ইরানের ‘হৃদপিণ্ডে’ হামলার হুঁশিয়ারি ট্রাম্পের!
- ‘পিকঅ্যাক্স মাউন্টেন’ ঘিরে নতুন রণকৌশল

ইরানের নাতাঞ্জ পারমাণবিক স্থাপনার কাছে বিশাল গ্রানাইট পাহাড়ের গভীরে গড়ে ওঠা রহস্যময় ‘পিকঅ্যাক্স মাউন্টেন’ ঘিরে হঠাৎ বেড়েছে নির্মাণ তৎপরতা।
ইরান–যুক্তরাষ্ট্র সংঘাত এবার যেন আকাশ থেকে নেমে যাচ্ছে পাহাড়ের গভীরে। ইরানের নাতাঞ্জ পারমাণবিক স্থাপনার কাছে বিশাল গ্রানাইট পাহাড়ের গভীরে গড়ে ওঠা রহস্যময় ‘পিকঅ্যাক্স মাউন্টেন’ ঘিরে হঠাৎ বেড়েছে নির্মাণ তৎপরতা। আর এই তৎপরতার মাঝেই ট্রাম্পের সরাসরি হুঁশিয়ারি। ইরানকে সরাসরি সতর্ক করেছ মার্কিন প্রেসিডেন্ট বলেন, তেহরান নতুন কোনো পদক্ষেপ নিলে যুক্তরাষ্ট্র কঠোর সামরিক ব্যবস্থা নিতে পারে।
বুধবার রাতে ডালাসে রিপাবলিকান পার্টির মধ্যবর্তী নির্বাচন সম্মেলনে দেওয়া বক্তব্যে ট্রাম্প বলেন, ‘পিকঅ্যাক্সে আমরা কিছুটা তৎপরতা দেখছি।’ ইরানকে সতর্ক করে তিনি বলেন, তেহরান যেন কোনো ধরনের বাড়াবাড়ি না করে। অন্যথায় যুক্তরাষ্ট্রকে কঠোরভাবে আঘাত করার প্রয়োজন হতে পারে।
ট্রাম্পের এই বক্তব্যে পিকঅ্যাক্স মাউন্টেন নতুন করে উঠে এসেছে সম্ভাব্য মার্কিন সামরিক লক্ষ্য হিসেবে। এর আগে জুলাইতেও ট্রাম্প প্রকাশ্যে এই স্থাপনায় হামলার সম্ভাবনার কথা বলেছিলেন। ফলে পাহাড়টির নিচে কী আছে এবং সেখানে ইরান কী প্রস্তুতি নিচ্ছে—তা এখন ওয়াশিংটনের গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন।
পাহাড়ের নিচে কী?
নাতাঞ্জ পারমাণবিক কমপ্লেক্সের কাছাকাছি পিকঅ্যাক্স মাউন্টেনের নিচে রয়েছে গভীর ভূগর্ভস্থ টানেল কমপ্লেক্স। কয়েক বছর ধরে স্যাটেলাইট চিত্রে সেখানে নির্মাণ ও অবকাঠামোগত পরিবর্তন দেখা গেছে। ২০২৬ সালে সেই তৎপরতা আরও দৃশ্যমান হয়েছে।
প্রবেশপথ উন্নয়ন, সড়ক নির্মাণ, পাহাড় কেটে মাটি সরানো এবং অবকাঠামো শক্তিশালী করার চিহ্ন পাওয়া গেছে। এসব পরিবর্তন থেকে ধারণা করা হচ্ছে, স্থাপনাটিকে আরও সুরক্ষিত ও কার্যকর করে তোলার কাজ চলছে।
তবে পাহাড়ের ভেতরে ঠিক কী রয়েছে, তা নিশ্চিত নয়।
সম্ভাবনার মধ্যে রয়েছে সেন্ট্রিফিউজ সংযোজন, ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণের সংশ্লিষ্ট কার্যক্রম কিংবা পারমাণবিক কর্মসূচির অন্য কোনো সংবেদনশীল অবকাঠামো। কিন্তু প্রকাশ্য স্যাটেলাইট তথ্য দিয়ে ভূগর্ভের প্রকৃত কার্যক্রম নিশ্চিত করা সম্ভব নয়।
ইরানের কৌশল—পাহাড়কে ঢাল
গভীর ভূগর্ভস্থ স্থাপনা ইরানকে বড় কৌশলগত সুবিধা দিতে পারে। পাহাড়ের শক্ত শিলাস্তর প্রাকৃতিক বর্ম হিসেবে কাজ করে। কোনো প্রবেশপথ ক্ষতিগ্রস্ত হলেও ভেতরের মূল স্থাপনা অক্ষত থাকার সম্ভাবনা থাকে।
এ কারণেই পিকঅ্যাক্স মাউন্টেনকে সাধারণ সামরিক লক্ষ্যবস্তুর সঙ্গে তুলনা করা কঠিন।
ইরান যদি গুরুত্বপূর্ণ সরঞ্জাম বা অবকাঠামো আরও গভীরে সরিয়ে নিতে পারে, তাহলে যুক্তরাষ্ট্রের জন্য তা ধ্বংস করা আরও কঠিন হয়ে পড়বে।
এখানেই শুরু হয়েছে নতুন প্রতিযোগিতা—কে কত গভীরে পৌঁছাতে পারে?
যুক্তরাষ্ট্রের সামনে কঠিন হিসাব
গভীর ভূগর্ভস্থ স্থাপনায় আঘাত হানতে যুক্তরাষ্ট্রের শক্তিশালী বাঙ্কার-বিধ্বংসী অস্ত্র রয়েছে। কিন্তু পিকঅ্যাক্সের ক্ষেত্রে শুধু বোমার শক্তিই যথেষ্ট নয়।
অস্ত্র কত গভীরে পৌঁছাবে, কোথায় বিস্ফোরিত হবে এবং বিস্ফোরণের শক্তি মূল স্থাপনায় কতটা কার্যকরভাবে পৌঁছাবে—এসব প্রশ্নই বড়।
ফলে ওয়াশিংটনের সামনে এখন সময়ের সঙ্গে পাল্লা দেওয়ার চ্যালেঞ্জ। হামলা করলে স্থাপনাটি পুরোপুরি ধ্বংস হবে—এমন নিশ্চয়তা নেই। আবার অপেক্ষা করলে ইরান স্থাপনাটিকে আরও শক্তিশালী করার সুযোগ পেতে পারে।
পারমাণবিক সক্ষমতা কি সরানো হচ্ছে?
ইসরায়েলি গোয়েন্দা মূল্যায়ন ঘিরে এমন দাবি রয়েছে যে ইরান পারমাণবিক কর্মসূচির কিছু যন্ত্রপাতি ও সেন্ট্রিফিউজ-সংশ্লিষ্ট সরঞ্জাম পাহাড়ের গভীরে সরিয়ে থাকতে পারে।যদি এই দাবি সত্য হয়, তাহলে পিকঅ্যাক্স মাউন্টেনের গুরুত্ব বহুগুণ বেড়ে যাবে।
তবে এর স্বাধীন ও পূর্ণাঙ্গ যাচাই এখনো সম্ভব হয়নি। ফলে স্থাপনাটির ভেতরে ঠিক কী রয়েছে, তা নিয়ে অনিশ্চয়তা থেকেই যাচ্ছে।
হামলা হলে কাঁপবে হরমুজ
পিকঅ্যাক্সে হামলা হলে প্রতিক্রিয়া শুধু ইরান–যুক্তরাষ্ট্র সংঘাতেই সীমাবদ্ধ থাকার আশঙ্কা নেই। ইরান পাল্টা আঘাত করলে মধ্যপ্রাচ্যে মার্কিন ঘাঁটি ও মিত্রদেশগুলো ঝুঁকিতে পড়তে পারে।
সবচেয়ে বড় উদ্বেগ হরমুজ প্রণালি।
বিশ্বের গুরুত্বপূর্ণ তেল পরিবহনপথটিতে উত্তেজনা তৈরি হলে আন্তর্জাতিক জ্বালানি বাজারে বড় ধাক্কা
আসতে পারে। বাড়তে পারে তেলের দাম, পরিবহন ব্যয় ও মূল্যস্ফীতির চাপ। এর প্রভাব পৌঁছাতে পারে ইউরোপ থেকে এশিয়া, এমনকি দক্ষিণ এশিয়ার বাজারেও।
পাহাড়ের নিচেই কি পরবর্তী যুদ্ধ?
পিকঅ্যাক্স মাউন্টেন এখন শুধু একটি স্থাপনা নয়—ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের নতুন সামরিক কৌশলের প্রতীক।
ইরান পাহাড়কে ঢাল বানাচ্ছে। যুক্তরাষ্ট্র খুঁজছে সেই ঢাল ভেদ করার সক্ষমতা।
ট্রাম্পের হুঁশিয়ারির পর তাই পিকঅ্যাক্স মাউন্টেন ঘিরে প্রতিটি নির্মাণ তৎপরতা ও সামরিক প্রস্তুতি নতুন গুরুত্ব পাচ্ছে।
প্রশ্ন একটাই—যুক্তরাষ্ট্র কি ইরানের পাহাড়ের ‘হৃদপিণ্ডে’ পৌঁছাতে পারবে, নাকি পিকঅ্যাক্স মাউন্টেনই হয়ে উঠবে তেহরানের সবচেয়ে সুরক্ষিত পারমাণবিক দুর্গ?
এই প্রশ্নের উত্তর নির্ধারণ করতে পারে ইরান–যুক্তরাষ্ট্র সংঘাতের পরবর্তী অধ্যায়। আর তার অভিঘাত পৌঁছাতে পারে মধ্যপ্রাচ্যের নিরাপত্তা, হরমুজ প্রণালি এবং পুরো বিশ্ব জ্বালানি বাজারে।
সূত্র: রয়টার্স, সিএনএন, এপি, আল জাজিরা



