অফিসে দুপুরে ঘুম, ফাঁকিবাজি নয় প্রাচীন চিকিৎসা ঐতিহ্য

দুপুরের ছোট্ট বিরতি, শরীর ও মনকে সতেজ করার প্রাচীন উপায়
ধরুন, অফিসের ভীষণ কাজের চাপ। ঘড়ির কাঁটায় দুপুর গড়িয়েছে। লাঞ্চ বিরতি হতেই দেখলেন আপনার সহকর্মীরা টেবিলের নিচ থেকে ফোল্ডিং খাট আর বালিশ বের করে দিব্যি ঘুমিয়ে পড়লেন! আমাদের দেশে দৃশ্যটা কল্পনা করলে একে চরম 'ফাঁকিবাজি' বা কাজে অবহেলা মনে হতে পারে। কিন্তু চীনে এটি একেবারেই স্বাভাবিক এবং প্রতিদিনের দৃশ্য।
চীনে কাজের চাপ কতটা ভয়াবহ, তা হয়তো অনেকেই জানেন। তাদের কুখ্যাত '৯৯৬' ওয়ার্ক কালচার (সকাল ৯টা থেকে রাত ৯টা, সপ্তাহে ৬ দিন কাজ) সারা বিশ্বেই আলোচনার বিষয়। অথচ, এত চাপের পরও চীনের প্রায় ৭০ শতাংশ মানুষ প্রতিদিন দুপুরে নিয়ম করে একটু ঘুমিয়ে নেন, যাকে আমরা 'ন্যাপ' (Nap) বলি। অবাক করা বিষয় হলো, এটি নিছক কোনো আলসেমি নয়, বরং এটি তাদের ২ হাজার বছরের পুরনো এক প্রাচীন চিকিৎসা ঐতিহ্যের অংশ!
কী বলছে চীনের প্রাচীন চিকিৎসা বিজ্ঞান?
চীনের স্লিপ রিসার্চ সোসাইটির গত মার্চ মাসে প্রকাশিত একটি জরিপে দেখা গেছে, ৭২ শতাংশ চীনা নাগরিক দুপুরে অন্তত ৩০ মিনিটের ঘুম দারুণ উপভোগ করেন। এর শেকড় লুকিয়ে আছে আজ থেকে প্রায় ২ হাজার বছর আগে রচিত চীনের প্রাচীনতম চিকিৎসা গ্রন্থ 'হুয়াংদি নেইজিং' বা 'ইনার ক্যানন অফ দ্য ইয়েলো এম্পেরর'-এ।
এই গ্রন্থে দিনের দুটি বিশেষ প্রহরে ঘুমানোর কথা বলা হয়েছে। একটি হলো 'জি' (Zi) প্রহর (রাত ১১টা থেকে ১টা), যখন গভীর ঘুমের পরামর্শ দেওয়া হয়। অন্যটি হলো 'উ' (Wu) প্রহর (সকাল ১১টা থেকে দুপুর ১টা), যখন বলা হয় ছোট্ট একটি ন্যাপ বা হালকা ঘুম নেওয়ার কথা।
প্রথাগত চীনা চিকিৎসা (TCM) তত্ত্ব অনুযায়ী, দুপুরবেলা হলো সেই সময় যখন প্রকৃতির 'ইয়াং' (Yang) শক্তি—অর্থাৎ সূর্য ও উষ্ণতার তেজ সর্বোচ্চ পর্যায়ে থাকে। প্রাচীন চিকিৎসকরা বিশ্বাস করতেন, এই উষ্ণতা সরাসরি মানুষের হৃদপিণ্ডের সাথে যুক্ত। দুপুরের এই ছোট্ট ঘুমটি সেই সংযোগকে আরও শক্তিশালী করে এবং হৃদপিণ্ডকে সতেজ ও পুষ্ট রাখে।
সম্রাট থেকে কবি—সবার প্রিয় 'ন্যাপ'
দুপুরে ঘুমানোর এই রেওয়াজটি শুধু সাধারণ মানুষের মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল না। প্রাচীন চীনের পণ্ডিত আর কবিরাও এই ঘুমের প্রেমে এতটাই মুগ্ধ ছিলেন যে, রীতিমতো কবিতা লিখে ফেলেছেন!
যেমন, একাদশ শতাব্দীর বিখ্যাত কবি ও রাজনীতিবিদ ওয়াং আনশি 'বিকেলের ঘুম' নিয়ে একটি কবিতা লিখেছিলেন।
সেখানে তিনি দারুণ আক্ষেপ করে বলেছিলেন, চমৎকার মৃদুমন্দ বাতাসের মধ্যে তার দারুণ একটা ঘুম এসেছিল, কিন্তু একটা ওরিওল পাখির ডাকে সেই শান্তির ঘুমটা ভেঙে যায়! আরেক কবি লু ইউ তার কবিতায় লিখেছিলেন, "ঘুমের ঘোরে আমার চোখ ব্যথায় টনটন করছে, ঝাপসা দেখছি। বারবার হাই তুলছি আর ভাবছি, কেন যে আরেকটু আগে বিছানায় গেলাম না!" এমনকি আধুনিক যুগে চীনের বিখ্যাত রাজনৈতিক নেতা ডেং জিয়াওপিং-ও দুপুরে ঘুমানোর জন্য বেশ পরিচিত ছিলেন। শোনা যায়, দুপুরের ঘুমটা যেন একদম নিখুঁত হয়, সেজন্য তিনি লাঞ্চের সময় সামান্য একটু 'বাইজিউ' (এক ধরনের ঐতিহ্যবাহী চীনা পানীয়) পান করে নিতেন।
'গবাদি পশু'দের ঘুম এবং ন্যাপের রাজধানী শানসি!
প্রাচীন কৃষিসমাজেও দুপুরে ঘুমানোকে কখনোই কাজে ফাঁকি দেওয়া হিসেবে দেখা হতো না। তাদের যুক্তি ছিল খুব সাধারণ—দিনের সবচেয়ে বেশি গরমে মাঠে কাজ করাটা শরীরের জন্য ক্ষতিকর। সেই ধারণা থেকেই আজও চীনের কর্পোরেট শ্রমিকরা, যারা কাজের চাপে নিজেদের রসিকতা করে 'গবাদি পশু বা ঘোড়া' বলে ডাকেন, তারা লাঞ্চ ব্রেকে অফিসে খাট-বালিশ নিয়ে আসেন একটু শান্তির ঘুমের খোঁজে।
চীনের শানসি প্রদেশ তো রীতিমতো 'বিকেলের ঘুমের প্রদেশ' নামেই পরিচিত! সেখানে কর্মীদের ঘুমের জন্য দুপুরবেলা রেস্তোরাঁ থেকে শুরু করে কুরিয়ার অফিস পর্যন্ত সব ব্যবসা প্রতিষ্ঠান কয়েক ঘণ্টার জন্য বন্ধ থাকে। এখানকার মানুষ যেকোনো জায়গায়, যেকোনো পরিস্থিতিতে ঘুমিয়ে পড়ার অদ্ভুত দক্ষতার জন্য বিখ্যাত।
তবে চিকিৎসকদের কিছু সতর্কবাণীও আছে!
দুপুরে ঘুমানো ভালো, তবে এরও কিছু নিয়ম আছে। প্রথাগত চীনা চিকিৎসা মতে, দুপুরের ঘুমটা হতে হবে ছোট। দীর্ঘক্ষণ নয়, বরং ৩০ মিনিটের ঘুমই শরীরের জন্য সবচেয়ে বেশি উপকারী। এছাড়া ভরপেট দুপুরের খাবার খাওয়ার ঠিক পরপরই ঘুমানো উচিত নয় বলেও তারা পরামর্শ দেন।
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়টি হলো ঘুমের ভঙ্গি। অফিসে নিজের ডেস্কে বা টেবিলে মাথা গুঁজে ঘুমানো একদমই ঠিক নয়। চেংদু ইউনিভার্সিটি অব টিসিএম-এর হাসপাতাল সতর্ক করেছে যে, ডেস্কে মাথা রেখে ঘুমালে তা ঘাড় ও কোমরের মেরুদণ্ডে মারাত্মক চাপ ফেলে। এতে শ্বাস-প্রশ্বাসে ব্যাঘাত ঘটে এবং ঘুমের মান খারাপ হয়, যা পরবর্তীতে মানসিক উদ্বেগের জন্ম দিতে পারে।
তাই ঘুম থেকে ওঠার পর ধীরে ধীরে উঠে দাঁড়ানো এবং হালকা একটু স্ট্রেচিং বা শারীরিক কসরত করার পরামর্শ দেন তারা, যাতে শরীর আবার তার স্বাভাবিক কর্মচাঞ্চল্যে ফিরতে পারে।
কাজেই, কাজের ফাঁকে দুপুরে একটু চোখ বন্ধ করে নেওয়া মানেই যে আপনি কাজে ফাঁকি দিচ্ছেন, তা কিন্তু নয়। হয়তো আপনি নিজের অজান্তেই ২ হাজার বছরের পুরনো এক স্বাস্থ্যকর ঐতিহ্য পালন করছেন, যা আপনার হৃদয়কে করে তুলছে আরও সতেজ!
সূত্রঃ সাউথ চায়না মর্নিং পোস্ট






