৯/১১ হামলার প্রতিশোধে গেল ৪৭ লাখ প্রাণ
- বাস্তুচ্যুত ৩ কোটি ৮০ লাখ মানুষ

ভয়ংকর সেই ৯/১১! ২০০১ সালের ওই হামলায় প্রায় ৩ হাজার মানুষের প্রাণহানি যুক্তরাষ্ট্রকে প্রতিশোধের পথে ঠেলে দেয়। নিরাপত্তা নীতি বদলের পাশাপাশি শুরু হয় দীর্ঘ সামরিক অভিযান—‘সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে যুদ্ধ’। আফগানিস্তান থেকে ইরাক, পরে পাকিস্তান, সিরিয়া, ইয়েমেন, সোমালিয়া, লিবিয়াসহ বিভিন্ন অঞ্চলে ছড়িয়ে পড়ে সেই যুদ্ধ। ২৫ বছর পর এর মানবিক হিসাব ভয়াবহ—যুদ্ধ ও সংশ্লিষ্ট সংঘাত অঞ্চলে আনুমানিক ৪৫ থেকে ৪৭ লাখ মানুষের মৃত্যু, ৩ কোটি ৮০ লাখের বেশি বাস্তুচ্যুতি এবং ৮ ট্রিলিয়ন ডলারের বেশি মার্কিন ব্যয়।
আফগানিস্তানে ২০০১ সালে আল-কায়েদাকে ধ্বংস ও তালেবান সরকারকে ক্ষমতাচ্যুত করার লক্ষ্য নিয়ে অভিযান শুরু হয়। প্রায় দুই দশক পর ২০২১ সালে মার্কিন সেনা প্রত্যাহার করে। কিন্তু তার আগেই তালেবান দ্রুত ক্ষমতা দখল করে। দীর্ঘ অভিযানের অর্জন ও কৌশল নিয়ে তাই প্রশ্ন থেকেই যায়। আফগানিস্তানে প্রায় ১ লাখ ৭৬ হাজার মানুষের মৃত্যু হয়, যার মধ্যে ৪৬ হাজারের বেশি বেসামরিক।
এক নজরে যুদ্ধের হিসাব
আফগানিস্তান : ২০ বছর—বুশ, ওবামা, ট্রাম্প ও বাইডেন আমল; মৃত্যু প্রায় ১.৭৬ লাখ, বেসামরিক ৪৬ হাজারের বেশি।
পাকিস্তান : প্রায় ২০ বছর—চার প্রেসিডেন্টের আমল; মৃত্যু ৬৬ হাজারের বেশি, বেসামরিক ২৪ হাজারের বেশি।
ইরাক : প্রায় ২০ বছর—বুশ, ওবামা, ট্রাম্প ও বাইডেন আমল; মৃত্যু ২.৭৫–৩.০৬ লাখ, বেসামরিক ১.৮৫–২.০৯ লাখ।
সিরিয়া : প্রায় ৯ বছর—ওবামা, ট্রাম্প ও বাইডেন আমল; মৃত্যু প্রায় ২.৬৬ লাখ, বেসামরিক প্রায় ৯৫ হাজার।
ইয়েমেন : দীর্ঘমেয়াদি অভিযান—বুশ, ওবামা, ট্রাম্প ও বাইডেন আমল; মৃত্যু প্রায় ১.১২ লাখ, বেসামরিক ১২,৬৯০।
সবচেয়ে তাৎপর্যপূর্ণ বিষয়, আল-কায়েদাও পুরোপুরি বিলীন হয়নি। সাম্প্রতিক সময়ের বিশ্লেষণে দেখা যাচ্ছে, সংগঠনটি আগের তুলনায় দুর্বল হলেও আফ্রিকা, পাকিস্তান ও মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন অঞ্চলে শাখা ও আদর্শিক প্রভাব ধরে রেখেছে। অর্থাৎ সন্ত্রাসী নেটওয়ার্ক নির্মূলের লক্ষ্য পুরোপুরি অর্জিত হয়নি; বরং তা অনেক ক্ষেত্রে বিকেন্দ্রীভূত হয়েছে।
ইরাক যুদ্ধও ছিল বড় বিতর্কের কেন্দ্র। ২০০৩ সালের আগ্রাসনের অন্যতম যুক্তি ছিল সাদ্দাম হোসেনের কাছে ব্যাপক বিধ্বংসী অস্ত্র থাকার দাবি। পরে এমন অস্ত্রের মজুদ পাওয়া যায়নি। যুদ্ধ-পরবর্তী রাষ্ট্রীয় কাঠামোর পতন, সাম্প্রদায়িক সংঘাত ও নিরাপত্তাশূন্যতা উগ্রপন্থী সংগঠনের বিস্তারের পরিবেশ তৈরি করে।
ব্রাউন বিশ্ববিদ্যালয়ের ‘যুদ্ধের ব্যয়’ প্রকল্পের হিসাবে ২০০১ থেকে ২০২৩ সাল পর্যন্ত এসব যুদ্ধাঞ্চলে সরাসরি সহিংসতায় ৯ লাখ ৪০ হাজারের বেশি মানুষ নিহত হয়েছেন। তাদের মধ্যে ৪ লাখ ৩২ হাজারের বেশি বেসামরিক। যুদ্ধের কারণে স্বাস্থ্যব্যবস্থা, খাদ্য, পানি, অবকাঠামো ও অর্থনীতি ধ্বংস হওয়ায় পরোক্ষ মৃত্যুর সংখ্যা আনুমানিক আরও ৩৬ থেকে ৩৮ লাখ। সব মিলিয়ে মোট মৃত্যু দাঁড়ায় প্রায় ৪৫ থেকে ৪৭ লাখ। তবে গবেষকদের মতে, প্রকৃত সংখ্যা আরও বেশি হতে পারে।
বাস্তুচ্যুতির হিসাবও ভয়াবহ
৯/১১-পরবর্তী যুদ্ধ ও সংঘাতে ৩ কোটি ৮০ লাখের বেশি মানুষ ঘরবাড়ি হারিয়েছেন। একই সময়ে যুক্তরাষ্ট্রের যুদ্ধব্যয় ছাড়িয়েছে ৮ ট্রিলিয়ন ডলার। প্রবীণ সেনাদের চিকিৎসা ও পুনর্বাসনের ভবিষ্যৎ ব্যয় যোগ হলে ২০৫০ সাল পর্যন্ত আরও ২.২–২.৫ ট্রিলিয়ন ডলার প্রয়োজন হতে পারে।
যুদ্ধের ক্ষত আমেরিকার ভেতরেও রয়ে গেছে। ওয়ার্ল্ড ট্রেড সেন্টার স্বাস্থ্য কর্মসূচির আওতায় ১ লাখ ৫০ হাজারের বেশি মানুষ চিকিৎসা বা স্বাস্থ্যসেবা পাচ্ছেন; ৯ হাজারের বেশি সদস্য মারা গেছেন। ৯/১১-এর সময় নিউ ইয়র্ক এলাকায় থাকা প্রায় ২৫ হাজার শিশুর দীর্ঘমেয়াদি স্বাস্থ্যঝুঁকি নিয়েও নতুন গবেষণা শুরু হচ্ছে।
প্যাট্রিয়ট অ্যাক্ট, ব্যাপক নজরদারি, গুয়ানতানামো বে এবং কঠোর বিমানবন্দর নিরাপত্তাও বদলে দিয়েছে আমেরিকার অভ্যন্তরীণ বাস্তবতা।
২৫ বছর পর তাই প্রশ্ন একটাই—প্রায় ৩ হাজার মানুষের হত্যার প্রতিশোধ নিতে গিয়ে আমেরিকা কি এমন এক যুদ্ধের দরজা খুলেছিল, যার মূল্য গুনেছে লাখো প্রাণ, কোটি উদ্বাস্তু এবং ট্রিলিয়ন ডলারে?
সূত্র : রয়টার্স, এপি, ব্রাউন ইউনিভার্সিটি, কার্নেগি করপোরেশন, সিডিসি/ওয়ার্ল্ড ট্রেড সেন্টার হেলথ প্রোগ্রাম, দ্য গার্ডিয়ান



