ফ্রান্সের ঢেউ কি যুক্তরাষ্ট্রকেও ভাসিয়ে নেবে?

প্যারিসে বিক্ষোভের অংশ হিসেবে আয়োজিত প্রতিবাদ কর্মসূচির সময় সংঘর্ষের মধ্যে এক নারী সাইকেলে করে জ্বলন্ত ব্যারিকেডের পাশ দিয়ে চলে যাচ্ছেন— রয়টার্স
ফ্রান্স এখন আগুনে জ্বলছে। দেশটি এমন এক রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক হিসাব-নিকাশের মুখোমুখি, যা আমেরিকানদের কাছে বিপজ্জনকভাবে পরিচিত মনে হতে পারে।
সামর্থ্যের চেয়ে বেশি ব্যয় করায় ফ্রান্স ঋণসংকটের দিকে এগোচ্ছে। সাম্প্রতিক মাসগুলোতে বন্ডের সুদের হার বেড়ে যাওয়ায় প্রত্যাশার চেয়ে অনেক দ্রুত ঋণ পরিশোধের চাপ তৈরি হয়েছে। এর পেছনে জ্বালানির বাড়তি দামও ভূমিকা রেখেছে। সম্ভাব্য সমাধানের অংশ হিসেবে কর বাড়ানো ও সরকারি ব্যয় কমানোর কথা ভাবা হচ্ছে। কিন্তু রাজনৈতিকভাবে অজনপ্রিয় এসব সিদ্ধান্তে আগে থেকেই ক্ষুব্ধ জনগণ আরও ফুঁসে উঠতে পারে। তীব্রভাবে বিভক্ত সরকারের মধ্যে বাজেট নিয়ে অনিশ্চিত লড়াইয়ের কারণে কার্যকর সমাধানে পৌঁছানোও কঠিন।
পরিস্থিতিটা কি পরিচিত মনে হচ্ছে?
ফ্রান্সের মতো সংকটে পড়ছে আরও অনেক দেশ। বিশেষ করে যুক্তরাজ্যের পরিস্থিতির সঙ্গে এর মিল রয়েছে। দ্রুত বাড়তে থাকা ঋণ, সেই ঋণ নেওয়ার খরচ বৃদ্ধি এবং সমস্যা সমাধানে অস্বস্তিকর সিদ্ধান্ত নেওয়ার মতো রাজনৈতিক সদিচ্ছার অভাব—পশ্চিমা অর্থনীতির বর্তমান চিত্র অনেকটাই এমন। যুক্তরাষ্ট্রও এর বাইরে নয়।
যদিও মিলগুলো কেবল উপরিভাগেরও হতে পারে।
ফ্রান্সের আর্থিক সংকট বিশেষভাবে তীব্র। ইউরোপের অন্য দেশগুলোতেও এই সংকট ছড়িয়ে পড়ার ঝুঁকি কম। যুক্তরাষ্ট্রের তুলনায় ফ্রান্সের সরকারি ব্যয়ের অনেক বড় অংশজুড়ে রয়েছে বিশাল সামাজিক সুরক্ষাব্যবস্থা। আর মার্কিন অর্থনীতির অনন্য বৈশিষ্ট্যের কারণে অদূর ভবিষ্যতে দেশটি ফ্রান্সের মতো পরিস্থিতিতে পড়ার আশঙ্কা নেই।
সমস্যাটা কোথায়?
এসব সমস্যা নতুন নয়। কয়েক দশক ধরেই ইউরোপের সামাজিক সুরক্ষাব্যবস্থা অসহনীয় আর্থিক চাপের পথে এগোচ্ছে। অর্থনীতিবিদ ও কিছু রাজনীতিক বহু বছর ধরে সতর্ক করে আসছেন, একসময় এর ব্যয় মেটানোর চাপ আসবেই।
কিন্তু পরিস্থিতি আরও খারাপ হচ্ছে। ইরান যুদ্ধ পশ্চিমা দেশগুলোর আর্থিক সংকটকে আরও বাড়িয়ে দিয়েছে।
আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (আইএমএফ) গত সপ্তাহে জানিয়েছে, ফেব্রুয়ারি থেকে জি৭-ভুক্ত অর্থনীতিগুলোর ১০ বছর মেয়াদি সরকারি বন্ডের গড় সুদের হার ১ শতাংশীয় পয়েন্টের বেশি বেড়েছে। প্রায় ২০ বছরের মধ্যে এটি সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছেছে।
আইএমএফের পূর্বাভাস অনুযায়ী, চলতি দশকের শেষ নাগাদ এই সাতটি দেশের সম্মিলিত সরকারি ঋণের পরিমাণ তাদের মোট অর্থনৈতিক উৎপাদনকে ছাড়িয়ে যাবে। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর এমন ঘটনা আর ঘটেনি।
ফ্রান্সের সরকারি ঋণ দেশটির মোট দেশজ উৎপাদনের (জিডিপি) প্রায় ১১৯ শতাংশ। ইউরোপীয় ইউনিয়নের নির্ধারিত লক্ষ্যমাত্রার দ্বিগুণ। দেশটির বার্ষিক বাজেট ঘাটতিও জিডিপির ৫ দশমিক ৪ শতাংশ।
কেন্ট বিশ্ববিদ্যালয়ের সামাজিক নীতিবিষয়ক অধ্যাপক পিটার টেলর-গুবি বলেছেন, ‘ইউরোপে মানুষ ক্রমেই বন্ডবাজার এবং সরকারের ঋণ নেওয়ার জন্য দিতে হওয়া সুদের হার নিয়ে উদ্বিগ্ন হয়ে পড়ছে। পরিস্থিতি এমন পর্যায়ে পৌঁছেছে যে এখন আর বিষয়টি উপেক্ষা করার সুযোগ নেই। তা করলে আমরা গুরুতর সংকটে পড়ব।’
কাগজে-কলমে যুক্তরাষ্ট্রের অবস্থাও খুব একটা আলাদা নয়। দেশটির ৩২ ট্রিলিয়ন ডলারের সরকারি ঋণ বার্ষিক জিডিপির প্রায় সমান। সদ্য সমাপ্ত অর্থবছরে বাজেট ঘাটতি দাঁড়িয়েছে ২ ট্রিলিয়ন ডলার, যা জিডিপির ৬ শতাংশেরও বেশি। যুক্তরাষ্ট্রের সরকারি ঋণের সুদ পরিশোধের বার্ষিক ব্যয়ও সম্প্রতি ১ ট্রিলিয়ন ডলার ছাড়িয়েছে। ফেডারেল বাজেটের মোট ব্যয়ের প্রায় ১৪ শতাংশ এটি।
অর্থাৎ, যুক্তরাষ্ট্রের কর থেকে আদায় করা প্রতি সাত ডলারের এক ডলারই খরচ হচ্ছে শুধু ঋণের সুদ পরিশোধে।
তবে ইউরোপে সরকারি ব্যয় কমানো ও কর বাড়ানো নিয়ে যে গুরুতর আলোচনা চলছে, যুক্তরাষ্ট্রে তা অনেক কম গুরুত্ব পাচ্ছে। তাহলে ফ্রান্সের মতো একই সমস্যায় পড়ছে না কেন যুক্তরাষ্ট্র?
কেন এখনই যুক্তরাষ্ট্রে এমন সংকট হবে না
যুক্তরাষ্ট্রের সবচেয়ে বড় সুবিধা হলো, দেশটি বিশ্বের রিজার্ভ মুদ্রা ডলার ছাপায়। তেল ও সোনার মতো গুরুত্বপূর্ণ পণ্যসহ বৈশ্বিক লেনদেনের অধিকাংশই মার্কিন ডলারে হয়।
ডলারের চাহিদা এখনো শক্তিশালী। এর বড় কারণ, মুদ্রাটিকে নিরাপদ বলে মনে করা হয়। যুক্তরাষ্ট্রের স্বচ্ছতা এবং আইনের শাসনের প্রতি অঙ্গীকার ডলারকে বৈশ্বিক আর্থিক ব্যবস্থার ভিত্তি করে তুলেছে—যদিও গত এক দশকে ডলারের সেই আকর্ষণে কিছুটা ভাটা পড়েছে।
বিক্ষোভের ‘নিয়ন্ত্রণ হারিয়েছিল’ পুলিশ, স্বীকারোক্তি ফ্রান্সের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর
১৯ অক্টোবর ২০২৬
তবে ফ্রান্স ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে প্রকৃত পার্থক্যটি শেষ পর্যন্ত একটি বিষয়েই এসে দাঁড়ায়। জেমস কারভিলের বিখ্যাত কথায়, ‘এটা অর্থনীতির ব্যাপার, বোকা।’
যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনীতি বড় ও বৈচিত্র্যপূর্ণ। ফলে তুলনামূলক ছোট অনেক দেশের চেয়ে আকস্মিক ধাক্কা সামলানোর সক্ষমতা বেশি। বিশেষ করে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই খাতে বিনিয়োগের জোয়ার মার্কিন অর্থনীতিকে এগিয়ে নিচ্ছে। অন্যদিকে, অর্থনীতির কয়েকটি খাত স্থবির হয়ে পড়ছে বা সংকুচিত হচ্ছে।
বাজেট ঘাটতির গুরুত্ব কমানোর একটি প্রধান উপায় হলো অর্থনীতির প্রবৃদ্ধি শক্তিশালী রাখা। অর্থনীতি বড় হলে তার তুলনায় ঋণের বোঝা ছোট দেখায়।
তাই দেশগুলোকে নিজেদের প্রশ্ন করতে হবে, ‘আমরা ঋণের জন্য কত সুদ দিচ্ছি? প্রত্যাশিত অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির ভিত্তিতে এই ব্যয় বহন করা আমাদের পক্ষে টেকসই কি না?’
মুডিস অ্যানালিটিকসের প্রধান অর্থনীতিবিদ মার্ক জান্ডি বললেন, ‘ফ্রান্স ও যুক্তরাজ্যের পরিস্থিতি অনেকটা কাছাকাছি। কিন্তু যুক্তরাষ্ট্রে এআইয়ের কারণে প্রবৃদ্ধি বাড়ছে। ফলে দেশটি ঋণ সামলাতে এবং সংকট মোকাবিলা করতে তুলনামূলকভাবে বেশি সক্ষম হতে পারে।’
অর্থনীতিবিদেরা সতর্ক করে বলছেন, যুক্তরাষ্ট্রে আসন্ন ঋণসংকটের আশঙ্কা কম বলে দেশটির আর্থিক ব্যবস্থাপনাকে দায়িত্বশীল ভাবা ঠিক হবে না। শুধু ফ্রান্স বা যুক্তরাজ্যের তুলনায় দেশটি সমস্যাটি ভালোভাবে সামলাতে পারবে।
জান্ডি আরও বলেছেন, ‘এতে আমাদের স্বস্তি পাওয়ার কোনো কারণ নেই। আমরা শুধু ভিন্ন অবস্থানে আছি।’
অন্য দেশেও কি ছড়িয়ে পড়তে পারে সংকট?
ইউরোপের কোনো দেশ আর্থিক সংকটে পড়লেই তা পুরো মহাদেশে ছড়িয়ে পড়ার আশঙ্কা তৈরি হয়। তবে অর্থনীতিবিদেরা মনে করেন, ফ্রান্সের সমস্যাগুলো আপাতত দেশটির মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকবে।
ইউরোপীয় কেন্দ্রীয় ব্যাংক ইঙ্গিত দিয়েছে, ফ্রান্সের আর্থিক পরিস্থিতিতে হস্তক্ষেপ করার প্রয়োজন হবে না। তবে প্রয়োজন হলে তারা হস্তক্ষেপ করতে পারে। ক্যাপিটাল ইকোনমিকসের প্রধান ইউরোপীয় অর্থনীতিবিদ অ্যান্ড্রু কেনিংহ্যাম বলেছেন, সম্ভাব্য সংক্রমণ ঠেকাতে সদস্যদেশগুলোর বিপুল পরিমাণ বন্ড কেনার মতো সক্ষমতা রয়েছে ইউরোপীয় কেন্দ্রীয় ব্যাংকের।
ইউরোপের অন্যান্য দেশের বাজেট ঘাটতিও ফ্রান্সের তুলনায় অনেক কম। চলতি বছর কয়েকটি দেশ বাজেট উদ্বৃত্ত রাখতে পারবে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
বাম ও ডান—ফ্রান্সের দুই ধারার রাজনৈতিক দলই ইউরোপীয় ইউনিয়নে থাকার পক্ষে অবস্থান জানিয়েছে। এর মধ্যে রয়েছেন দেশটির প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে এগিয়ে থাকা কট্টর ডানপন্থী প্রার্থী মেরিন ল্য পেনও। একসময় তিনি ‘ফ্রেক্সিট’ বা ইউরোপীয় ইউনিয়ন থেকে ফ্রান্সের বেরিয়ে যাওয়ার পক্ষে ছিলেন। তবে পরে সেই অবস্থান থেকে সরে এসেছেন।
কেনিংহ্যাম জানান, জার্মানির অল্টারনেটিভ ফর জার্মানি (এএফডি) দল ইউরোপীয় ইউনিয়ন ছাড়ার পক্ষে কথা বললেও এখনো তাদের সরকার গঠনের কাছাকাছি যাওয়ার সম্ভাবনা নেই।
তবে ফ্রান্সের বাইরেও ঋণসংকট ছড়িয়ে পড়ার একটি অনিশ্চিত কারণ রয়েছে। সেটি হলো যুক্তরাষ্ট্রের ‘এক্স ডেট’ বা ঋণসীমায় পৌঁছানোর সম্ভাব্য সময়।আগামী বছরের কোনো এক সময়ে যুক্তরাষ্ট্র আবারও ঋণসীমায় পৌঁছাবে। তখন নতুন কংগ্রেসকে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সঙ্গে ঋণসীমা বাড়ানো নিয়ে সমঝোতা করতে হবে। প্রেসিডেন্টের মেয়াদের শেষ পর্যায়ে এমন আলোচনা আরও কঠিন হতে পারে। বিশেষ করে কংগ্রেসের নিয়ন্ত্রণ ডেমোক্র্যাটদের হাতে গেলে এবং তারা ছাড় দিতে কম আগ্রহী হলে অচলাবস্থা তৈরি হতে পারে।
ঋণসীমা বাড়াতে ব্যর্থ হলে যুক্তরাষ্ট্রকে ঋণ পরিশোধে খেলাপি হতে বাধ্য হওয়ার ঝুঁকিতে পড়তে হবে—যদিও অন্যথায় ঋণ পরিশোধের সক্ষমতা দেশটির থাকতে পারে।
জান্ডি বললেন, ‘এমন পরিস্থিতি তৈরি হতে পারে, যেখানে আগামী বছরের হ্যালোইনের মধ্যে আমরা ঋণসীমা অতিক্রম করে ফেলব। এরপর আরও নানা সমস্যা দেখা দেবে।’
সূত্র: সিএনএন






