গাজায় নিরস্ত্রীকরণ পরিকল্পনায় রাজি হামাস, কী আছে নতুন চুক্তিতে

ছবি: রয়টার্স
গাজায় নিরস্ত্রীকরণের একটি পরিকল্পনাসংবলিত নথিতে সম্মত হয়েছে হামাস এবং অন্যান্য ফিলিস্তিনি গোষ্ঠী। যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প একে শান্তি ও নিরাপত্তা প্রতিষ্ঠার পথে ‘ঐতিহাসিক পদক্ষেপ’ বলে অভিহিত করেছেন।
বৃহস্পতিবারের ওই চুক্তির একটি অনুলিপি আলজাজিরার হাতে এসেছে। এতে বলা হয়েছে, নিরস্ত্রীকরণের সুনির্দিষ্ট রূপরেখা ১৪ দিনের মধ্যে প্রস্তুত করতে হবে। প্রয়োজনে আন্তর্জাতিক যাচাই সংস্থার অনুমোদন এবং সংশ্লিষ্ট সব পক্ষের সম্মতিতে সময় বাড়ানো যাবে।
হামাসের আলোচক দলের সদস্য গাজি হামাদ আলজাজিরাকে বললেন, ‘এই আলোচনা অত্যন্ত কঠিন ছিল। আমরা এমন একটি গ্রহণযোগ্য সূত্রে পৌঁছানোর চেষ্টা করেছি, যা বাস্তবায়ন করা সম্ভব।’
তবে তিনি বলেছেন, ইসরায়েল যদি নিজেদের প্রতিশ্রুতি পালন না করে, তাহলে হামাসও চুক্তির কোনো অংশ বাস্তবায়ন করবে না। তার ভাষ্য, নিরস্ত্রীকরণ নির্ভর করছে গাজা থেকে ইসরায়েলি বাহিনীর প্রত্যাহার এবং পুনর্গঠনে অগ্রগতির ওপর।
এ বিষয়ে এখন পর্যন্ত ইসরায়েলের কোনো মন্তব্য পাওয়া যায়নি।
ট্রাম্প এই চুক্তিকে ‘বোর্ড অব পিস’-এর সাফল্য হিসেবে তুলে ধরেছেন। গাজার শাসনব্যবস্থা তদারকির জন্য এই সংস্থাটি গঠন করা হয়েছে।
নিজের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ট্রুথ সোশ্যালে ট্রাম্প লিখেছেন, ‘এই চুক্তি গাজায় একটি নতুন ফিলিস্তিনি সরকার প্রতিষ্ঠার পথে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ। এই সরকার বোর্ড অব পিসের সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে কাজ করে ফিলিস্তিনি জনগণকে সহায়তা করবে। একই সঙ্গে ইসরায়েলও তার প্রাপ্য নিরাপত্তা পাবে, কারণ গাজা আর সন্ত্রাসী হামলার ঘাঁটি হিসেবে ব্যবহৃত হবে না।’
আলজাজিরার হাতে আসা চুক্তিপত্রে বলা হয়েছে, জাতীয় কমিটি এবং আন্তর্জাতিক স্থিতিশীলতা বাহিনী গাজায় প্রবেশের মাধ্যমে নিরস্ত্রীকরণ প্রক্রিয়া শুরু হবে। এরপর জাতীয় কমিটি অস্ত্রের তালিকা প্রস্তুত ও সংরক্ষণের কাজ তদারকি করবে। পুরো প্রক্রিয়া পর্যবেক্ষণ করবে আন্তর্জাতিক যাচাই কমিটি এবং এতে ফিলিস্তিনি গোষ্ঠীগুলো অংশ নেবে।
চুক্তিতে আরও বলা হয়েছে, গাজা থেকে ইসরায়েলি বাহিনীর ধাপে ধাপে প্রত্যাহারের সঙ্গে নিরস্ত্রীকরণ প্রক্রিয়াও এগোবে। কোনো অস্ত্র ইসরায়েল বা অন্য কোনো অ-ফিলিস্তিনি সংস্থার কাছে হস্তান্তর করা যাবে না। গাজায় অস্ত্রের নিয়ন্ত্রণ একমাত্র জাতীয় কমিটির কাছেই থাকবে।
বোর্ড অব পিসের এক কর্মকর্তা নিশ্চিত করেছেন, হামাস ও অন্যান্য সশস্ত্র গোষ্ঠী গাজার প্রশাসনের দায়িত্ব নেওয়ার জন্য গঠিত জাতীয় কমিটির কাছে তাদের অস্ত্র হস্তান্তর করবে। তার মতে, প্রথমে পুলিশের অস্ত্র হস্তান্তর করা হবে, এরপর ভারী অস্ত্র নিষ্ক্রিয় করা হবে। পরিকল্পনা অনুযায়ী, গাজায় সব ধরনের সামরিক কার্যক্রম বন্ধ করতে হবে, যদিও পুরো প্রক্রিয়া বাস্তবায়নে সময় লাগবে।
ট্রাম্প বলেছেন, ধাপে ধাপে বাস্তবায়িত এই নিরস্ত্রীকরণ গত অক্টোবরে তার মধ্যস্থতায় হওয়া যুদ্ধবিরতি চুক্তির অংশ। তার ভাষ্য, ওই চুক্তির লক্ষ্য ছিল গাজায় ইসরায়েলের যুদ্ধের অবসান ঘটানো। এ যুদ্ধে ৭৩ হাজারের বেশি ফিলিস্তিনি নিহত হয়েছেন এবং গাজার ব্যাপক ধ্বংসযজ্ঞ হয়েছে।
তবে যুদ্ধবিরতি কার্যকর হওয়ার পরও ইসরায়েল বারবার তা লঙ্ঘন করেছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। এতে বলা হয়, যুদ্ধবিরতির পর থেকে ইসরায়েলি হামলায় ১ হাজার ২০০ জনের বেশি ফিলিস্তিনি নিহত হয়েছেন। একই সঙ্গে আরও ভূখণ্ড দখল এবং গাজায় মানুষ ও পণ্য চলাচলেও বিধিনিষেধ অব্যাহত রয়েছে। বৃহস্পতিবার ইসরায়েলি হামলায় আরও ছয় ফিলিস্তিনি নিহত হন, যাদের মধ্যে দুই শিশু রয়েছে।
ট্রাম্প বলেছেন, নিরস্ত্রীকরণ সম্পন্ন হলে ইসরায়েল গাজা থেকে সেনা প্রত্যাহার করবে। এরপর একটি আন্তর্জাতিক স্থিতিশীলতা বাহিনী এবং ‘নতুন ফিলিস্তিনি পুলিশ বাহিনী’ গাজার দায়িত্ব নেবে।
তিনি আরও বললেন, ‘এই চুক্তির মাধ্যমে শেষ পর্যন্ত গাজা এমন একটি নতুন ফিলিস্তিনি সরকারের হাতে যাবে, যা জনগণের সেবায় কাজ করবে।’
গত সপ্তাহের শেষ দিক থেকে হামাসের নেতারা মিসরের রাজধানী কায়রোয় অবস্থান করছেন। সেখানে মিসর, কাতার ও তুরস্কের মধ্যস্থতাকারীদের সঙ্গে যুদ্ধবিরতির দ্বিতীয় ধাপ নিয়ে আলোচনা চলছে। হামাসের এক নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক কর্মকর্তা বৃহস্পতিবার জানান, আলোচনা ‘ইতিবাচক’ এবং ‘অগ্রগতি হচ্ছে’।
মিসরের রাষ্ট্রীয় সংবাদমাধ্যম ‘আল-কাহেরা নিউজ’ জানিয়েছে, যুদ্ধবিরতির দ্বিতীয় ধাপ বাস্তবায়নে প্রতিশ্রুতি নিশ্চিত করতে শিগগিরই কায়রোয় নতুন বৈঠক হবে। এতে মিসর, যুক্তরাষ্ট্র, কাতার ও তুরস্কের মধ্যস্থতাকারীরা অংশ নেবেন। সংবাদমাধ্যমটি এক মিসরীয় সূত্রের বরাতে জানায়, হামাস এবং অন্যান্য ফিলিস্তিনি গোষ্ঠী আন্তর্জাতিক বাহিনী মোতায়েন ও জাতীয় কমিটির কাজ শুরু করার প্রস্তাব আনুষ্ঠানিকভাবে অনুমোদন করেছে।
তবে গাজার আরেক সশস্ত্র সংগঠন ফিলিস্তিনি ইসলামিক জিহাদ জানিয়েছে, ফিলিস্তিনি গোষ্ঠীগুলোর সঙ্গে ইসরায়েলের কোনো চূড়ান্ত চুক্তি হয়েছে—এমন খবর সঠিক নয়। তারা প্রচারিত চুক্তির ভাষা নিয়েও আপত্তি জানিয়েছে।
গত ৬ জুলাই প্রায় দুই দশক ধরে গাজার শাসন পরিচালনা করা নিজেদের প্রশাসনিক সংস্থা বিলুপ্ত করার ঘোষণা দেয় হামাস।
ওয়াশিংটন থেকে আলজাজিরার সাংবাদিক অ্যালান ফিশার জানান, এই পরিকল্পনা অনুযায়ী হামাস এবং অন্যান্য গোষ্ঠী ধাপে ধাপে বিভিন্ন এলাকায় অস্ত্র সমর্পণ করবে। এরপর আরও ফিলিস্তিনি পুলিশ সদস্য নিয়োগ দেওয়া হবে।
তিনি বললেন, ‘ফিলিস্তিনি পুলিশ একটি আন্তর্জাতিক সমন্বয় বাহিনীর সঙ্গে কাজ করবে। এই বাহিনীতে কারা থাকবে, তা এখনো চূড়ান্ত হয়নি। তবে গুঞ্জন রয়েছে, এতে ইন্দোনেশিয়া এবং সম্ভবত তুরস্কও থাকতে পারে, যা ইসরায়েলের পছন্দ নাও হতে পারে।’
ফিশারের মতে, সব পক্ষকে চুক্তিতে সই করানো সহজ হবে না। তবে হামাসকে স্পষ্টভাবে জানিয়ে দেওয়া হয়েছে, তারা এই চুক্তি অনুমোদন না করলে তাদের আর্থিক পরিস্থিতি আরও কঠিন হয়ে উঠবে।
তিনি বললেন, ‘হামাসের ওপর এই চুক্তি গ্রহণের জন্য অবশ্যই আন্তর্জাতিক চাপ ছিল।’
সামরিক বিশ্লেষক নিদাল আবু জায়েদ আলজাজিরাকে জানান, চুক্তিতে ‘অস্ত্রের তালিকা প্রস্তুত ও সংরক্ষণ’ শব্দগুচ্ছের ব্যবহার ‘নিরস্ত্রীকরণ’ শব্দের তুলনায় সূক্ষ্মভাবে ভিন্ন।
তিনি বললেন, ‘সামরিক দৃষ্টিকোণ থেকে অস্ত্রের তালিকা প্রস্তুত ও সংরক্ষণের কাজ তৃতীয় কোনো পক্ষ করতে পারে। কিন্তু সেই পক্ষের শত্রুপক্ষ হওয়া জরুরি নয়। অন্যদিকে নিরস্ত্রীকরণ সাধারণত শত্রুপক্ষের মাধ্যমে হয়, আর ফিলিস্তিনি গোষ্ঠীগুলো কখনোই তাতে সম্মত হবে না।’
এর আগে যুক্তরাষ্ট্রের এক কর্মকর্তা সাংবাদিকদের বলেছেন, বোর্ড অব পিসে তুরস্ক ও কাতারকে অন্তর্ভুক্ত করা নিয়ে ইসরায়েলের ব্যাপক সমালোচনা ছিল। তবে এই চুক্তি প্রমাণ করেছে, ওই দুই দেশকে অন্তর্ভুক্ত করার সিদ্ধান্ত সঠিক ছিল।
তিনি বললেন, ‘আমার মনে হয়, এখন ফিলিস্তিনি কর্তৃপক্ষ (পিএ) এবং হামাসের বাইরে অবশেষে একটি বিকল্প তৈরি হয়েছে। এটি একটি প্রযুক্তিনির্ভর, অরাজনৈতিক সরকার, যার লক্ষ্য শুধু জনগণের কল্যাণে কাজ করা।’




