কয়েক দশকের ধ্বংসযজ্ঞের পর ঘুরে দাঁড়াচ্ছে ম্যানগ্রোভ বন

২০১০ সালের পর থেকে বিশ্বজুড়ে ম্যানগ্রোভ বন ধ্বংস হওয়ার চেয়ে তা নতুন করে প্রাকৃতিকভাবে দ্বিগুণ হারে গড়ে উঠছে
জলবায়ু পরিবর্তনের এই যুগে পৃথিবী যখন একের পর এক প্রাকৃতিক দুর্যোগে কাঁপছে, ঠিক তখনই বুক ফুলিয়ে এক দারুণ ও আশাজাগানিয়া সুসংবাদ দিলেন পরিবেশ বিজ্ঞানীরা। মানুষের দশকের পর দশক ধরে চালানো লোভ, চিংড়ি চাষ আর আবাসন গড়ার নামে নির্বিচারে গাছ কাটার ক্ষত কাটিয়ে প্রাকৃতিকভাবেই অলৌকিক উপায়ে ঘুরে দাঁড়াচ্ছে বিশ্বের উপকূলীয় ম্যানগ্রোভ বনগুলো। আন্তর্জাতিক বিজ্ঞানীদের সাম্প্রতিক এক যৌথ গবেষণায় দেখা গেছে, ২০১০ সালের পর থেকে বিশ্বজুড়ে ম্যানগ্রোভ বন ধ্বংস হওয়ার চেয়ে তা নতুন করে প্রাকৃতিকভাবে দ্বিগুণ হারে গড়ে উঠছে!
আমাদের সুন্দরবনের মতোই বিশ্বজুড়ে ছড়িয়ে থাকা এই নোনা পানির বনগুলোকে বলা হয় পৃথিবীর ‘প্রাকৃতিক দেয়াল’। গবেষকরা বলছেন, ২০০৪ সালের প্রলয়ঙ্কারী ভারত মহাসাগরের সুনামি এবং ২০০৮ সালে মিয়ানমারে আঘাত হানা ঘূর্ণিঝড় ‘নার্গিস’ সাধারণ মানুষ ও বিশ্বনেতাদের চোখ খুলে দিয়েছে। দেখা গেছে, যেসব দ্বীপ বা উপকূলে ঘন ম্যানগ্রোভ বন ছিল, সেখানে সুনামির ঢেউ আছড়ে পড়লেও ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে নামমাত্র। এরপর থেকেই ইন্দোনেশিয়া ও মিয়ানমারের মতো ম্যানগ্রোভ-প্রধান দেশগুলোতে কঠোর আইন করে গাছ কাটা বন্ধ করা হয়, যার সুফল মিলছে এখন।
বিজ্ঞানীদের মতে, আমাজন বা আমাদের সাধারণ বনের তুলনায় একটি ম্যানগ্রোভ বন বায়ুমণ্ডল থেকে প্রায় ৫ গুণ বেশি বিষাক্ত কার্বন ডাই অক্সাইড গ্যাস শুষে নিজের শরীরে লক করে রাখতে পারে। শুধু তাই নয়, এদের মাটির নিচে জটলা পাকানো বিশেষ শ্বাসমূলগুলো সমুদ্রের দানবীয় ঢেউয়ের গতি কমিয়ে দেয়, যার ফলে উপকূলীয় লাখো মানুষের জীবন ও সম্পদ রক্ষা পায়। একই সাথে এই মূলগুলো সাউথের কোটি কোটি মাছ, কাঁকড়া ও সামুদ্রিক জীবের জন্ম নেওয়ার ও লুকিয়ে থাকার সবচেয়ে নিরাপদ ‘নার্সারি’।
যুক্তরাষ্ট্রের টিউল্যান ইউনিভার্সিটির প্রধান গবেষক ডক্টর জেন ঝাং বিবিসি নিউজকে জানিয়েছেন, মার্কিন মহাকাশ গবেষণা সংস্থার ‘ল্যান্ডস্যাট স্যাটেলাইট’-এর নিখুঁত থ্রিডি প্রযুক্তির মাধ্যমে দেখা গেছে, ১৯৮০ সালের পর থেকে বনের সবচেয়ে সমৃদ্ধ অংশ অর্থাৎ ‘ক্লোজড ক্যানোপি’ (গাছের ঘন পাতার চাদর যা আকাশ দেখতে দেয় না) প্রায় ২০ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে। এর মানে হলো বন শুধু আয়তনেই বাড়ছে না, বনের স্বাস্থ্যও আগের চেয়ে অনেক গুণ শক্তিশালী হচ্ছে। মানুষ শুধু গাছ কাটা বন্ধ করলেই এই বন নিজে নিজেই প্রাকৃতিকভাবে তার ক্ষত সারিয়ে তুলতে পারে, যা প্রকৃতির এক অনন্য ক্ষমতা।
বিশ্বের বেশিরভাগ অঞ্চলে ম্যানগ্রোভ বনের এই সুসংবাদ থাকলেও, কিছু জায়গায় চিত্রটা এখনো অন্ধকার। বিশেষ করে পশ্চিম আফ্রিকার নাইজার বদ্বীপে খনিজ তেলের পাইপলাইন বসানো এবং তেল চুইয়ে পড়ার কারণে মাইলের পর মাইল ম্যানগ্রোভ বন বিষাক্ত হয়ে ধ্বংস হয়ে যাচ্ছে। এছাড়াও জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে ঘন ঘন শক্তিশালী সাইক্লোন বা টাইফুন আঘাত হানার কারণে অস্ট্রেলিয়া ও ক্যারিবিয়ান অঞ্চলের বনগুলো মারাত্মক ক্ষতির মুখে পড়ছে।
বিশ্বব্যাপী ম্যানগ্রোভের এই জয়যাত্রা বাংলাদেশের জন্য এক মস্ত বড় ইতিবাচক বার্তা। সিডর, আইলা বা আম্ফানের মতো একের পর এক সুপার সাইক্লোন থেকে বাংলাদেশকে মায়ের মতো আগলে রাখা আমাদের সুন্দরবনকে রক্ষায় যদি আমরাও আরও কঠোর আইনি ব্যবস্থা নিতে পারি এবং এর প্রাকৃতিক পুনরুৎপাদন ক্ষমতাকে ডিস্টার্ব না করি, তবে সুন্দরবনও তার হারিয়ে যাওয়া রূপ ফিরে পাবে। মানুষের তৈরি ক্ষতকে বুড়ো আঙুল দেখিয়ে প্রকৃতির এই বুক চিতিয়ে ঘুরে দাঁড়ানোর লড়াই প্রমাণ করে— আমরা যদি প্রকৃতিকে ধ্বংস করা বন্ধ করি, প্রকৃতি নিজেই আমাদের বাঁচিয়ে রাখার দায়িত্ব তুলে নেয়!







