ক্রমেই বাড়ছে ট্রাম্পের ভুলভাল বকা

মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। ছবি : সংগৃহীত
মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প কখনোই রাজনীতিবিদদের মুখ ফস্কে বলে ফেলা ভুল কথার ব্যাপারে সদয় বা ক্ষমাশীল ছিলেন না। ২০২২ সালের একটি নির্বাচনী সমাবেশে তিনি জো বাইডেনের ভুল কথার ভিডিও দেখিয়ে বিদ্রূপ করেছিলেন।
২০২৪ সালেও বাইডেন ট্রাম্প ও কমলা হ্যারিসের নাম গুলিয়ে ফেলায় উপহাস করতে ছাড়েননি তিনি। এমনকি ২০১৮ সালে বারাক ওবামা ভুল করে যুক্তরাষ্ট্রের ৫৭টি অঙ্গরাজ্য সফরের কথা বললে দীর্ঘদিন ধরে ট্রাম্পও সেই বিদ্রূপে সুর মিলিয়েছিলেন।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে ট্রাম্প লিখেছিলেন, ‘ভাবতে পারেন, আমি যদি এমন কথা বলতাম, তাহলে এটাই হতো বছরের সবচেয়ে বড় খবর!’
কিন্তু ভাগ্যের নির্মম পরিহাসে বাস্তবে এখন ট্রাম্প নিজেই বারবার এ ধরনের ভুল করে বসছেন। এর সবচেয়ে স্পষ্ট উদাহরণ দেখা গেল সম্প্রতি তুরস্কে অনুষ্ঠিত ন্যাটো শীর্ষ সম্মেলনে।
সেখানে ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কির পাশে দাঁড়িয়ে কথা বলার সময় মাত্র ১০ মিনিটেরও কম সময়ে তিনি তিনটি বড় ভুল করেন।
যার একটি ছিল ইরানকে ‘ইসলামিক রিপাবলিক অব জাপান’ বলে উল্লেখ করা। তবে শুধু এটিই নয়, সাম্প্রতিক সময়ে তার এমন আরও অনেক ভুল ও গুলিয়ে ফেলার ঘটনা বিশ্ববাসীকে চমকে দিয়েছে।
ইরান ও জাপান
একটি সংঘাতের ঘটনা বর্ণনা করতে গিয়ে ট্রাম্প ভুল করে ইরানকে ‘ইসলামিক রিপাবলিক অব জাপান’ বলে বসেন। বাস্তবে যার কোনো অস্তিত্বই নেই।
ট্রাম্প বলেছেন, আমি গতকালই গল্পটি বলছিলাম। ইসলামিক রিপাবলিক অব জাপান আমাদের দিকে ১১১টি ক্ষেপণাস্ত্র ছুড়েছিল। প্রায় এক ঘণ্টার মধ্যে ওই ক্ষেপণাস্ত্রগুলো বিমানবাহী যুদ্ধজাহাজের দিকে নিক্ষেপ করা হয়েছিল।
শুধু তাই নয়, ওই একই অনুষ্ঠানে বারাক ওবামার আমলের ইরান পরমাণু চুক্তির সংক্ষিপ্ত রূপ ‘জেসিপিওএ’কেও ভুল উচ্চারণ করে তিনি বলেন ‘জেসিপিওসি’।
জেলেনস্কি ও পুতিন
ন্যাটো সম্মেলনে জেলেনস্কির পাশে বসেই ট্রাম্প সাংবাদিকদের উদ্দেশে বলেছেন, প্রেসিডেন্ট পুতিনের জন্য আপনাদের কোনো প্রশ্ন আছে? এর আগে ক্ষুদ্র ব্যবসা প্রশাসনের প্রধান কেলি লোফলারের সঙ্গে ট্রাম্প-পন্থী সংগীতশিল্পী নিকি মিনাজের নাম গুলিয়ে ফেলেন তিনি।
কেলির স্বামীর প্রসঙ্গ টেনে তিনি বলেছেন, ‘জেফ চমৎকার। তিনি এমন একজনকে বিয়ে করেছেন, যিনি আমাদের ক্ষুদ্র ব্যবসা প্রশাসনে অসাধারণ কাজ করছেন। আর তিনি হলেন নিকি মিনাজ।’ এর দুই মিনিট পর অবশ্য তিনি ইচ্ছা করেই আবার মিনাজের নাম নেন।
মাস্ক হয়ে গেলেন লিয়ন
গত জুন মাসে সংস্কার করা নতুন এয়ার ফোর্স ওয়ান বিমান পরিদর্শনের সময় ট্রাম্প প্রযুক্তির প্রশংসা করতে গিয়ে বলেছেন, ‘ওপরে এমন যোগাযোগ সরঞ্জাম রয়েছে, যা আগে কেউ কখনো দেখেনি। এর মধ্যে স্টারলিংকও রয়েছে।’
এরপরই নিজের ঘনিষ্ঠ বন্ধুকে উল্লেখ করতে গিয়ে তিনি বলে ফেলেন, ‘আমার বন্ধু লিয়ন—আমার বন্ধু ইলন এতে খুবই খুশি হবে।’
এছাড়া মে মাসে ইন্ডিয়ানা ইউনিভার্সিটি ফুটবল জাতীয় চ্যাম্পিয়নশিপ উদযাপনের অনুষ্ঠানে প্রধান কোচ কার্ট সিগনেত্তি তার ঠিক পাশেই দাঁড়িয়ে থাকা সত্ত্বেও ট্রাম্প তাঁকে খুঁজতে থাকেন এবং জানতে চান কোচ কোথায় আছেন।
আফগানিস্তান ও ওবামা-বাইডেন বিভ্রান্তি
মে মাসে আফগানিস্তান থেকে সেনা প্রত্যাহারের সময় ১৩ জন মার্কিন সেনার নিহত হওয়ার ঘটনার জন্য ট্রাম্প সরাসরি বারাক ওবামাকে দোষারোপ করেন। অথচ বাস্তবে ওই সিদ্ধান্ত বাস্তবায়ন করেছিলেন জো বাইডেন।
ট্রাম্প বলেছেন, ‘বিমানবন্দর ছেড়ে যাওয়ার সময় তারা ১৩ জনকে হারিয়েছিল—ওবামা। ওই ১৩ জন অসাধারণ মানুষ ছিলেন।’
দেশ ও মহাদেশের নাম
গত মে মাসে চীনের প্রেসিডেন্ট শি চিনপিংয়ের তাইওয়ান নীতি নিয়ে করা এক প্রশ্নের জবাবে ট্রাম্প এমনভাবে উত্তর দেন, যেন প্রশ্নটি ইরান সম্পর্কে করা হয়েছিল। ট্রাম্প বলেছেন, আমার মনে হয় না কোনো সংঘাত হবে। শুধু আমাদের তাদের—তাদের প্রণালির প্রয়োজন নেই।
আবার এপ্রিল মাসে ইউক্রেন যুদ্ধে হেরে গেছে দাবি করার পরপরই তিনি দেশের নৌবাহিনীর ১৫৯টি জাহাজের যে যুক্তি দেন, তা মূলত তিনি ইরান প্রসঙ্গে ব্যবহার করে থাকেন।
একই মাসে নারী ইতিহাস মাসের এক অনুষ্ঠানে নিজের প্রশাসনের হোয়াইট হাউসের প্রেস সচিব ক্যারোলিন লেভিটের দৈনন্দিন কাজের প্রশংসা করতে গিয়ে তিনি কেলিয়ান কনওয়ের নাম ধরে ডাকেন, যিনি মূলত একজন কৌশলগত উপদেষ্টা।
চলতি বছরের জানুয়ারিতে সুইজারল্যান্ডের দাভোসে বিশ্ব অর্থনৈতিক ফোরামের এক ভাষণে ট্রাম্প বারবার গ্রিনল্যান্ড ও আইসল্যান্ডকে গুলিয়ে ফেলেন। তিনি দাবি করেন, গ্রিনল্যান্ড অধিগ্রহণের বিতর্কের জেরে আইসল্যান্ডের কারণে মার্কিন শেয়ার বাজারে প্রথম ধাক্কা লেগেছে।
এর আগে নভেম্বরে মিয়ামিতে দেওয়া এক ভাষণে তিনি বলেন, “কমিউনিস্ট শাসনের নিপীড়ন থেকে পালিয়ে আসা মানুষের জন্য দক্ষিণ আফ্রিকা একটি নিরাপদ আশ্রয়স্থল।” আসলে তিনি বলতে চেয়েছিলেন ‘দক্ষিণ আমেরিকা’। পরে নিজের ভুল ঢাকতে গিয়ে তিনি দুই অঞ্চলের পরিস্থিতিকেই খারাপ বলে মন্তব্য করেন।
ইতিহাস ও ভূগোলের চরম ভুল
বিশ্বের বিভিন্ন যুদ্ধ বন্ধ করার ক্ষেত্রে নিজের ভূমিকা নিয়ে ট্রাম্প বরাবরই অতিরঞ্জিত দাবি করে আসছেন। কিন্তু আজারবাইজান ও আর্মেনিয়ার মধ্যকার দীর্ঘস্থায়ী সংঘাতের মধ্যস্থতার কৃতিত্ব নিতে গিয়ে তিনি আর্মেনিয়ার বদলে আলবেনিয়ার নাম ব্যবহার করেন।
গত বছর আগস্টে একটি বেতার অনুষ্ঠানে এবং সেপ্টেম্বরের একটি টেলিভিশন সাক্ষাৎকারে তিনি দুই দেশের প্রধানমন্ত্রী ও প্রেসিডেন্টদের নিজের দপ্তরে এনে যুদ্ধ থামানোর দাবি করেন আলবেনিয়ার নাম নিয়ে। এই ভুলটি নিয়ে পরবর্তীতে ইউরোপের একটি শীর্ষ সম্মেলনে বেশ হাস্যরসের সৃষ্টি হয়।
সবচেয়ে চমকপ্রদ ঘটনাটি ঘটে গত আগস্টে। রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনের সঙ্গে একটি গুরুত্বপূর্ণ বৈঠকের আগে ট্রাম্প দুবার বলেছেন, তিনি পুতিনের সঙ্গে দেখা করতে রাশিয়ায় যাচ্ছেন।
অথচ বাস্তবিকভাবে ওই বৈঠকের নির্ধারিত স্থান ছিল যুক্তরাষ্ট্রের নিজস্ব অঙ্গরাজ্য আলাস্কা। ট্রাম্প বলেছিলেন, ‘আমরা রাশিয়ায় যাচ্ছি। এটা খুবই গুরুত্বপূর্ণ হবে।’ অথচ ১৮৬০-এর দশকের পর থেকে আলাস্কা আর কখনোই রাশিয়ার অংশ ছিল না।
সূত্র : সিএনএন





