বিচারের অপেক্ষায় ৭০ হাজার অভিবাসী বন্দি
- রায়ের আগেই বহিষ্কার
- ৯২ দিনেও নিষ্পত্তি নেই

২০২৫ সালের জানুয়ারি থেকে ৭০ হাজারের বেশি হেবিয়াস করপাস মামলা দায়ের হয়েছে।
যুক্তরাষ্ট্রে অভিবাসন আটকের বিরুদ্ধে আদালতে ছুটছেন হাজার হাজার মানুষ। কিন্তু আদালতের দরজায় পৌঁছেও মিলছে না দ্রুত সুরাহা। সম্প্রতি প্রকাশিত আদালত-রেকর্ড বিশ্লেষণ অনুযায়ী, ২০২৫ সালের জানুয়ারি থেকে ৭০ হাজারের বেশি হেবিয়াস করপাস মামলা দায়ের হয়েছে। এসব মামলার বড় অংশে সিদ্ধান্ত পেতে লাগছে সপ্তাহ থেকে মাস—কখনো তারও বেশি সময়।
অভিবাসীদের দাবি, তাদের আটক বেআইনি। তাই মুক্তি কিংবা আটক বৈধ কি না, তা নির্ধারণে ফেডারেল আদালতের দ্বারস্থ হচ্ছেন তারা। কিন্তু মামলার পাহাড়ে চাপা পড়ছে দ্রুত বিচার পাওয়ার সুযোগও।
হেবিয়াস করপাস হলো বেআইনিভাবে আটক ব্যক্তির স্বাধীনতা নিশ্চিত করার জন্য একটি আইনি ব্যবস্থা। একজন ব্যক্তি কেন আটক রয়েছেন এবং সেই আটক আইনসম্মত কি না, তা বিচারিকভাবে যাচাই করার সুযোগ তৈরি হয় এই আবেদনের মাধ্যমে।
কোথাও ১২ দিন, কোথাও ৯২ দিন!
মিনেসোটায় নিষ্পত্তি হওয়া হেবিয়াস মামলায় মধ্যম সময় লেগেছে মাত্র ১২ দিন। বিপরীতে মিসিসিপিতে সময় লাগছে ৯২ দিন বা তার বেশি। লুইজিয়ানায় ২ হাজার ৬০০টির বেশি আবেদন জমা পড়েছে; সেখানে মামলার নিষ্পত্তিতে মধ্যম সময় প্রায় ৮৯ দিন। ওকলাহোমার ওয়েস্টার্ন ডিস্ট্রিক্টে সময় লাগছে প্রায় ৬৩ দিন।
অর্থাৎ একই ধরনের আইনি প্রতিকারের জন্য একজন অভিবাসীকে যেখানে কয়েক দিন অপেক্ষা করতে হচ্ছে, অন্য একজনকে অপেক্ষা করতে হচ্ছে কয়েক মাস।আর এই অপেক্ষার মূল্য দিতে হচ্ছে বন্দিদশায় থেকেই।
রায় আসার আগেই দেশছাড়া!
মিসিসিপির একটি মামলায় এক ব্যক্তি প্রায় আট মাস আইসের হেফাজতে ছিলেন। তার হেবিয়াস আবেদন আদালতে বিচারাধীন থাকা অবস্থাতেই তাকে যুক্তরাষ্ট্র থেকে বহিষ্কার করা হয়। পরে আদালতে তার মামলা কার্যত অকার্যকর হয়ে পড়ে।
আইনজীবীদের ভাষ্যমতে , যে আইনি ব্যবস্থা একজন ব্যক্তির বেআইনি আটক দ্রুত পরীক্ষা করার সুযোগ দেওয়ার কথা, সেটিই যদি দীর্ঘসূত্রতায় আটকে যায়, তাহলে আদালতের রায় পাওয়ার আগেই একজন বন্দি ব্যক্তি দেশছাড়া হয়ে যেতে পারেন।
আদালতে মামলার পাহাড়
অভিবাসী আটকের সংখ্যা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে ফেডারেল আদালতে হেবিয়াস আবেদনের সংখ্যাও দ্রুত বেড়েছে। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে বিচারকের সংকট এবং আদালতের আগে থেকেই থাকা বিপুল মামলার চাপ। ফলে একই ধরনের মামলায় ভিন্ন আদালতে দেখা যাচ্ছে সম্পূর্ণ ভিন্ন গতি। কোথাও দ্রুত শুনানি, কোথাও দীর্ঘ অপেক্ষা।
জর্জিয়ার মিডল ডিস্ট্রিক্টে বিপুলসংখ্যক হেবিয়াস মামলার চাপকে ‘বিচারিক জরুরি অবস্থা’ হিসেবে বিবেচনা করে। সেখানে নির্দিষ্ট ধরনের মামলায় দ্রুত বন্ড শুনানির ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে।
আটক, মামলা—তারপরও অনিশ্চয়তা
দীর্ঘ সময় আটক থাকা অভিবাসীদের জীবনযাপন নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। বিভিন্ন আটককেন্দ্রে খাবার, গরম পানি, চিকিৎসা ও অন্যান্য মৌলিক সুবিধা নিয়ে অভিযোগ রয়েছে। কর্তৃপক্ষ অবশ্য এসব অভিযোগের অনেকটাই অস্বীকার করেছে।
তবে মামলার দীর্ঘসূত্রতা নিয়ে প্রশ্ন থেকেই যাচ্ছে। কারণ হেবিয়াস করপাসের মূল উদ্দেশ্যই হলো, কোনো ব্যক্তিকে আইনসম্মতভাবে আটক রাখা হয়েছে কি না, তা আদালতের মাধ্যমে দ্রুত যাচাই করা।
কিন্তু বাস্তব চিত্র বলছে, ‘বেআইনি আটক’ অভিযোগ নিয়ে আদালতে গেলেও দ্রুত বিচার নিশ্চিত হচ্ছে না।
কোথাও ১২ দিনের অপেক্ষা, কোথাও ৯২ দিনেরও বেশি। আর এর মধ্যেই কারও কারও জীবনে চলে আসছে বহিষ্কারের চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত।
অভিবাসন কঠোরতার এই নতুন বাস্তবতায় তাই প্রশ্ন উঠছে, আদালতের দরজা খোলা থাকলেও যদি রায় আসতে মাসের পর মাস লাগে, তাহলে আটক অভিবাসীদের জন্য ন্যায়বিচার কতটা কার্যকর?
তথ্যসূত্র: প্রোপাবলিকা (ProPublica),
যুক্তরাষ্ট্রের ফেডারেল আদালতের প্রকাশিত নথি ও মামলার রেকর্ড,
যুক্তরাষ্ট্রের হোমল্যান্ড সিকিউরিটি বিভাগ এবং সংশ্লিষ্ট সরকারি কর্তৃপক্ষের বক্তব্য





