ইরানের নতুন শাসনব্যবস্থা কেন আগের চেয়ে আলাদা

সংগৃহীত ছবি
ইরানকে দুর্বল করে ফেলাই ছিল যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের প্রধান লক্ষ্য। কিন্তু যুদ্ধের পর দেখা গেল ভিন্ন চিত্র। পুরনো নেতৃত্বের পতন ঘটলেও ইসলামি প্রজাতন্ত্র ভেঙে পড়েনি। বরং সামনে এসেছে নতুন এক নেতৃত্ব। অনেক বিশ্লেষকই মনে করছেন, ইরান আগের প্রজন্মের তুলনায় আরও বাস্তববাদী, আক্রমণাত্মক এবং কৌশলগতভাবে বেশি সক্রিয়। এখন প্রশ্ন উঠেছে, ইরানের নতুন শাসনব্যবস্থা কি শুধু নেতৃত্বের পরিবর্তন, নাকি মধ্যপ্রাচ্যের রাজনীতিতে এক নতুন যুগের সূচনা?
গত মাসে ফ্রান্সের ভার্সাই প্রাসাদে নৈশভোজের সময় যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ও ইরানের মধ্যে একটি যুদ্ধবিরতি চুক্তি সই হয়। ঘটনাটি আন্তর্জাতিক অঙ্গনে ব্যাপক আলোচনার জন্ম দেয়।
ফরাসি প্রেসিডেন্ট ইমানুয়েল ম্যাক্রোঁর আতিথেয়তায় চুক্তিটি স্বাক্ষরিত হয়। বিশ্লেষকদের ধারণা, ট্রাম্প মত পরিবর্তনের আগেই সমঝোতা স্মারকে (এমওইউ) সই নিশ্চিত করতে চেয়েছিলেন ম্যাক্রোঁ। একই সঙ্গে ভার্সাই প্রাসাদের ঐতিহাসিক ‘হল অব মিররস’-এর জাঁকজমকও অতিথির মনোযোগ কাড়বে বলে তিনি ভেবেছিলেন।
তবে সবচেয়ে বেশি আলোচনায় আসে চুক্তি স্বাক্ষরের স্থানটি। কারণ ১৯১৯ সালে প্রথম বিশ্বযুদ্ধের অবসানের পর একই প্রাসাদে স্বাক্ষর হয়েছিল ঐতিহাসিক ভার্সাই চুক্তি। মাত্র দেড় পৃষ্ঠার নতুন সমঝোতা স্মারকের সঙ্গে সেই দীর্ঘ ও প্রভাবশালী চুক্তির তুলনা টানতে শুরু করেন অনেকেই।
ইতিহাসবিদদের মতে, প্রথম বিশ্বযুদ্ধ-পরবর্তী সেই চুক্তি ইউরোপের রাজনৈতিক মানচিত্র বদলে দিয়েছিল। আবার জার্মানির ওপর কঠোর ক্ষতিপূরণের বোঝা চাপিয়ে দেওয়ায় দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পথও অনেকটা তৈরি হয়েছিল।
এ কারণেই প্রশ্ন উঠেছে, ইরান-যুক্তরাষ্ট্রের এই সমঝোতাও কি একদিন মধ্যপ্রাচ্যের ইতিহাস বদলে দেওয়া একটি চুক্তি হিসেবে বিবেচিত হবে? দুই চুক্তির প্রেক্ষাপট অবশ্য একেবারেই আলাদা। তবুও বিশ্লেষকদের মতে, এর দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব সুদূরপ্রসারী হতে পারে।
চুক্তির প্রায় তিন সপ্তাহ পরও যুদ্ধবিরতি বহাল রয়েছে। তবে সেটি এখনো ভঙ্গুর। এরই মধ্যে হরমুজ প্রণালি ও আশপাশে কয়েক দফা সংঘর্ষ হয়েছে। যুদ্ধের মূল কারণগুলোরও কোনো স্থায়ী সমাধান হয়নি। ফলে মধ্যপ্রাচ্যের অস্থিরতা এখনো কাটেনি।
নতুন নেতৃত্ব, নতুন বাস্তবতা
এদিকে ইরানের ভেতরে চলছে বড় ধরনের রাজনৈতিক পরিবর্তন। ক্ষমতার কেন্দ্রবিন্দুতে এসেছে নতুন মুখ। পুরনো নেতৃত্বের জায়গা নিয়েছে নতুন প্রজন্ম।
লেখাটিতে দাবি করা হয়েছে, যুদ্ধের শুরুতে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের যৌথ হামলায় ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনি নিহত হন। একই হামলায় তেহরানের ক্ষমতার কেন্দ্রের আরও অনেক শীর্ষ ব্যক্তি নিহত হন। এর মধ্য দিয়েই দীর্ঘদিনের নেতৃত্বের অবসান ঘটে।
অনেকের মতে, এটিই ইরানের জন্য সবচেয়ে বড় মোড়। পুরনো প্রজন্ম বিদায় নিয়েছে। নতুন নেতৃত্ব নতুন চিন্তা ও নতুন কৌশল নিয়ে সামনে এসেছে। এই পরিবর্তন শুধু নেতৃত্বেই সীমাবদ্ধ থাকবে, নাকি পুরো মধ্যপ্রাচ্যের রাজনীতির গতিপথও বদলে দেবে—সেটিই এখন সবচেয়ে বড় প্রশ্ন।
যুক্তরাষ্ট্রের জনস হপকিন্স বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ভালি নাসরের মতে, বড় যুদ্ধ সব সময় নতুন শক্তির ভারসাম্য তৈরি করে। তার ভাষায়, এই যুদ্ধও মধ্যপ্রাচ্যের রাজনৈতিক দাবার ছক নতুনভাবে সাজিয়ে দিতে পারে।
দুর্বল ইরান, নাকি নতুন শক্তি?
যুদ্ধের আগে ইরানের অর্থনীতি দীর্ঘদিনের আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞায় বিপর্যস্ত ছিল। ১২ দিনের যুদ্ধের ক্ষতও তখনো কাটেনি। পারমাণবিক কর্মসূচি বড় ধাক্কা খেয়েছিল। ইউরেনিয়ামের মজুদের অবস্থান নিয়েও ছিল অনিশ্চয়তা।
একই সময় ইরানের আঞ্চলিক মিত্ররাও একের পর এক সংকটে পড়ে। সিরিয়ায় বাশার আল-আসাদের সরকার ক্ষমতাচ্যুত হয়। লেবাননে হিজবুল্লাহ বড় ক্ষতির মুখে পড়ে। গাজায় হামাস ব্যাপক সামরিক অভিযানের শিকার হয়। ইয়েমেনে হুতিদের বিরুদ্ধেও একাধিক হামলা চালানো হয়।
১৯৭৯ সালের ইসলামি বিপ্লবের পর ইরান সবচেয়ে দুর্বল অবস্থায় পৌঁছেছে। কিন্তু যুদ্ধের ফল সেই ধারণার সঙ্গে পুরোপুরি মেলেনি। লেখাটির মতে, ইরান রাষ্ট্র হিসেবে টিকে যায়। বিশেষ করে হরমুজ প্রণালির ওপর নিজেদের কৌশলগত প্রভাব ব্যবহার করে তারা বৈশ্বিক অর্থনীতির ওপর চাপ সৃষ্টি করার সক্ষমতা দেখায়।
কেন ভিন্ন নতুন নেতৃত্ব?
ভালি নাসরের মতে, ট্রাম্প যে ‘শাসন পরিবর্তনের’ কথা বলছেন, সেটি শেষ পর্যন্ত তেহরানের পক্ষেই গেছে। কারণ নতুন নেতৃত্ব অনেক বেশি বাস্তববাদী।
তাদের প্রধান লক্ষ্য আদর্শ নয়, রাষ্ট্রকে টিকিয়ে রাখা। তারা দ্রুত সিদ্ধান্ত নেয়। প্রয়োজন হলে কঠোর অবস্থান নেয়। আবার প্রয়োজন হলে আলোচনায়ও বসে।
নতুন সর্বোচ্চ নেতা মোজতবা খামেনি আগের প্রজন্মের তুলনায় অনেক তরুণ। প্রেসিডেন্ট মাসউদ পেজেশকিয়ান এবং পার্লামেন্টের স্পিকার মোহাম্মদ বাঘের গালিবাফসহ নতুন নেতৃত্বের বেশির ভাগই বিপ্লব-পরবর্তী প্রজন্মের প্রতিনিধি।
চ্যাথাম হাউজের সানাম ভাকিলের মতে, আলী খামেনির দীর্ঘ নেতৃত্বের অবসানে রাষ্ট্রীয় কাঠামো পরিবর্তনের সুযোগ তৈরি হয়েছে।
বদলে গেছে কৌশল
লেখাটিতে বলা হয়েছে, আলী খামেনির সময় ইরান ‘যুদ্ধও নয়, শান্তিও নয়’—এমন কৌশল অনুসরণ করত। কিন্তু নতুন নেতৃত্ব তুলনামূলকভাবে আরও আক্রমণাত্মক অবস্থান নিয়েছে। তারা একদিকে সামরিক শক্তি ব্যবহার করেছে, অন্যদিকে যুদ্ধবিরতির আলোচনায়ও অংশ নিয়েছে। অর্থাৎ সংঘাত ও কূটনীতি—দুই পথই একসঙ্গে ব্যবহার করছে।
ভালি নাসরের মতে, নতুন নেতৃত্ব আগের চেয়ে অনেক বেশি সাহসী এবং ঝুঁকি নিতে প্রস্তুত।
উপসাগরে নতুন সমীকরণ
যুদ্ধ চলাকালে যুক্তরাষ্ট্রের একাধিক সামরিক স্থাপনায় হামলা চালানোর দাবি করা হয়েছে লেখাটিতে। একই সঙ্গে হরমুজ প্রণালি বন্ধের হুমকিও দেওয়া হয়। এর ফলে উপসাগরীয় দেশগুলো নতুন বাস্তবতার মুখোমুখি হয়েছে। এতদিন তারা যুক্তরাষ্ট্রের নিরাপত্তাব্যবস্থার ওপর নির্ভর করলেও এখন সেই কৌশল নিয়েও প্রশ্ন উঠছে।
আন্তর্জাতিক সংকট গোষ্ঠীর আলি ভায়েজের মতে, উপসাগরীয় দেশগুলো এখন ইরানের সঙ্গে সম্পর্ক উন্নয়নের চেষ্টা করছে। তবে তারা এখনই যুক্তরাষ্ট্রের নিরাপত্তাব্যবস্থা থেকে পুরোপুরি সরে আসবে না। কারণ বাস্তবে এখনো ওয়াশিংটনের বিকল্প তাদের হাতে নেই।
সাধারণ মানুষের জন্য কী বদলাবে?
যুদ্ধের সময় ট্রাম্প ইরানের জনগণকে নিজেদের সরকার নিজেদের হাতে তুলে নেওয়ার আহ্বান জানিয়েছিলেন। কিন্তু সেই প্রতিশ্রুতির বাস্তব প্রতিফলন এখনো দেখা যায়নি। নতুন নেতৃত্ব ক্ষমতায় এলেও সাধারণ মানুষের জন্য আরও স্বাধীন বা সমৃদ্ধ ভবিষ্যতের কোনো স্পষ্ট রূপরেখা এখনো সামনে আসেনি।
চ্যাথাম হাউজের বিশ্লেষক আনিসেহ বাসিরি তাবরিজির মতে, সরকারের প্রথম লক্ষ্য এখন নিজেদের টিকিয়ে রাখা। তাই ভিন্ন মত দমনের নীতিতে বড় পরিবর্তনের সম্ভাবনা কম। তবে সামাজিক কিছু বিষয়ে শিথিলতার ইঙ্গিত দেখা যাচ্ছে। হিজাব প্রয়োগে কিছুটা নমনীয়তা এবং কিছু সামাজিক বিধিনিষেধ শিথিল হওয়ার কথাও আলোচনায় রয়েছে।
ভালি নাসরের মতে, এসব সিদ্ধান্ত আদর্শগত নয়; রাষ্ট্রের প্রতি জনগণের আস্থা ফিরিয়ে আনার প্রয়োজন থেকেই নেওয়া হয়েছে।
সামনে কোন পথে ইরান?
যুদ্ধ সাধারণ ইরানিদের জন্য গভীর অনিশ্চয়তা তৈরি করেছে। একদিকে সরকারের কঠোরতা, অন্যদিকে বিদেশি হামলায় বেসামরিক মানুষের প্রাণহানি—দুই দিক থেকেই তারা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।
আলি ভায়েজের মতে, ইরান এখন মাও-পরবর্তী চীনের মতো এক সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে। পুরো রাষ্ট্রব্যবস্থা বুঝতে পারছে, নতুন বাস্তবতার সঙ্গে মানিয়ে নিতে হলে জনগণের সঙ্গে নতুন এক সামাজিক সমঝোতা গড়ে তুলতে হবে।
সেটি কতটা সম্ভব হবে, তা এখনো স্পষ্ট নয়। কারণ ক্ষমতার কেন্দ্র আরও বেশি করে আইআরজিসির হাতে কেন্দ্রীভূত হচ্ছে। অন্যদিকে বহু তরুণ এখনো মনে করেন, দেশের ভবিষ্যৎ নির্ধারণে তাদের কোনো কার্যকর ভূমিকা নেই।
ইরান এখন এক গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তনের মুহূর্তে দাঁড়িয়ে। পুরনো রাজনৈতিক বাস্তবতা ভেঙে নতুন সমীকরণ তৈরি হচ্ছে। দেশের ভেতরে যেমন পরিবর্তনের চাপ রয়েছে, তেমনি আন্তর্জাতিক অঙ্গনেও নতুন কূটনৈতিক সুযোগ তৈরি হয়েছে। সেই সুযোগ কাজে লাগাতে পারলে মধ্যপ্রাচ্যের রাজনীতিতে নতুন অধ্যায়ের সূচনা হতে পারে। আর ব্যর্থ হলে অঞ্চলটি আবারও দীর্ঘস্থায়ী সংঘাতের দিকে ফিরে যেতে পারে।




