মন্দা ও এআইয়ের দাপট
চাকরি নিয়ে অনিশ্চয়তায় যুক্তরাষ্ট্রের গ্র্যাজুয়েটরা

চাকরিপ্রত্যাশী এক গ্র্যাজুয়েট। ছবি : সংগৃহীত
প্রতি বছর মে মাস এলেই নিউ ইয়র্ক সিটির ওয়াশিংটন স্কয়ার পার্কে গাউন আর ক্যাপ পরা বিশ্ববিদ্যালয়ের শেষ বর্ষের শিক্ষার্থীদের ভিড় জমে। চেনা-জানা ক্যাম্পাসের গণ্ডি পেরিয়ে এক অজানা-অনিশ্চিত ভবিষ্যতের দিকে পা বাড়ানোর আগে মূলত ছবি তোলার জন্যই জড়ো হন এই তরুণ-তরুণীরা।
কিন্তু ২০২৬ সালের চিত্রটা একটু ভিন্ন। চলতি বছর কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার দাপট তো রয়েছেই, সঙ্গে এবারের সমাবর্তনের আনন্দ অনেকটাই ম্লান করে দিয়েছে যুক্তরাষ্ট্রের বর্তমান কঠিন চাকরির বাজার পরিস্থিতি।
জনস্বাস্থ্যে মাস্টার্স শেষ করা জুলি প্যাটেল নামের এক গ্র্যাজুয়েট বলেছেন, ‘আমি যখন এই কোর্সে ভর্তি হয়েছিলাম, তখনকার প্রত্যাশার সঙ্গে এখনকার বাস্তবতার আকাশ-পাতাল তফাত। সত্যি বলতে এখানে চাকরির সুযোগ কিংবা ফান্ডিংয়ের অবস্থা এখন খুবই খারাপ।’
যুক্তরাষ্ট্রের লাখ লাখ তরুণের মতোই জুলিও এখন এক অনিশ্চিত কর্মক্ষেত্রে প্রবেশ করছেন। শুল্ক নীতি, এআইয়ের প্রভাব, বৈশ্বিক যুদ্ধবিগ্রহ এবং সরকারি খাতের বাজেট কাটছাটের কারণে দেশটিতে নতুন কর্মী নিয়োগের গতি অনেকটাই কমে গেছে।
যুক্তরাষ্ট্রের শ্রম পরিসংখ্যান ব্যুরোর সাম্প্রতিক তথ্যানুযায়ী, গত মার্চে দেশে ৬৯ লাখ চাকরির পদ খালি থাকলেও নিয়োগ বেড়েছে মাত্র সামান্য। এর বড় কারণ হলো, যাদের অলরেডি চাকরি আছে, অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তার কারণে তারা কেউ চাকরি ছাড়ছেন না। ফলে পুরো বাজার স্থবির হয়ে পড়েছে।
অর্থনৈতিক গবেষণা প্রতিষ্ঠান ইকোনমিক পলিসি ইনস্টিটিউটের এক বিশ্লেষক জানান, নিয়োগের হার কমে যাওয়া এটাই প্রমাণ করে, নতুনদের জন্য চাকরির বাজারে ঢোকা এখন অত্যন্ত কঠিন।
পরিসংখ্যান বলছে, বর্তমানে তথ্যপ্রযুক্তি ও আর্থিক খাতের মতো বড় বড় ক্ষেত্রে উল্টো হাজার হাজার মানুষ চাকরি হারাচ্ছেন। ২০২৬ সালের শুরু থেকে এ পর্যন্ত প্রতি মাসে গড়ে মাত্র ৬৮ হাজার নতুন চাকরি তৈরি হয়েছে। যা বিগত বছরগুলোর তুলনায় অনেক কম।
বস্টন কলেজের অ্যাসোসিয়েট ডিন আলেকজান্ডার টমিচ একে বর্ণনা করেছেন ‘নো-হায়ার, নো-ফায়ার’। মানে ‘নিয়োগও নেই, ছাঁটাইও নেই’ পরিস্থিতি হিসেবে।
আলেকজান্ডার টমিচ বলেছেন, ‘পুরোনোরা চাকরি না ছাড়ায় বাজারে নতুনদের জায়গা হচ্ছে না। তার ওপর বিগত দিনে ছাঁটাই হওয়া অভিজ্ঞ কর্মীরাও এখন নতুনদের পদের জন্য প্রতিযোগিতা করছেন।’
সরকারি খাতের বড় বড় বাজেট কাটছাঁটও নতুনদের ওপর বড় ধাক্কা দিয়েছে। ইলন মাস্কের নেতৃত্বাধীন ডিপার্টমেন্ট অব গভর্নমেন্ট এফিসিয়েন্সি সরকারি খরচ কমাতে গিয়ে ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অব হেলথের প্রায় ৪০০ কোটি ডলারের গবেষণা ফান্ড কেটে নিয়েছে।
এর ফলে হার্ভার্ড, ডিউক কিংবা মেরিল্যান্ডের মতো বড় বড় মার্কিন বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে নতুন কর্মী নিয়োগ পুরোপুরি বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে।
জুলি প্যাটেলের সহপাঠী মলি হাওয়ার্ড বলেছেন, ‘আমাদের এখন শুধু নিজেদের ব্যাচের সঙ্গেই লড়াই করতে হচ্ছে না, গত বছরের ব্যাচ এবং ফান্ডিং বন্ধ হয়ে চাকরি হারানো অভিজ্ঞ মানুষদের সঙ্গেও প্রতিযোগিতা করতে হচ্ছে।’
একই চিত্র আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগের গ্র্যাজুয়েটদের ক্ষেত্রেও। ইউএসএআইডি জাতিসংঘের ফান্ডিং কমে যাওয়ায় বিভিন্ন থিংক ট্যাংক ও সরকারি সংস্থায় পদের সংখ্যা কমে গেছে। ফলে ইন্টার্নশিপ পাওয়ার জন্যও এখন গ্র্যাজুয়েটদের অভিজ্ঞদের সঙ্গে লড়াই করতে হচ্ছে।
নতুন গ্র্যাজুয়েটদের জন্য সবচেয়ে বড় হুমকি হয়ে দাঁড়িয়েছে এআই। স্ট্যানফোর্ড ডিজিটাল ইকোনমি ল্যাবের তথ্যানুযায়ী, সফটওয়্যার ইঞ্জিনিয়ারিং বা কাস্টমার সার্ভিসের মতো প্রাথমিক স্তরের চাকরিগুলোতে নিয়োগ ১৬ শতাংশ কমে গেছে।
নর্থইস্টার্ন ইউনিভার্সিটি থেকে ডেটা কমিউনিকেশনে মাস্টার্স করা ভিভিকা ডিসুজা বলেছেন, গত এক মাসে আমি ৬০টি জায়গায় আবেদন করেছি। কিন্তু সাড়া পেয়েছি মাত্র ১০-১২ শতাংশ। এটা অত্যন্ত হতাশাজনক।
এর আগেও ২০০৮ সালের মন্দা কিংবা ২০২০ সালের করোনা মহামারির সময়ে নতুন গ্র্যাজুয়েটরা সংকটে পড়েছিলেন। তবে বিশ্লেষক টমিচ মনে করেন, এবারের সংকটটা আলাদা। করোনা মহামারি পুরো অর্থনীতিকে আঘাত করেছিল। কিন্তু এআইয়ের ধাক্কাটা মূলত লেগেছে অনভিজ্ঞ নতুনদের ওপর।
বর্তমানে নতুন গ্র্যাজুয়েটদের মধ্যে বেকারত্বের হার ৫.৬ শতাংশ। যা সাধারণ জনগণের বেকারত্বের হারের (৪.২ শতাংশ) চেয়ে বেশি।
লেময়ন-ওয়েন কলেজের প্রেসিডেন্ট ক্রিস্টোফার ডেভিস শিক্ষার্থীদের আশাহত না হওয়ার পরামর্শ দিয়েছেন।
ক্রিস্টোফার ডেভিস শিক্ষার্থীদের বলেছেন, অর্থনীতিতে এমন চড়াই-উতরাই আসেই। ডিগ্রি হয়তো আপনাকে ইন্টারভিউ পর্যন্ত নিয়ে যাবে, কিন্তু মানুষের সঙ্গে যোগাযোগ করার ব্যক্তিগত দক্ষতা এবং নেটওয়ার্কিংই এই এআইয়ের যুগে চাকরি পেতে ও টিকিয়ে রাখতে সাহায্য করবে।
সূত্র : আলজাজিরা




