স্পেসএক্সের শেয়ার পাচ্ছে মার্কিন শিশুরা, লাভ হবে কার?

শিশুদের শেয়ার উপহার দেওয়ার উদ্যোগে ট্রাম্প মাস্ককে ধন্যবাদ জানিয়েছেন। ছবি: রয়টার্স
যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিটি শিশুকে নিজের মহাকাশ ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) বিষয়ক প্রতিষ্ঠান স্পেসএক্সের শেয়ার দেওয়ার ঘোষণা দিয়েছেন ধনকুবের ইলন মাস্ক।
গতকাল সোমবার নিজের মালিকানাধীন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে দেওয়া এক পোস্টে বিশ্বের সবচেয়ে ধনী এ ব্যক্তি লিখেন, ‘আগামী বছর আমি যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিটি শিশুকে স্পেসএক্সের একটি করে শেয়ার দেব। এটি শুধু শুরুর পদক্ষেপ।’
বর্তমানে শেয়ারপ্রতি দাম ১৪৬ ডলার ধরলে প্রায় ৭ কোটি ৩০ লাখ শিশুর জন্য এই উপহারের মোট মূল্য দাঁড়াবে ১ হাজার ৭০ কোটি ডলারের বেশি।
মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এ ঘোষণাকে স্বাগত জানিয়েছেন। তার দাবি, শিশুদের জন্য খোলা ‘ট্রাম্প অ্যাকাউন্টসে’ এসব শেয়ার জমা দেওয়া হবে। এ হিসাবের অর্থ বিনিয়োগে করের ক্ষেত্রে বিশেষ সুবিধা রয়েছে।
তবে কোন শিশুরা এ সুবিধা পাবে, কবে এবং কীভাবে শেয়ার হস্তান্তর করা হবে, সে বিষয়ে বিস্তারিত জানাননি মাস্ক।
আগামী ৩ নভেম্বর যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যবর্তী নির্বাচনের মাত্র দুই সপ্তাহ আগে তার এ ঘোষণা নতুন করে আলোচনার জন্ম দিয়েছে।
মাস্কের এমন ঘোষণায় প্রশ্ন উঠেছে, এই উদ্যোগে শিশুরা কতটা লাভবান হবে, আর এর মাধ্যমে মাস্ক ও ট্রাম্পের কী সুবিধা হতে পারে।
বিশ্বের সপ্তম বৃহত্তম কোম্পানি স্পেসএক্স গত জুনে ব্যাংকিং প্রতিষ্ঠান নাসডাকে লেনদেন শুরু করেন। প্রাথমিক গণপ্রস্তাবে (আইপিও) স্পেসএক্সের শেয়ারপ্রতি দাম ছিল ১৩৫ ডলার। তালিকাভুক্তির কয়েক দিন পর দাম সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছালেও এরপর থেকে শেয়ারের মূল্য ৩৫ দশমিক ৩ শতাংশ কমেছে।
বর্তমানে শেয়ারপ্রতি দাম প্রায় ১৪৬ ডলার। এই হিসাবে প্রতিটি শিশুকে একটি করে শেয়ার দিলে উপহারের মোট মূল্য হবে প্রায় ১ হাজার ৭০ কোটি ডলার।
যুক্তরাষ্ট্রের সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশনে (এসইসি) আগস্টে জমা দেওয়া নথি অনুযায়ী, স্পেসএক্সের ৪৮০ কোটি শেয়ারের সরাসরি মালিক মাস্ক। মেয়াদ পূর্ণ না হওয়া শেয়ার ও স্টক অপশনসহ তার মালিকানার পরিমাণ প্রায় ৬৪০ কোটি শেয়ার। এটি কোম্পানিটির মোট শেয়ারের ৪৮ দশমিক ৪ শতাংশ।
৭ কোটি ৩০ লাখ শেয়ার দিয়ে দিলে তার সরাসরি মালিকানাধীন শেয়ার কমবে প্রায় ১ দশমিক ৫ শতাংশ। তবে এতে কোম্পানির ওপর তার নিয়ন্ত্রণে বড় কোনো পরিবর্তন আসবে না।
শেয়ার হস্তান্তরের পদ্ধতি নিয়ে মাস্ক বিস্তারিত কিছু না জানালেও ট্রাম্প বলেছেন, শিশুদের শেয়ারগুলো ট্রাম্প অ্যাকাউন্টসে রাখা হবে। আর এ হিসাব চালুর উদ্যোগে যুক্ত প্রযুক্তি বিনিয়োগকারী ব্র্যাড গার্স্টনারকে ধন্যবাদ জানিয়েছেন মাস্ক।
হোয়াইট হাউজের তথ্য অনুযায়ী, যুক্তরাষ্ট্রে ১৮ বছরের কম বয়সী শিশুদের জন্য প্রায় ৭ কোটি ট্রাম্প অ্যাকাউন্ট খোলা হয়েছে। সামাজিক নিরাপত্তা নম্বর থাকা প্রতিটি শিশুর জন্য একটি করে হিসাব খোলার কথা বলা হয়েছে।
এই হিসাবে জমা রাখা অর্থ বিনিয়োগ করে যে মুনাফা হবে, তার সঙ্গে সঙ্গে কর দিতে হবে না। শিশু ১৮ বছর বয়সে পৌঁছালে টাকা তোলা যাবে। চাইলে সেই টাকা প্রাপ্তবয়স্কদের অবসরকালীন সঞ্চয় হিসাব আইআরএতে স্থানান্তর করা যাবে। সেখানেও কর সুবিধা পাওয়া যাবে।
গত ৩০ সেপ্টেম্বর প্রকাশিত মার্কিন অর্থ মন্ত্রণালয়ের বিধি অনুযায়ী, এখন ট্রাম্প অ্যাকাউন্টসের মাধ্যমে শিশুদের নামে যেকোনো কোম্পানির নির্দিষ্ট শেয়ার উপহার দেওয়া সম্ভব।
শিশুদের হয়ে পরিবার এই শেয়ার নিতে অস্বীকৃতি জানাতে পারবে না। সাধারণ নিয়মে শেয়ার পাওয়ার পর পাঁচ বছর পর্যন্ত তা বিক্রিও করা যাবে না। তবে শিশুর ১৭ বছর বয়স পূর্ণ হওয়ার বছরের শেষের আগেই পাঁচ বছর পার হয়ে গেলে, ওই সময়সীমা শেষ হওয়ার পর শেয়ার বিক্রি করা যাবে।
ওয়াল স্ট্রিট জার্নালের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০২৭ সালের জুনের আগে মাস্ক তার স্পেসএক্সের অধিকাংশ শেয়ার বিক্রি বা লেনদেন করতে পারবেন না।
এ উদ্যোগ থেকে ইলন মাস্ক ও ডোনাল্ড ট্রাম্প বিভিন্নভাবে লাভবান হতে পারেন। ট্রাম্প তার সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ট্রুথ সোশ্যালে মাস্ককে ধন্যবাদ জানিয়ে বলেছেন, এই উদ্যোগ ‘ট্রাম্প অ্যাকাউন্টস’ চালুর সময় তাদের পরিকল্পনার সঙ্গে পুরোপুরি মিলে গেছে।
মাস্ক ও ট্রাম্পের সম্পর্কের টানাপড়েনের পর এ ঘোষণা তাদের প্রকাশ্য সমঝোতারও ইঙ্গিত দিচ্ছে। ২০২৫ সালে ট্রাম্পের কর ও ব্যয়সংক্রান্ত বিল নিয়ে দুজনের বিরোধ তৈরি হয়েছিল।
এ উপহারের মাধ্যমে মাস্কের কর সাশ্রয়েরও সুযোগ থাকতে পারে। মার্কিন সংবাদমাধ্যম সিএনবিসির প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, কোনো ব্যক্তি মূল্যবৃদ্ধি হওয়া শেয়ার দাতব্য প্রতিষ্ঠানে দান করলে সাধারণত মূলধনী মুনাফার কর এড়াতে পারেন। একই সঙ্গে করছাড়ও পেতে পারেন।
স্পেসএক্সের প্রতিষ্ঠাতা হিসেবে মাস্ক শেয়ারগুলো খুব কম দামে পেয়েছিলেন। তাই ১ হাজার ৭০ কোটি ডলারের শেয়ার বিক্রি করলেও তাকে প্রায় ২৫০ কোটি ডলার পর্যন্ত কর দিতে হতো।
ট্যাক্স ফাউন্ডেশনের প্রধান অর্থনীতিবিদ উইল ম্যাকব্রাইড সিএনবিসিকে বলেছেন, উচ্চ আয়ের মানুষদের মধ্যে কর কমানোর জন্য এ ধরনের পদ্ধতি বেশ প্রচলিত। যাদের বেশি হারে কর দিতে হতো, তারা সাধারণত এ পদ্ধতি ব্যবহার করেন।
যুক্তরাষ্ট্রে রাজনৈতিক প্রভাব নিয়ে গবেষণা করা স্টকহোম বিশ্ববিদ্যালয়ের ইনস্টিটিউট ফর ইন্টারন্যাশনাল ইকোনমিক স্টাডিজের অর্থনীতিবিদ মিচেল ডাউনি এ উদ্যোগের আরেকটি দিক তুলে ধরেছেন।
তার মতে, এখানে ডান ও বামপন্থী নীতির ধারণা এক জায়গায় মিলেছে। কয়েক দশক ধরে প্রগতিশীলরা নবজাতক শিশুদের জন্য বিনিয়োগ হিসাব চালুর পক্ষে ছিলেন। তাদের উদ্দেশ্য ছিল, প্রত্যেক শিশুর নামে বিনিয়োগের ব্যবস্থা করে সম্পদের বৈষম্য কমানো।
ডেমোক্রেসি কোলাবোরেটিভের মতো সংগঠন এই ধারণার পক্ষে কাজ করলেও কেন্দ্রীয় পর্যায়ে তা বাস্তবায়নে তেমন সমর্থন পায়নি। এখন মাস্কের উপহার ও ট্রাম্প অ্যাকাউন্টসের কারণে ধারণাটি আরও মূলধারায় আসতে পারে।
মিচেল ডাউনি সংবাদমাধ্যম আল জাজিরাকে বলেছেন, এ প্রতিশ্রুতিতে আইনগত সমস্যা আছে বলে তিনি মনে করেন না।
তার মতে, কোনো ব্যক্তি রাজনৈতিক কাউকে সমর্থন করতে নিজের অর্থ খরচ করতে পারেন। তবে সেই অর্থের হিসাব প্রকাশ না করলে বা বিনিময়ে বিশেষ সুবিধা দেওয়ার কোনো লিখিত চুক্তি থাকলে তা আইন লঙ্ঘন করতে পারে।
ডাউনি বলছিলেন, এ ধরনের উদ্যোগে নৈতিক প্রশ্ন রয়েছে। বিশেষ করে যুক্তরাষ্ট্রের নির্বাচনে বাইরের বড় দাতাদের অতিরিক্ত প্রভাব নিয়ে উদ্বেগ রয়েছে।
আগামী ৩ নভেম্বর যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যবর্তী নির্বাচন। এই নির্বাচনের মাধ্যমে কংগ্রেসের প্রতিনিধি পরিষদের সব আসন এবং সিনেটের প্রায় এক-তৃতীয়াংশ আসনের ভাগ্য নির্ধারিত হবে। কংগ্রেসের দুই কক্ষের নিয়ন্ত্রণ কার হাতে থাকবে, তা নির্ভর করছে এ নির্বাচনের ওপর।
ওয়াশিংটন পোস্ট, এবিসি নিউজ ও ইপসোসের এক জরিপ অনুযায়ী, ট্রাম্পের প্রতি জনসমর্থন কমে ৩৩ শতাংশে নেমেছে। যা তার জন্য রেকর্ড সর্বনিম্ন। রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকদের অনেকে মনে করছেন, এর ফলে রিপাবলিকানরা ডেমোক্র্যাটদের কাছে আসন হারাতে পারেন।
২০২৪ সালের নির্বাচনে ট্রাম্পের পক্ষে প্রচারে অংশ নিয়েছিলেন মাস্ক। পরে সরকারি ব্যয় ও কর্মীসংখ্যা কমানোর লক্ষ্যে গঠিত ট্রাম্পের সরকারি দক্ষতা বিভাগ বা ডিওজিই উদ্যোগেও নেতৃত্ব দেন তিনি।
এবারের মধ্যবর্তী নির্বাচনের আগে মাস্ক রিপাবলিকান প্রার্থীদের জন্য বিপুল অর্থ ব্যয় করেছেন। জুলাই থেকে এ পর্যন্ত রিপাবলিকান গোষ্ঠীগুলোকে ২৭ কোটি ৬০ লাখ ডলারের বেশি দিয়েছেন তিনি।
এ অবস্থায় শিশুদের শেয়ার দেওয়ার ঘোষণা রাজনৈতিক ও নৈতিক বিতর্ক তৈরি করেছে। তবে ডাউনি মনে করেন, মাস্কের এ উদ্যোগের নজির মূল্যায়ন করা কঠিন।
উদাহরণ হিসেবে তিনি গেটস ফাউন্ডেশনের কথা উল্লেখ করেছেন। গত তিন দশকে এই ফাউন্ডেশন বিভিন্ন জনকল্যাণমূলক কাজে অর্থ ব্যয় করেছে। তবে এর কাজের ধরন আলাদা। আফ্রিকা ও দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোয় স্বাস্থ্যসংকট মোকাবিলায় ফাউন্ডেশনটি অর্থায়ন করে; যুক্তরাষ্ট্রের ভোটারদের লক্ষ্য করে নয়।
গত বছর বিল গেটস ঘোষণা দিয়েছিলেন, আগামী ২০ বছরে বিশ্বের মানুষের জীবন রক্ষা ও উন্নয়নের কাজে গেটস ফাউন্ডেশনের মাধ্যমে তিনি তার প্রায় সব সম্পদ দান করবেন।
সূত্র : আল জাজিরা






