্দুস্তান। মোগল সাম্রাজ্যের প্রতিষ্ঠাতা জহিরুদ্দিন মুহাম্মদ বাবর যখন মধ্য এশিয়া থেকে খাইবার পাস পেরিয়ে এ দেশে আসছেন, তাঁর সঙ্গে কেবল যুদ্ধাস্ত্র আর সৈন্যদলই আসেনি, এসেছিল যাযাবর জীবনের এক আদিম খাদ্যসংস্কৃতি।
মধ্য এশিয়ার বিস্তীর্ণ মরুভূমি ও পাহাড়ি অঞ্চলে যুদ্ধের অবসরে বা শিকারের পর মোগল সেনারা তলোয়ারের ডগায় শিকার করা পশুর (প্রধানত ভেড়া বা খাসি) মাংস গেঁথে খোলা আগুনে পুড়িয়ে নিত। নুন আর সামান্য কিছু পাহাড়ি ভেষজ ছাড়া তাতে আর কোনো মশলা থাকত না। সেটিই ছিল মাটন কাবাবের আদিমতম রূপ।
কিন্তু বাবর বা হুমায়ুনের সেই সাদামাটা পোড়া মাংস খোলস বদলে এক রাজকীয় শিল্পে রূপ নিল সম্রাট আকবরের আমলে। জিল-ই-ইলাহী আকবরের দরবারে তখন নবরত্নদের মেলা। আবুল ফজলের 'আইন-ই-আকবরী' ঘাঁটলে দেখা যায়, আকবরের রাজকীয় হেঁশেল বা ‘তুপকানা’-তে পারস্য, মধ্য এশিয়া আর ভারতের সেরা বাবুর্চিদের নিয়োগ দেওয়া হয়েছিল।
আকবর বুঝতে পেরেছিলেন, রাজপুত বা স্থানীয় রাজাদের সঙ্গে মৈত্রী গড়তে এবং বিশাল সাম্রাজ্যকে এক সুতোয় বাঁধতে কেবল তলোয়ারের জোর যথেষ্ট নয়, দরকার সংস্কৃতির আদান-প্রদান। আর সেই সংস্কৃতির অন্যতম হাতিয়ার হয়ে উঠল খাবার টেবিল। মোগল হেঁশেলের মাটন কাবাবে যুক্ত হলো পারস্যের সুগন্ধি জাফরান, পেস্তা বাদাম বাটা, লবঙ্গ, এলাচ আর ভারতের নিজস্ব খাঁটি ঘি।
ধীরে ধীরে এই মাটন কাবাব কেবল খাবার রইল না, হয়ে উঠল কূটনীতির অংশ। কোনো বিদ্রোহী রাজাকে শান্ত করতে বা কোনো বিদেশি দূতকে মুগ্ধ করতে আকবরের দরবারে পরিবেশন করা হতো বিশেষ 'দুমপুক্ত' বা চারকোল ফায়ার মাটন কাবাব।
নরম, রসালো মাংসের একেকটি কামড়ে তখন মোহিত হয়ে যেতেন শুত্রুপক্ষের সেনানায়কেরা। একটু বাড়িয়ে যদি বলি, মোগলদের অর্ধেক যুদ্ধ জয় সহজ করে দিয়েছিল তাদের হেঁশেলের এই অতুলনীয় মাটন কাবাব!
সম্রাট জাহাঙ্গীরের আমলে এই মাটন কাবাবের আভিজাত্য পৌঁছায় অন্য মাত্রায়। নূরজাহানের নান্দনিক ছোঁয়ায় কাবাবে যুক্ত হয় গোলাপ জল আর কস্তুরীর সুবাস। এমনও তো হতে পারে- জাহাঙ্গীর যখন কোনো জটিল রাজনৈতিক সংকটে পড়তেন বা নূরজাহানের সঙ্গে কোনো বিষয়ে মতবিরোধ হতো, তখন বিশেষ এক ধরনের মাটন টিক্কি কাবাব পরিবেশন করা হতো, যা মুহূর্তেই রাজদরবারের উত্তপ্ত পরিবেশকে শান্ত করে দিত।
লখনউয়ের দরবার এবং দাঁতহীন নবাবের 'গিলাফি' বিপ্লব
ইতিহাসের মহাসড়ক ধরে আমরা যদি আরও দুইশত বছর এগিয়ে যাই, তবে আমাদের রথ এসে থামবে লখনউয়ের আওধ সাম্রাজ্যে। সালটি উনবিংশ শতাব্দীর মাঝামাঝি। মোগলদের সূর্য তখন অস্তমিত, কিন্তু লখনউতে তখন সংস্কৃতি, শায়েরি আর গ্যাস্ট্রোনমির এক নতুন সূর্য উদিত হয়েছে। আর এই সূর্য উদয়ের প্রধান কারিগর ছিলেন নবাব ওয়াজেদ আলী শাহ।
নবাব ওয়াজেদ আলী শাহ ছিলেন শিল্পের সমঝদার, পরম বিলাসী এবং ভোজনরসিক। কিন্তু প্রকৃতির এক নিষ্ঠুর নিয়মে প্রৌঢ় বয়সে পৌঁছানোর আগেই নবাব তাঁর দাঁতগুলো হারিয়ে ফেলেন। একজন আভিজাত্যপূর্ণ, ভোজনরসিক নবাবের জন্য এর চেয়ে বড় ট্র্যাজেডি আর কী হতে পারে! মাংস চিবিয়ে খাওয়ার ক্ষমতা নেই, অথচ চোখের সামনে সাজানো রাজকীয় মাটন কাবাব- নবাবের মন খারাপের মেঘে ঢেকে গেল পুরো আওধের দরবার।
নবাব তখন তার প্রধান বাবুর্চি বা 'রকাবদার'-দের ডেকে এক কঠিন ফরমান জারি করলেন:
"এমন এক কাবাব তৈরি করো, যা ছোঁয়ামাত্র ভেঙে যাবে, মুখে দিলে মাখনের মতো মিলিয়ে যাবে, অথচ যার স্বাদ হবে দুনিয়ার যেকোনো মাটন কাবাবের চেয়ে সেরা। যদি না পারো, তবে দরবার থেকে বিদায় নাও।"
শাহী বাবুর্চিদের মাথায় আকাশ ভেঙে পড়ল। মাংস অথচ চিবানো লাগবে না- এও কি সম্ভব?
শুরু হলো লখনউয়ের রাজকীয় হেঁশেলে এক গোপন ও ঐতিহাসিক পরীক্ষা-নিরীক্ষা। দিনের পর দিন, রাতের পর রাত বাবুর্চিরা মাংসের কিমা নিয়ে গবেষণা করতে লাগলেন।
অবশেষে জন্ম নিল এক কালজয়ী রেসিপি, যা ইতিহাসের গতিপথ এবং রন্ধনশিল্পের সংজ্ঞা চিরতরে বদলে দিল। জন্ম হলো 'গিলাফি কাবাব'-এর (অনেকে একে গলোটি কাবাবেরই একটি বিশেষ রূপভেদ বলেন)।
'গিলাফ' শব্দের অর্থ খাপ বা আবরণ। এই কাবাবটি তৈরির প্রক্রিয়াটি ছিল এক জাদুকরি শিল্প। ছাগলের মাংসের সবচেয়ে নরম অংশকে বেছে নিয়ে তা এত সূক্ষ্মভাবে কিমা করা হতো, যাতে মাংসের কোনো আঁশ অবশিষ্ট না থাকে। এরপর সেই কিমাকে নরম করার জন্য মেশানো হতো কাঁচা পেঁপের কষ। কিন্তু আসল টুইস্ট ছিল এর মশলায়।
প্রায় ১৫০টিরও বেশি গোপন ভারতীয় ভেষজ ও মশলা একসঙ্গে বেটে মিশিয়ে দেওয়া হতো সেই মাংসে।
এরপর মাংসের সেই মণ্ডকে একটি মখমলের কাপড়ে বা জাদুকরি আবরণে (গিলাফ) জড়িয়ে বা হাত দিয়ে অত্যন্ত সাবধানে হালকা ঘিয়ে সেঁকে নেওয়া হতো।
কয়লার হালকা আঁচে তৈরি হওয়া এই কাবাব যখন নবাবের সামনে আনা হলো, নবাব চামচ দিয়ে ছোঁয়ামাত্র তা গলে গেল। মুখে দিতেই কোনো রকম চিবানো ছাড়াই সেই কাবাব নবাবের তৃষ্ণা মেটাল।
কথিত আছে, এই গিলাফি কাবাব খেয়ে নবাব ওয়াজেদ আলী শাহ এতটাই খুশি হয়েছিলেন যে, তিনি সেই বাবুর্চিসুলভ দলকে সোনা-দানায় ভরিয়ে দিয়েছিলেন। শুধু তাই নয়, এই কাবাবের স্বাদ নবাবকে এতটাই রোমান্টিক ও প্রফুল্ল করে তুলেছিল যে, ব্রিটিশদের রাজনৈতিক চাপের মুখেও তিনি লখনউয়ের সংস্কৃতিকে বাঁচিয়ে রাখার নতুন প্রেরণা পেয়েছিলেন।
পরবর্তীতে নবাব যখন কলকাতায় নির্বাসিত হন, তাঁর সঙ্গে এসেছিলেন এই বাবুর্চিরাই। আর তাঁদের হাত ধরেই মেটিয়াবুরুজ হয়ে আজ আমাদের এই বাংলায় ছড়িয়ে পড়েছে কাবাবের সেই রাজকীয় সুবাস।
কাবাব: শুধু খাবার নয়, সংস্কৃতির এক অনন্য সেতু
আজকের আধুনিক যুগে দাঁড়িয়ে যখন আমরা কোনো রেস্তোরাঁয় বসে মাটন শিক কাবাব বা রেশমি গিলাফি কাবাবের অর্ডার দিই, তখন আমরা আসলে কেবল প্লেটের খাবার খাই না; আমরা চিবিয়ে খাই ইতিহাসের একেকটি সোনালী পাতা।
মাটন কাবাব আমাদের মনে করিয়ে দেয় মধ্য এশিয়ার সেই রুক্ষ যুদ্ধক্ষেত্রকে, যেখানে মানুষ বেঁচে থাকার তাগিদে প্রথম আগুনের সঙ্গে মাংসের মিতালী ঘটিয়েছিল। আর গিলাফি কাবাব আমাদের নিয়ে যায় লখনউয়ের সেই সুরধাম ও শায়েরির আলো-ছায়ায়, যেখানে শারীরিক অক্ষমতাকেও হারিয়ে দিয়েছিল মানুষের রন্ধনশিল্পের সৃজনশীলতা।
ইতিহাসের গতিপথ বদলে দেওয়া এই দুই কাবাব আজ বিশ্বজুড়ে গ্যাস্ট্রোনমির জগতে এক অনন্য সম্পদ। একটিতে আছে মোগলদের শৌর্য-বীর্য আর কয়লার আগুনের তীব্রতা, অন্যটিতে আছে নবাবদের বিলাসিতা আর মখমলের মতো কোমলতা।
আজকের এই বিশ্ব কাবাব দিবসে তাই আপনার প্লেটে যখন ধোঁয়া ওঠা গরম কাবাবের টুকরোটি আসবে, চোখ বন্ধ করে একবার সেই সুবাসটি নিন।
অনুভব করুন- আজ থেকে পাঁচশত বছর আগে ঠিক এই সুবাসটিই সম্মোহিত করেছিল কোনো এক মোগল সম্রাটকে, কিংবা দেড়শত বছর আগে কোনো এক নবাবকে এনে দিয়েছিল জীবনের পরম তৃপ্তি।
শিক থেকে শুরু হওয়া সেই যাত্রা আজ আপনার প্লেটে এসে থমকে দাঁড়িয়েছে। শুভ বিশ্ব কাবাব দিবস! ইতিহাসের এই সুস্বাদু মহাসড়কে আপনার যাত্রা আনন্দময় হোক।






