এক ইরানেই দম শেষ চীন এলে কী হবে?
- পেন্টাগনের সাবেক কর্মকর্তাদের শঙ্কা

এক ইরানের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করতে গিয়েই দম শেষ হয়ে যাচ্ছে যুক্তরাষ্ট্রের। সমরাস্ত্রের মজুদও কমে গেছে ব্যাপকভাবে। তাহলে ভবিষ্যতে চীন বা উত্তর কোরিয়ার সঙ্গে যুদ্ধ বাধলে কী হবে দেশটির। এমন প্রশ্নই এখন ঘুরপাক খাচ্ছে পেন্টাগনের সাবেক কর্মকর্তা ও বিশেষজ্ঞদের মাথায়। তারা মনে করছেন, অস্ত্রের এ ঘাটতি ভবিষ্যতে চীন বা উত্তর কোরিয়ার মতো দেশগুলোর বিরুদ্ধে সম্ভাব্য যুদ্ধে ঝুঁকির মুখে ফেলতে পারে মার্কিন সামরিক বাহিনীর সক্ষমতাকে।
গত ২৮ ফেব্রুয়ারি ইরানে যুদ্ধ শুরুর পর আশঙ্কাজনকভাবে কমে গেছে যুক্তরাষ্ট্রের প্রধান সব সমরাস্ত্রের মজুদ। দেশটির প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প গত শুক্রবার যুদ্ধবিরতি ‘শেষ’ বলে ঘোষণা দেওয়ার পর এ সংকট আরও ঘনীভূত হওয়ার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। সেন্টার ফর স্ট্র্যাটেজিক অ্যান্ড ইন্টারন্যাশনাল স্টাডিজের (সিএসআইএস) প্রতিরক্ষা বিশ্লেষক ও অবসরপ্রাপ্ত মেরিন কর্নেল মার্ক কানসিয়ান। তিনি বললেন, ‘কয়েক দিন ধরে যুদ্ধ যেভাবে চলছে, সেটি অব্যাহত থাকলে অস্ত্রের মজুদ এতটাই কমে যাবে যে, ইন্দো-প্যাসিফিক অঞ্চলে নতুন করে বড় ধরনের ঝুঁকির সৃষ্টি হবে।’ বিশ্লেষকদের মতে, ইরান যুদ্ধের প্রথম ধাপে ‘অপারেশন এপিক ফিউরি’র আওতায় কয়েক হাজার দূরপাল্লার ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবহার করেছে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক বাহিনী।
সিএসআইএসের বিশ্লেষণ অনুযায়ী, গত এপ্রিল পর্যন্ত যুক্তরাষ্ট্র তাদের অন্তত অর্ধেক ‘থাড’ ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র ইন্টারসেপ্টর, প্রায় অর্ধেক ‘প্যাট্রিয়ট’ আকাশ প্রতিরক্ষাব্যবস্থা এবং ৩০ শতাংশ ‘টমাহক’ ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবহার করে ফেলেছে। ব্রুকিংস ইনস্টিটিউশনের পররাষ্ট্র নীতিবিষয়ক গবেষক মাইকেল ও’হ্যানলনের ভাষ্য, ‘অস্ত্রের মজুদ আমাদের প্রত্যাশার চেয়েও অনেক কমে গেছে— এতে কোনো সন্দেহ নেই।’
অস্ত্রের এই বিশাল ঘাটতি পূরণ করা বেশ সময়সাপেক্ষ। মার্ক কানসিয়ান জানিয়েছেন, বর্তমানে প্রতি মাসে গড়ে মাত্র ১৫টি টমাহক এবং ২০টি নতুন প্যাট্রিয়ট ক্ষেপণাস্ত্র হাতে পাচ্ছে যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিরক্ষা দপ্তার পেন্টাগন। ২০২৬ সালে নতুন কোনো থাড ক্ষেপণাস্ত্র পাওয়ার সম্ভাবনা নেই। সিএসআইএসের মতে, যুদ্ধের আগের অবস্থায় ফিরতে সময় লাগবে অন্তত তিন বছর বা তারও বেশি।
পেন্টাগনের সাবেক কর্মকর্তা এলেন ম্যাককাসকার জানালেন, সমরাস্ত্রের মজুদ আগের মতো করতে বেশিরভাগ ক্ষেত্রে দুই থেকে পাঁচ বছর সময় লাগবে। অন্যদিকে, প্রতিরক্ষা সরঞ্জাম ক্রয় বিশেষজ্ঞ জন ফেরারি বললেন, ‘যুদ্ধ শুরুর পর থেকে একটি ক্ষেপণাস্ত্র বদলানোর জন্যও কংগ্রেস থেকে কোনো অর্থ বরাদ্দ দেওয়া হয়নি। ফলে এখনো বহাল রয়েছে সাধারণ সময়ের ধীরগতির উৎপাদন প্রক্রিয়াই।’
অস্ত্রের ঘাটতি ভবিষ্যতে চীন বা উত্তর কোরিয়ার মতো দেশগুলোর বিরুদ্ধে সম্ভাব্য যুদ্ধে মার্কিন সামরিক বাহিনীর সক্ষমতাকে ফেলতে পারে ঝুঁকির মুখে
সম্প্রতি ইরান যুদ্ধের ব্যয় মেটাতে অতিরিক্ত তহবিলের জন্য কংগ্রেসের কাছে আবেদন করেছে হোয়াইট হাউজ। তবে এ প্রস্তাব পাস হওয়া বেশ কঠিন। অন্যদিকে পেন্টাগনের এক কর্মকর্তা জানিয়েছেন, সমরাস্ত্রশিল্প সম্প্রসারণে তারা প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। গত জুনে ট্রাম্প ‘ডিফেন্স প্রোডাকশন অ্যাক্ট’ প্রস্তাব করেছেন, যাতে আমলাতান্ত্রিক জটিলতা কমিয়ে দ্রুত ক্ষেপণাস্ত্র উৎপাদন করা যায়।
পেন্টাগনের ওই কর্মকর্তা আরও বললেন, ‘যুক্তরাষ্ট্রের উদ্ভাবনী শক্তিকে কাজে লাগিয়ে উৎপাদন বাড়ানোর জন্য বিভাগটি কাজ করে যাচ্ছে, যাতে সরবরাহ ব্যবস্থায় গতি আসে।’ তবে মার্ক কানসিয়ান মনে করেন, সরকারের এ পদক্ষেপ কার্যকর হলেও এর প্রভাব হবে খুবই সীমিত।
বিশ্ব জুড়ে অস্ত্রের চাহিদা বাড়ায় অন্যান্য দেশকে নিজস্বভাবে প্যাট্রিয়ট ক্ষেপণাস্ত্র তৈরির লাইসেন্স দেওয়ার ফলে যুক্তরাষ্ট্রের ওপর চাপ কমতে পারে। সম্প্রতি তুরস্কে ন্যাটো সম্মেলনের ফাঁকে ইউক্রেনকে লাইসেন্স দেওয়ার কথা ঘোষণা করেন ট্রাম্প। তবে এ প্রক্রিয়া অত্যন্ত ধীর। জাপানের একটি প্যাট্রিয়ট কারখানা তৈরি করতে তিন বছর সময় লেগেছে। অন্যদিকে জার্মানি ২০২২ সালে কাজ শুরু করলেও এখনো তৈরি করতে পারেনি কোনো ক্ষেপণাস্ত্র।
বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করে বলেছেন, চীন বা উত্তর কোরিয়ার সঙ্গে কোনো দ্বন্দ্বে যুক্তরাষ্ট্রের ক্ষেপণাস্ত্রের এই সংকট বড় বিপদ ডেকে আনতে পারে। উত্তর কোরিয়ার সম্ভাব্য হামলা প্রতিহত করতে এবং সম্ভাব্য লক্ষ্যবস্তুতে আঘাত হানতে প্রয়োজন হবে বিপুল পরিমাণ ক্ষেপণাস্ত্রের।
পেন্টাগনের প্রধান মুখপাত্র শন পার্নেল সম্প্রতি এক বিবৃতিতে বলেছেন, ‘যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক বাহিনী বিশ্বের সবচেয়ে শক্তিশালী। প্রেসিডেন্টের পছন্দ অনুযায়ী যেকোনো সময় এবং স্থানে অভিযান পরিচালনার প্রয়োজনীয় সবকিছুই রয়েছে আমাদের। আমাদের জনগণ ও স্বার্থ রক্ষায় যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক বাহিনীর কাছে বিশাল অস্ত্রভাণ্ডার ও সক্ষমতা রয়েছে।’ মাইকেল ও’হ্যানলন মনে করেন, চীন বা উত্তর কোরিয়াকে প্রতিহত করার সক্ষমতা এখনো রয়েছে যুক্তরাষ্ট্রের। তবে তিনি সতর্ক করে বললেন, ‘একটি নির্দিষ্ট পর্যায়ে এ সক্ষমতা কমে যেতে পারে। সে পর্যায়টি ঠিক কোথায়, তা হয়তো আমরা জানতে পারব না। কারণ এটি মূলত নির্ভর করে শত্রুর মনস্তত্ত্বের ওপর।’
যুক্তরাষ্ট্র ইরানের সামরিক ঘাঁটি, পরমাণু স্থাপনা এবং হরমুজ প্রণালি লক্ষ্য করে বিমান ও ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালিয়ে আসছে। এই সংঘাতের জেরে আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম ব্যারেলপ্রতি ৭৪ ডলারের বেশি বেড়ে গেছে এবং বিশ্ব জুড়ে অস্ত্র সংকট ও মূল্যস্ফীতি দেখা দিয়েছে।
তেহরানের জন্য বেইজিং কখনো যুদ্ধে জড়াবে না: চীন ও ইরানের সম্পর্ক কোনো রক্ত বা আদর্শের অটুট বন্ধন নয়, বরং এর ভিত্তি সম্পূর্ণ বাস্তবমুখী ও পারস্পরিক উপযোগিতার। অনেকে মনে করে ন্যাটোর অনুচ্ছেদ ৫-এর মতো ইরান সংকটে পড়লে বেইজিং পাশে দাঁড়াবে, কিন্তু বাস্তব চিত্র ভিন্ন। চীনের ইরানকে প্রয়োজন ঠিকই, তবে তেহরানের জন্য বেইজিং কখনো যুদ্ধে জড়াবে না বলেই বিশ্লেষকদের ধারণা। ২০২৬ সালের চলমান সংঘাতের প্রেক্ষাপটে বেইজিংয়ের ভূমিকা বিশ্লেষণ করলে এই শীতল ও হিসাবনিকাশের সম্পর্কের বিষয়টিই স্পষ্ট হয়ে ওঠে। তথ্যসূত্র: সিএনএন




