বড়দিনে উপহার দিতে আসে ১৩ ভাই!

আইসল্যান্ডের এই ১৩ অদ্ভুত চরিত্রের নাম ‘ইউল ল্যাডস’
বড়দিনের কথা উঠলে বিশ্বের অনেক দেশের মানুষের মতো আমাদের মনেও প্রথমে ভেসে ওঠে সান্তা ক্লজের ছবি। লাল পোশাক, সাদা দাড়ি আর উপহারের ঝুলি হাতে এক বৃদ্ধ। শিশুদের জন্য উপহার নিয়ে আসেন তিনি। তবে আইসল্যান্ডের বড়দিনের লোককথায় উপহার বিলানোর দায়িত্ব শুধু একজনের নয়, বরং ১৩ জনের! তাদের প্রত্যেকের রয়েছে আলাদা নাম, স্বভাব ও বিচিত্র কর্মকাণ্ড। কেউ চামচ চেটে খান, কেউ হাঁড়ির তলা থেকে খাবার চেটে নেন, কেউ আবার জানালায় উঁকি দিয়ে ঘরের ভেতর কী হচ্ছে তা দেখেন। আইসল্যান্ডের এই ১৩ অদ্ভুত চরিত্রের নাম ‘ইউল ল্যাডস’।
আইসল্যান্ডের বড়দিনের ঐতিহ্যে ইউল ল্যাডসের উপস্থিতি বেশ পুরোনো। স্থানীয় লোককথা অনুযায়ী, তারা পাহাড়ে বসবাসকারী দুই ট্রল- গ্রিলা ও লেপ্পালুদি দম্পতির সন্তান। তাদের মা গ্রিলা ছিলেন ভয়ংকর এক দৈত্যাকৃতির নারী। দুষ্টু শিশুদের ধরে নিয়ে গিয়ে রান্না করে খাওয়ার গল্প প্রচলিত ছিল তাকে ঘিরে। অন্যদিকে ইউল ল্যাডসেরাও শুরুতে মোটেও উপহার বিলানো ভালো মানুষ ছিলেন না। বরং মানুষের বাড়িতে ঢুকে খাবার চুরি করা, দরজা আছড়ে বন্ধ করা কিংবা নানা রকম দুষ্টুমি করাই ছিল তাদের কাজ।
তবে সময়ের সঙ্গে বদলে গেছে তাদের চরিত্র। ভয়ংকর লোককথার সেই দুষ্টু ট্রলরাই এখন আইসল্যান্ডের শিশুদের কাছে বড়দিনের আনন্দের প্রতীক।
একেক রাতে আসেন একজন
আইসল্যান্ডে বড়দিনের আগের ১৩ রাতকে ঘিরে ইউল ল্যাডসের আগমনের ঐতিহ্য গড়ে উঠেছে। প্রতি বছর ১২ ডিসেম্বর থেকে শুরু হয় তাদের আগমন। একেক রাতে পাহাড় থেকে নেমে আসেন একজন করে। এভাবে ২৪ ডিসেম্বর বড়দিনের আগের রাতে শেষজনের আগমন ঘটে।
তাদের প্রত্যেকের নামের মধ্যেই লুকিয়ে আছে স্বভাবের পরিচয়। প্রথমজন স্টেকিয়াস্তাউর বা শিপ-কোট ক্লড। ভেড়ার খোঁয়াড়ে গিয়ে ভেড়াদের বিরক্ত করাই তার কাজ।
দ্বিতীয়জন গিলিয়াগাউর, যে গোয়ালঘরে ঢুকে দুধ চুরি করে। তৃতীয়জন স্তুফুর, যে উচ্চতায় খাটো। চতুর্থজন থভোরুস্লেইকির চামচ চেটে খেতে ভালোবাসে। পঞ্চমজন পত্তাস্লেইকির, যে কিনা হাঁড়ির গায়ে লেগে থাকা খাবার চেটে খায়।
তালিকায় আরও আছে বাটি চাটা, দরজা আছড়ে বন্ধ করা, স্কির নামের আইসল্যান্ডীয় দুগ্ধজাত খাবার গোগ্রাসে খাওয়া, সসেজ চুরি, জানালায় উঁকি দেওয়া, দরজার কাছে দাঁড়িয়ে খাবারের গন্ধ শোঁকা, মাংস চুরি এবং মোমবাতি নিয়ে পালানোর মতো বিচিত্র স্বভাবের চরিত্র।
এভাবে ১৩ জনের প্রত্যেকের রয়েছে আলাদা পরিচয়। তাদের নামগুলোও মূলত পুরোনো আইসল্যান্ডের কৃষিজীবী সমাজ ও গৃহস্থালির নানা অভিজ্ঞতার সঙ্গে সম্পর্কিত।
জানালার পাশে জুতা রাখলেই উপহার!
ইউল ল্যাডসদের নিয়ে আইসল্যান্ডের সবচেয়ে মজার প্রথাটি হলো, শিশুরা ঘুমাতে যাওয়ার আগে জানালার পাশে নিজেদের জুতা রেখে দেয়। ধারণা করা হয়, রাতে পাহাড় থেকে নেমে আসা ইউল ল্যাডদের কেউ একজন সেই জুতার মধ্যে উপহার রেখে যাবে। ভালো আচরণ করা শিশুরা সকালে উঠে ছোটখাটো উপহার পায়। আর যারা দুষ্টুমি করেছে, তাদের জুতায় অপেক্ষা করে একটি কাঁচা আলু!
প্রতি রাতে একজন করে আসার পাশাপাশি তাঁদের বিদায়েরও রয়েছে নির্দিষ্ট নিয়ম। যিনি সবার আগে আসেন, তিনি বড়দিনের পরদিন ফিরে যেতে শুরু করেন। এরপর একে একে বাকিরাও বিদায় নেন। ৬ জানুয়ারি শেষজন ফিরে গেলে আইসল্যান্ডে বড়দিনের উৎসবের আনুষ্ঠানিক সমাপ্তি ঘটে। দিনটি স্থানীয়ভাবে ‘থ্রেত্তান্দিন’ নামে পরিচিত।
এই ঐতিহ্যের কথা আইসল্যান্ডের সরকারি পর্যটন সংস্থা ‘ভিজিট আইসল্যান্ড’ এবং দেশটির উত্তরাঞ্চলীয় পর্যটন সংস্থার ওয়েবসাইটেও তুলে ধরা হয়েছে।
ভয়ংকর ট্রল থেকে বড়দিনের আনন্দ
তবে ইউল ল্যাডসদের বর্তমান রূপ এক দিনে তৈরি হয়নি। অতীতে আইসল্যান্ডের বিভিন্ন অঞ্চলে তাদের সংখ্যা, নাম ও স্বভাবের মধ্যে পার্থক্য ছিল। কোথাও তারা ছিলেন ভয়ংকর দানব, কোথাও আবার সাধারণ দুষ্টু চরিত্র। তাদের সংখ্যা ১৩-তে স্থির হলেও বর্তমান পরিচিত নাম ও বৈশিষ্ট্যগুলো জনপ্রিয় হয়ে ওঠে বিংশ শতাব্দীতে।
১৯৩২ সালে আইসল্যান্ডের কবি ইয়োহানেস উর কেতলুমের কবিতার বই ‘জলিন কোমা’ প্রকাশিত হয়। সেখানে ১৩ ইউল ল্যাডসের পরিচয়, স্বভাব ও বড়দিনের সঙ্গে তাদের সম্পর্ক নতুনভাবে তুলে ধরা হয়। বইটির অলংকরণ করেছিলেন শিল্পী ত্রিগভি ম্যাগনুসন। তাদের চিত্রায়ণে ভয়ংকর ট্রলদের বদলে অনেকটা সাধারণ কৃষকের মতো দেখানো হয়। পরবর্তী সময়ে তাদের পোশাক ও উপহার দেওয়ার রীতিতেও সান্তা ক্লজের প্রভাব পড়ে। তবে নিজস্ব নাম ও দুষ্টুমির বৈশিষ্ট্যগুলো রয়ে যায়।
আইসল্যান্ডের জাতীয় ও বিশ্ববিদ্যালয় গ্রন্থাগারের তথ্য অনুযায়ী, এই বইটি দেশটির বড়দিনের লোকজ ঐতিহ্যকে নতুন করে জনপ্রিয় করে তুলতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছিল।
সব মিলিয়ে, আইসল্যান্ডের বড়দিন কেবল সান্তা ক্লজ, ক্রিসমাস ট্রি আর উপহারের উৎসব নয়। এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে কয়েক শতাব্দীর লোককথা, ভয়ংকর ট্রল, অদ্ভুত সব চরিত্র আর মানুষের কল্পনার বিচিত্র প্রকাশ। তাই বড়দিনের আনন্দে সেখানে সান্তা ক্লজের পাশাপাশি অপেক্ষা করতে হয় ১৩ ভাইয়ের জন্যও।
সূত্র: ভিজিট আইসল্যান্ড, আইসল্যান্ডের জাতীয় ও বিশ্ববিদ্যালয় গ্রন্থাগার, গাইড টু আইসল্যান্ড





