যুক্তরাষ্ট্রের ২৫০ বছর : বাইরের দাপট বনাম ভেতরের লড়াই

স্বাধীনতা দিবসে আতশবাজি দেখছে দুই আমেরিকান কিশোর। ছবি : সংগৃহীত
বিশ্ব রাজনীতি, অর্থনীতি ও প্রযুক্তিতে দীর্ঘদিনের নেতৃত্ব ধরে রাখা যুক্তরাষ্ট্র তার স্বাধীনতার ২৫০তম বছরে এসে এক জটিল বাস্তবতার মুখোমুখি। একদিকে বিশ্বের অন্যতম শক্তিশালী রাষ্ট্র হিসেবে তার প্রভাব এখনো অটুট, অন্যদিকে অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক বিভাজন, গণতান্ত্রিক সংকট, সামাজিক বৈষম্য এবং বৈশ্বিক নেতৃত্বের প্রশ্নে দেশটি ক্রমেই কঠিন আত্মসমালোচনার পর্যায়ে পৌঁছেছে।
যুক্তরাষ্ট্রের স্বাধীনতা দিবস উপলক্ষে প্রকাশিত এক বিশ্লেষণে সাংবাদিক ডেভিড ইগনাতিউস লিখেছেন, যুক্তরাষ্ট্রের বর্তমান অবস্থান যেন একই সঙ্গে গৌরব ও অবক্ষয়ের প্রতিচ্ছবি। ১৭৭৬ সালের স্বাধীনতার ঘোষণার মাধ্যমে যে আদর্শিক রাষ্ট্রের জন্ম হয়েছিল, আড়াই শতক পরে সেই আদর্শ বাস্তবতার নানা পরীক্ষার মুখে দাঁড়িয়ে।
তার মতে, আজকের যুক্তরাষ্ট্র প্রতিষ্ঠাতা নেতাদের কল্পিত কৃষক ও উদ্যোক্তাভিত্তিক প্রজাতন্ত্রের চেয়ে অনেক বেশি বৈষম্যময় একটি সমাজে পরিণত হয়েছে। ধনী ও দরিদ্রের ব্যবধান বেড়েছে, রাজনৈতিক মেরুকরণ চরমে পৌঁছেছে এবং সাধারণ মানুষের রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানের প্রতি আস্থা আগের যেকোনো সময়ের তুলনায় কমে গেছে।
বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, দেশটির রাজনৈতিক ব্যবস্থা কার্যকর সিদ্ধান্ত গ্রহণে ক্রমেই অক্ষম হয়ে পড়ছে। শিক্ষাব্যবস্থার মান নিয়ে উদ্বেগ বাড়ছে, শিক্ষার্থীদের ফলাফল নিম্নমুখী এবং সামাজিক বিভক্তি এমন পর্যায়ে পৌঁছেছে, অনেকের কাছেই যুক্তরাষ্ট্রকে একক রাষ্ট্রের বদলে দুটি ভিন্ন রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক বাস্তবতার দেশ বলে মনে হয়।
ডেভিড ইগনাতিউসের মতে, এসব সংকটের মধ্যেও যুক্তরাষ্ট্রের সবচেয়ে বড় শক্তি তার জনগণ। সাধারণ আমেরিকানরা এখনো উদ্ভাবনী শক্তি, উদ্যোগ গ্রহণ এবং ব্যর্থতা থেকে ঘুরে দাঁড়ানোর মানসিকতায় বিশ্বের অন্যতম সেরা। প্রযুক্তি, চলচ্চিত্র, বিজ্ঞান, গবেষণা এবং সৃজনশীল শিল্পে যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্ব এখনো অনেক দেশের কাছে অনুসরণীয়।
তবে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে যুক্তরাষ্ট্রের অবস্থানেও উল্লেখযোগ্য পরিবর্তনের ইঙ্গিত মিলছে। লেখক সম্প্রতি থাইল্যান্ড সফরের অভিজ্ঞতা তুলে ধরে বলেন, একসময় যেসব দেশ পুরোপুরি ওয়াশিংটনের কৌশলগত প্রভাব বলয়ের অংশ ছিল, তারা এখন যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের মধ্যে ভারসাম্য রক্ষার নীতি অনুসরণ করছে। ব্যাংককের রাস্তায় চীনা বৈদ্যুতিক গাড়ির বিজ্ঞাপন, বিপুল চীনা পর্যটক এবং বাণিজ্যিক উপস্থিতি এ পরিবর্তনের স্পষ্ট প্রতীক।
আন্তর্জাতিক বিশ্লেষকদের সঙ্গে আলোচনায় তিনি আরও লক্ষ্য করেন, অনেক দেশের দৃষ্টিতে যুক্তরাষ্ট্র এখন আগের তুলনায় কম নির্ভরযোগ্য অংশীদার। বিশেষ করে সাম্প্রতিক বছরগুলোয় বৈদেশিক নীতির ঘন ঘন পরিবর্তন, বাণিজ্যিক শুল্ক আরোপ এবং আন্তর্জাতিক সহযোগিতায় অনিশ্চয়তা মিত্র দেশগুলোর মধ্যে নতুন উদ্বেগ তৈরি করেছে।
বিশ্লেষণে বলা হয়, যুক্তরাষ্ট্র যখন সুরক্ষাবাদী অর্থনৈতিক নীতি গ্রহণ করছে, তখন বিশ্বের অন্য দেশ নতুন মুক্তবাণিজ্য জোট গড়ে তুলছে। ফলে বিশ্বায়ন থেমে যায়নি; বরং নতুন বাস্তবতায় নিজেকে পুনর্গঠন করছে। বহুজাতিক প্রতিষ্ঠানগুলোও এখন আর এককভাবে যুক্তরাষ্ট্রনির্ভর ভবিষ্যৎ কল্পনা করছে না, বরং বহুমুখী বৈশ্বিক কৌশল গ্রহণ করছে।
দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার অনেক মানুষের সঙ্গে আলাপচারিতার অভিজ্ঞতা তুলে ধরে ইগনাতিউস বলেন, তারা চীনের ক্রমবর্ধমান প্রভাব নিয়ে উদ্বিগ্ন হলেও যুক্তরাষ্ট্রের প্রতি আগের মতো আস্থা রাখতে পারছেন না। তাদের কাছে বর্তমানে সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য উন্নত রাষ্ট্র হিসেবে জাপানের ভাবমূর্তি শক্তিশালী হয়েছে, কারণ তারা জাপানকে স্থিতিশীল ও পূর্বানুমানযোগ্য অংশীদার হিসেবে দেখছেন।
তবে এসব সমালোচনার মধ্যেও লেখক মনে করেন, যুক্তরাষ্ট্রের সবচেয়ে বড় শক্তি তার আত্মসমালোচনার ক্ষমতা। দেশটি ইতিহাসে বহুবার সংকটে পড়েছে, আবার সেখান থেকে ঘুরেও দাঁড়িয়েছে। গৃহযুদ্ধ, মহামন্দা, বিশ্বযুদ্ধ কিংবা রাজনৈতিক সংকট— প্রতিবারই আমেরিকা নতুনভাবে নিজেকে পুনর্গঠন করেছে।
তিনি মনে করিয়ে দেন, যুক্তরাষ্ট্রের স্বাধীনতার ঘোষণা কেবল একটি রাজনৈতিক দলিল নয়; এটি ছিল মানবিক মূল্যবোধের একটি প্রতিশ্রুতি। সব মানুষ সমান এবং জীবন, স্বাধীনতা ও সুখের অনুসন্ধান মানুষের মৌলিক অধিকার— এই আদর্শই এখনো দেশটির সবচেয়ে বড় শক্তি।
২৫০তম স্বাধীনতা দিবসে তাই যুক্তরাষ্ট্র একদিকে যেমন তার অসাধারণ অর্জন উদ্যাপন করছে, অন্যদিকে ভবিষ্যতের জন্য কঠিন প্রশ্নেরও মুখোমুখি হচ্ছে। বিশ্বনেতৃত্ব ধরে রাখা, গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানকে শক্তিশালী করা এবং জনগণের আস্থা পুনর্গঠন— এই তিন চ্যালেঞ্জই আগামী দিনের আমেরিকার পথ নির্ধারণ করবে। শক্তি ও সংকটের এই দ্বৈত বাস্তবতার মধ্যে পরাশক্তি দেশটির নতুন অধ্যায় শুরু হচ্ছে।
সূত্র: ফরেন পলিসি




