আসামের পাহাড়ের ওই পাখিগুলো কি সত্যি আত্মহত্যা করে

পাখিরা সাধারণত রাতে চলাচলের সময় চাঁদ, তারা কিংবা পৃথিবীর চৌম্বকীয় ক্ষেত্রের সাহায্যে নিজেদের দিক ঠিক রাখে
পাহাড়ের বুকে রাত নেমেছে। নিচে সমতলে তখনও আলোর স্পষ্ট রেখা মিটিমিটি জ্বলে, কিন্তু এই উচ্চতার গ্রামটায় রাত যেন অনেক আগে থেকেই আসে। নির্জন, ঘন কুয়াশামোড়া, নিঃশব্দে ঢেকে ফেলে চারপাশ। এখানে বাতাসও হাঁটে পা টিপে টিপে। চা-বাগানের ফাঁকে বাঁশঝাড়গুলো যেন ফিসফিস করে কিছু বলে। গাছের ডালে হালকা সোঁদা গন্ধ, ভেজা পাতায় জলের ঝরাঝরা শব্দ—সব মিলিয়ে এক জাদুকরী নীরবতা। এমনই এক জায়গা ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলের পাহাড়ি রাজ্য আসামের ডিম হাসাও জেলা। আর এই নিস্তব্ধ সৌন্দর্যের মাঝেই লুকিয়ে রয়েছে এক প্রাচীন পাহাড়ি গ্রাম, জাতিঙ্গা। দিনে জাতিঙ্গা শান্ত, সবুজ, সৌম্য। গ্রামের শিশুরা খেলে কাদামাখা পথঘাটে, বৃদ্ধরা পানের রসে মুখ রাঙিয়ে গল্পে মেতে থাকে। কিন্তু রাত এলেই বদলে যায় সবকিছু। বর্ষার শেষভাগে, সেপ্টেম্বর থেকে নভেম্বরের অমাবস্যার রাতগুলোতে জাতিঙ্গা হয়ে ওঠে যেন অন্য এক পৃথিবী, যেখানে আকাশ থেকে নেমে আসে অদ্ভুত এক নীরব মৃত্যু।
হ্যাঁ, এক চরম রহস্যময় মৃত্যু। রাতের শুরুতেই আচমকা ঘটে যায় প্রথম ঘটনাটা। একটা পাখি, কোনো চিৎকার বা ডানা ঝাপটানোর শব্দ না করে—আলো জ্বলা উঠোনে এসে ঝুপ করে পড়ে যায়। তারপর আরও এক-দু’টো… তারপর ডজন ডজন। সকালে দেখা যায়, স্কুলের ছাদ, বাঁশঝাড়ের তলা কিংবা বাজারের চাতালে সারি সারি পাখির মৃতদেহ। কোনো ক্ষত নেই, রক্ত নেই, তবু মরে আছে তারা। হতভম্ব চোখ, নিথর শরীর। তারপর প্রতি রাতেই যেন একই দুঃস্বপ্নের পুনরাবৃত্তি। গ্রামের মানুষ ভয় পায়। বুড়ো সাধু বলে, “এই পাখিরা আত্মা হয়ে আসে। পাহাড়ের নিচে ঘুমিয়ে থাকা মৃতদের দূত। প্রতি বছর এই সময় তারা জেগে ওঠে... আলো দেখলেই ছুটে আসে—যেন কোনো গোপন মন্ত্র টানে।”
লোককথা জন্ম নেয় গভীর শিকড় গেড়ে। অমঙ্গলের ভয়ে কেউ পাখিদের ডানা কেটে তাবিজ বানাত, কেউ দরজায় ঝুলিয়ে রাখত শুকিয়ে যাওয়া ঠোঁট। আবার কেউ কেউ ইচ্ছে করেই বাড়ির ছাদে মাটির প্রদীপ বা মশাল জ্বালিয়ে রাখত—পাখিদের আকৃষ্ট করার জন্য। কারণ তাদের বিশ্বাস ছিল, যত বেশি পাখি আছড়ে পড়বে, পুরোহিতের মন্ত্র তত বেশি শক্তিশালী হবে। ১৯৭০-এর দশকে এই ঘটনা প্রথম বড় করে ছাপা হয় স্থানীয় পত্রিকায়। পরে তা ছড়িয়ে পড়ে গোটা ভারতবর্ষে, এমনকি আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমেও। বিবিসি এক রিপোর্টে লেখে, ‘বার্ডস কমিটিং সুইসাইড ইন ইন্ডিয়ান ভিলেজ’। বিদেশি পাখিবিদরা আসেন, টেলিভিশনের ক্রু ক্যামেরা নিয়ে হাজির হয়, গ্রামে তৈরি হয় উৎসুক দর্শকের ভিড়। তবে গ্রামের মানুষ জানত, এটা শুধু খবরের খোরাক নয়, এ এক শতাব্দী পুরনো ভয়, যা তারা বুকে করে বয়ে চলেছে। প্রতি রাতে, আলোর কাছে ছুটে আসা সেই শত শত পাখি যেন বয়ে আনত অদৃশ্য কারও বার্তা। আর আলো—যা সাধারণত জীবনদায়ী—সেই আলোতেই জাতিঙ্গায় লেখা হতো রহস্যময় এক মৃত্যুপুরাণ।
যেখানে একপাশে জাতিঙ্গার বাতাসে ভেসে বেড়াত অলৌকিক গল্পের ধোঁয়া, সেখানে অন্যপাশে একদল মানুষ খুঁজতে শুরু করেন প্রকৃতির কঠিন কিন্তু বাস্তব যুক্তি। সে খোঁজে নামেন ভারতের ‘বার্ডম্যান’ হিসেবে খ্যাত প্রখ্যাত পক্ষীবিদ সলিম আলি এবং ইংরেজ প্রকৃতি গবেষক ই. পি. জি। ১৯৬১ সালে তাঁরা প্রথমবার জাতিঙ্গায় এসে এই রহস্যময় ঘটনার গভীরে প্রবেশ করেন। রাতের আঁধারে বসে থাকেন আলো জ্বেলে, ছায়া গোনেন—এবং পাখিদের আচরণ পর্যবেক্ষণ করতে থাকেন নিঃশব্দে। পরবর্তীতে ভারতের জুলজিক্যাল সার্ভে অব ইন্ডিয়া (জেডএসআই)-র গবেষক সুধীর সেনগুপ্ত এবং বিশিষ্ট পক্ষীবিদ ড. আনোয়ারউদ্দিন চৌধুরী এই গবেষণা আরও এক ধাপ এগিয়ে নিয়ে যান। তাদের সম্মিলিত গবেষণায় উঠে আসে চাঞ্চল্যকর এক বৈজ্ঞানিক সত্য।
বিজ্ঞানীরা স্পষ্ট করে জানিয়ে দেন—পাখিরা কখনোই ‘আত্মহত্যা’ করে না। আত্মহত্যার মতো অতি জটিল মানসিক ও সামাজিক অনুভূতি পাখির মস্তিষ্কে থাকা জৈবিকভাবে অসম্ভব। এটি মূলত একটি চরম ভৌগোলিক, আবহাওয়াগত ও প্রাকৃতিক বিভ্রান্তির ট্র্যাজেডি, যাকে বিজ্ঞানের ভাষায় বলা হয় ‘ফটোট্যাক্সিস’ (আলোর প্রতি শারীরিক প্রতিক্রিয়াশীলতা) এবং তীব্র দিকভ্রান্তি।
জাতিঙ্গার অনন্য ভৌগোলিক অবস্থানই এই ঘটনার মূল নেপথ্য অনুঘটক। গ্রামটি অবস্থান করছে একটি অতি সরু পাহাড়ি গিরিশিরা বা ‘রিজ’-এর ওপর, যার দুই প্রান্ত দিয়ে প্রায় সর্বদাই দ্রুতবেগে ঠান্ডা পাহাড়ি হাওয়া প্রবাহিত হয়। সেপ্টেম্বর ও অক্টোবর মাসে যখন উত্তর-পূর্ব মৌসুমি বায়ুর আগমন ঘটে, তখন এখানকার উপত্যকায় সৃষ্টি হয় ঘন কুয়াশা, মেঘ ও গুঁড়ি গুঁড়ি বৃষ্টির এক ভারী আস্তরণ। এর সাথে যুক্ত হয় দক্ষিণ-পশ্চিম দিক থেকে ধেয়ে আসা ঘণ্টায় বহু কিলোমিটার বেগের সাময়িক ঝোড়ো হাওয়া। এই বিশেষ সময়ে জাতিঙ্গার আশেপাশের বনাঞ্চলে বসবাসকারী স্থানীয় ও আঞ্চলিক পরিযায়ী পাখিগুলো—যেমন ফিঙে, বক, জলপিপি, কোয়েল, মাছরাঙা—রাতে হঠাৎ করে চরম প্রাকৃতিক দুর্যোগের মুখে পড়ে।
পাখিরা সাধারণত রাতে চলাচলের সময় চাঁদ, তারা কিংবা পৃথিবীর চৌম্বকীয় ক্ষেত্রের সাহায্যে নিজেদের দিক ঠিক রাখে। একে বলা হয় তাদের ‘বায়োলজিক্যাল নেভিগেশন সিস্টেম’। কিন্তু কুয়াশার পুরু চাদরে আকাশ পুরোপুরি ঢেকে গেলে এবং পাহাড়ি বাতাসের ধাক্কায় তাদের স্বাভাবিক উড্ডয়ন ব্যাহত হলে, তারা সম্পূর্ণ দিকবিদিক শূন্য বা ‘ডেসোরিয়েন্টেড’ হয়ে পড়ে। এই ভয়াবহ দিকভ্রান্ত মুহূর্তে দিশেহারা পাখিরা যখন জীবন বাঁচানোর জন্য মরিয়া হয়ে ওঠে, ঠিক তখনই পাহাড়ের বুকে মানুষের ঘরে জ্বলতে থাকা লণ্ঠন, আগুনের মশাল কিংবা ফ্লাডলাইটের উজ্জ্বল আলো দেখতে পায়।
কুয়াশাচ্ছন্ন অন্ধকারের মধ্যে এই আলোকে তারা জীবনদায়ী নিরাপদ আশ্রয় বা দিকচিহ্ন ভেবে ভুল করে। পাখির চোখে থাকা আলো-সংবেদনশীল কোষ—‘রেটিনা’—সেই আলোক-আবাহনে বিভ্রান্ত হয়। তারা তীব্র গতিতে আলোর উৎসের দিকে ধেয়ে আসতে থাকে। কিন্তু অন্ধভাবে ছুটে আসার সময় তারা ঘরের শক্ত দেয়াল, গাছের ডালপালা কিংবা তারে মারাত্মক জোরে আছড়ে পড়ে। আঘাতে তাদের ডানা ভেঙে যায়, তারা মাটিতে ছিটকে পড়ে এবং সংজ্ঞাহীন বা অর্ধচেতন হয়ে পড়ে। সবচেয়ে করুণ বিষয় হলো, মাটিতে পড়ে থাকা বিভ্রান্ত ও প্রায় অসাড় এই পাখিগুলোকে আগে গ্রামের মানুষ সহজ শিকার মনে করে বাঁশের লাঠি দিয়ে পিটিয়ে মেরে ফেলত বা খাদ্য হিসেবে গ্রহণ করত। বাহ্যিক এই শিকার ও আঘাতের ঘটনাকেই বিশ্বজুড়ে ‘আত্মহত্যা’ বলে ভুল ব্যাখ্যা করা হয়েছিল।
বিজ্ঞানীদের অনুসন্ধানে আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ ভূ-পদার্থবৈজ্ঞানিক তথ্য বেরিয়ে আসে। বর্ষার শেষভাগে অতিরিক্ত বৃষ্টির জল পাহাড়ি শিলাস্তরের গভীর ফাঁক দিয়ে নিচে নেমে গিয়ে ভূগর্ভস্থ স্থানীয় চৌম্বকীয় বৈশিষ্ট্যে সাময়িক বিচ্যুতি ঘটায়। ফলে রাতের বেলা যেসব পাখি গাছের ডালে ঘুমাচ্ছিল, তাদের প্রাক-সুষুপ্তিকালীন দিশা সম্পূর্ণ নষ্ট হয়ে যেত এবং তারা উড়তে বাধ্য হয়ে সোজা আলোর ফাঁদে গিয়ে পড়ত।
তবে সময় বদলেছে। প্রকৃতির এই করুণ পরিণতি রুখতে আজ জাতিঙ্গায় নেমে এসেছে সচেতনতার জোয়ার। ২০০০ সালের পর থেকে আসামের বনবিভাগ, বিভিন্ন বন্যপ্রাণী সংরক্ষণ সংস্থা এবং গবেষকদের টানা প্রচেষ্টায় জাতিঙ্গায় চালু হয়েছে ‘নো লাইট জোন’। অমাবস্যার কুয়াশাচ্ছন্ন রাতগুলোতে গ্রামজুড়ে উচ্চশক্তির হাই-ভোল্টেজ আলো জ্বালানো সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ করা হয়েছে। ঘরের আলোতেও ব্যবহার করা হচ্ছে ঢাকনা, যাতে তা সরাসরি আকাশে না ছড়ায়। এক সময়ের আতঙ্কিত জাতিঙ্গা আজ নিজ হাতে বদলে নিয়েছে তার ইতিহাস।
গ্রামের মানুষ এখন আর পাখির ঘাতক নয়, তারা হয়ে উঠেছে ডানাকাটা পাখিদের প্রথম রক্ষক। রাতে কুয়াশা নামলেই স্বেচ্ছাসেবক তরুণরা ঘুরে বেড়ায় পাহাড়ি পথে। মাটিতে পড়ে থাকা আহত পাখি পেলেই তারা আলতো হাতে তুলে নেয়, সেবা দিয়ে সুস্থ করে তুলে দেয় মুক্ত আকাশে। প্রতি বছর সেপ্টেম্বর মাসে এখন আয়োজিত হয় ‘জাতিঙ্গা পাখি উৎসব’। দূর-দূরান্ত থেকে আসা পর্যটক ও পক্ষীবিদরা এখন পাখির মৃত্যু দেখতে নয়, বরং পাখিদের জীবন বাঁচানোর এই মানবিক লড়াই দেখতে এখানে ভিড় জমান। ছোট ছোট শিশুরা আঁকে হাজারো পাখির ছবি। গত দুই দশকে সরকারি প্রতিবেদন অনুসারে, জাতিঙ্গায় পাখি আছড়ে পড়ার ঘটনা ৭০ শতাংশেরও বেশি হ্রাস পেয়েছে।
জাতিঙ্গার আকাশে এখনো সন্ধ্যার পর কুয়াশা নামে, বাঁশঝাড়ের ফাঁক দিয়ে ঝাপসা চাঁদ দেখা যায়। কিন্তু সেই রাতের নীরবতায় আজ আর মৃত্যুর ভয় নেই, আছে প্রশান্তির সুর।
তথ্যসূত্র
দ্য জাটিঙ্গা বার্ড মিস্ট্রি – সাইন্টিফিক আমেরিকান (১৯৭৭)
সলিম আলি ও ই. পি. জি – ফিল্ড অবজারভেশনস অ্যান্ড নোটস অন জাটিঙ্গা ফিনোমেনন (১৯৬১)
সুধীর সেনগুপ্ত – জুলজিক্যাল সার্ভে অব ইন্ডিয়া রিপোর্ট অন জাটিঙ্গা (১৯৭৯)
আনোয়ারউদ্দিন চৌধুরী – দ্য বার্ডস অব আসাম
এ এন আই সাইন্স, বিবিসি আর্থ, আসাম ট্রিব্রিউন, দ্য হিন্দু










