আড়ালে থাকা কাঁঠালিচাঁপা

গ্রাফিকস: আগামীর সময়
কিছু ফুল খুঁজে পেতে হয়। এরা বাগানের অন্য ফুলের মতো চোখের সামনে এসে দাঁড়ায় না; বড় বড় পাতার আড়ালে নীরবে লুকিয়ে থাকে। হঠাৎ একদিন এর গন্ধ বাতাসে ভেসে এসে জানিয়ে দেয়— আমি আছি। কাঁঠালিচাঁপা তেমনই এক ফুল। অনেকটা আবিষ্কারের মতো করেই যেন তাকে খুঁজে পাওয়া যায়।
কাঁঠালিচাঁপার গাছ প্রথম দেখায় খুব একটা চমক জাগায় না। বড় বড় উজ্জ্বল পাতার ভিড়ে ফুলটি বেশ ছোট। দেখতে অনেকটা আতা ফুলের মতো। গাছের ডালপালা প্রথমে শক্ত হয়ে সোজা দিকে বাড়ে, পরে ধীরে ধীরে লতিয়ে উঠতে থাকে। পাতাগুলোও একসঙ্গে ঝরে পড়ে না। ফলে বছরের বেশিরভাগ সময়ই গাছটি সবুজ, সতেজ ও সুন্দর থাকে। আর ফুল ফোটার মৌসুমে এর পরিচয় মেলে গন্ধে।
ফুলটি যখন কাঁচা সবুজ, তখন এর উপস্থিতি সহজে টের পাওয়া যায় না। ধীরে ধীরে ফুলের রঙ বদলে হলুদ কিংবা সোনালি হলুদ হলে বাতাসে ছড়িয়ে পড়ে এক অপূর্ব সুঘ্রাণ। সেই গন্ধে পাকা কাঁঠালের মিষ্টি আবেশ। বিশেষ করে রাতের বাতাসে এর ঘ্রাণ অনেক দূর পর্যন্ত ছড়িয়ে যায়। ফুলের গন্ধই তখন পথ দেখায়— পাতার আড়ালে কোথাও ফুটে আছে কাঁঠালিচাঁপা।
বর্ষাকালই মূলত এর ফুল ফোটার সময়। তবে ফুল পাওয়া সবসময় এত সহজ নয়। এখন অনেকে শখ করে টবে কাঁঠালিচাঁপা লাগানোর চেষ্টা করছেন, ঘরের বারান্দা কিংবা ছাদবাগানে এর সবুজ সৌন্দর্য যোগ করতে চাইছেন। কিন্তু গাছ পাওয়া গেলেই যে ফুল মিলবে, এমন নয়। ফুলের জন্য অপেক্ষা করতে হয়।
আমার কাঁঠালিচাঁপার সঙ্গে প্রথম পরিচয় অবশ্য গাছ দেখে নয়, কবিতার মাধ্যমে। সোনালী কাবিনের কবি আল মাহমুদের ‘পাখির মতো’ কবিতার প্রথম চারটি লাইনেই প্রথম শুনেছিলাম নামটি—‘আম্মা বলেন, পড়রে সোনা; আব্বা বলেন, মন দে; পাঠে আমার মন বসে না; কাঁঠালচাঁপার গন্ধে।’
তখন কাঁঠালচাঁপা আমার কাছে ছিল শুধু একটি অচেনা ফুলের নাম। ফুলটির গন্ধ কেমন, দেখতে কেমন— কিছুই জানা ছিল না। শুধু কবিতার চারটি লাইনের ভেতর দিয়ে এর একটি অদৃশ্য গন্ধ যেন মনে গেঁথে ছিল।
বহুদিন পর সেই অচেনা ফুলের দেখা মিলল রংপুরের মিঠাপুকুরের পায়রাবন্দে। নারী জাগরণের অগ্রদূত বেগম রোকেয়ার জন্মভিটাসংলগ্ন এলাকায় গড়ে ওঠা বেগম রোকেয়া স্মৃতিকেন্দ্রের টিউবওয়েলপাড়ে চোখে পড়ল গাছটি। বড় বড় পাতার আড়ালে দাঁড়িয়ে থাকা গাছটি দেখে চিনতে পারলাম— এই সেই কাঁঠালিচাঁপা!
তবে গাছ দেখা তো হলো, ফুল কোথায়? অপেক্ষা চলল। এক গ্রীষ্মের শেষদিকে, বর্ষার আগমনী বিকালে অবশেষে সেই অপেক্ষার অবসান হলো। ফুটল ছোট্ট একটি ফুল। আর ফুলটির কাছে যেতেই যেন বহু বছর আগের কোনো দরজা খুলে গেল। গন্ধটা নাকে আসতেই মনে হলো— এ তো খুব চেনা! কোথায় যেন পেয়েছি এই গন্ধ!
মুহূর্তেই ফিরে গেলাম ছোটবেলায়। ব্যানানা চুইংগাম খাওয়ার সেই দিনগুলোতে। কাঁঠালিচাঁপার গন্ধে হুবহু সেই ফ্লেভার! অচেনা একটি ফুল হঠাৎ করেই হয়ে উঠল শৈশবের খুব পরিচিত এক স্মৃতি।
কাঁঠালিচাঁপার সৌন্দর্য শুধু ফুলে নয়, গাছের অবয়বেও। ফুল ফোটা শেষ হয়ে গেলে বছরের বাকি সময়টায় গাছটিকে নানা রকম আকৃতি দেওয়া যায়। বয়স বাড়লে ডালপালার ভারে গাছ নুয়ে পড়ে। ছোট ছোট ডাল কখনো কখনো কাঁটার মতো রূপ নেয়। উজ্জ্বল পাতার আড়ালে তখনো সে নিজের স্বতন্ত্র সৌন্দর্য ধরে রাখে।
ফুলের রঙ হলদেটে থেকে সোনালি হলুদ। ফুল কাক্ষিক, পাপড়ি ছয়টি এবং প্রসারিত। ফুলের বোঁটা বাঁকানো, অনেকটা আঁকশির মতো। দূর থেকে ফুল ও ফলের গঠন কখনো কখনো আঙুরের থোকার কথা মনে করিয়ে দেয়। পাখিরাও এর ফল বেশ পছন্দ করে।
কাঁঠালিচাঁপার ইংরেজি নাম Climbing lang lang বা Tail Grape। উদ্ভিদতাত্ত্বিক নাম Artabotrys hexapetalus। এটি Annonaceae পরিবারের উদ্ভিদ। ভারতবর্ষের কোথাও কোথাও এর নাম মনোরঞ্জিনী। মিয়ানমার ও শ্রীলঙ্কার কোনো কোনো অঞ্চলে একে Ejang elang নামেও ডাকা হয়। সাধারণত গুটিকলম ও বীজের মাধ্যমে এর বংশবিস্তার করা যায়।
তবে এসব পরিচয়ের বাইরেও কাঁঠালিচাঁপাকে মনে রাখার আরেকটি কারণ আছে। কিছু ফুল চোখে দেখা যায়, কিছু ফুল চেনা যায় গন্ধে। কাঁঠালিচাঁপা যেন সেই দ্বিতীয় দলের। বড় বড় পাতার আড়ালে লুকিয়ে থেকেও সে তার উপস্থিতি জানান দেয় বাতাসে ভেসে আসা এক মায়াময় সুবাসে।
আর সেই সুবাস কখনো কবিতার পঙ্ক্তি ধরে নিয়ে যায়, কখনো শৈশবের চুইংগামের স্বাদে, কখনো বর্ষার ভেজা বিকালে। তাই কাঁঠালিচাঁপা শুধু একটি ফুল নয়— এ যেন লুকিয়ে থাকা এক স্মৃতি, যার কাছে পৌঁছাতে হলে আগে এর গন্ধের অনুসরণ করতে হয়।
লেখক: কৃষিবিদ ও গবেষক




