মার্কিন রাজনীতিতে এবার মুসলিম জোয়ার
- শত প্রার্থীর ঐতিহাসিক জয়

মার্কিন রাজনীতিতে এবার মুসলিম জোয়ার দেখল বিশ্ব। দেশটিতে ক্রমেই যে মুসলিম সম্প্রদায় বাড়ছে, তারই স্পষ্ট প্রতিফলন দেখা গেল সদ্যসমাপ্ত এই মধ্যবর্তী নির্বাচনে (গত ৩ নভেম্বর)। ইসলামবিদ্বেষী প্রচার, রাজনৈতিক আক্রমণ এবং নানা ধরনের বাধার মধ্যেও দেশটির মধ্যবর্তী নির্বাচনে এবার অন্তত ৯৭ জন মুসলিম প্রার্থী জয়ী হয়েছেন। তাদের মধ্যে রয়েছেন একজন সিনেটর, ছয়জন প্রতিনিধি পরিষদের সদস্য এবং বিভিন্ন অঙ্গরাজ্য, স্থানীয় প্রশাসন, শিক্ষা পর্ষদ ও বিচার বিভাগের নির্বাচিত জনপ্রতিনিধি। আরও এক ডজনের বেশি মুসলিম প্রার্থী এগিয়ে রয়েছেন। তবে তাদের জয় নিশ্চিত কি না, তা নির্ভর করছে বাকি ভোট গণনা এবং সংশ্লিষ্ট এলাকার নির্বাচনী নিয়মের ওপর।
গত শুক্রবার প্রকাশিত মিডল ইস্ট আইয়ের প্রতিবেদন অনুযায়ী, আমেরিকান-ইসলামিক রিলেশনস কাউন্সিলের (সিএআইআর) হিসাবেই এ সংখ্যা উঠে এসেছে। প্রাইমারি পর্ব পেরিয়ে মূল নির্বাচনে লড়ার সুযোগ পেয়েছিলেন ১৬৮ জন মুসলিম প্রার্থী। তাদের মধ্যে অন্তত ৯৭ জনের জয় নিশ্চিত হয়েছে। গত বছর নিউ ইয়র্কের মেয়র নির্বাচনে জোহরান মামদানির বড় জয়ও মুসলিম প্রার্থীদের নতুন করে নির্বাচনে দাঁড়াতে উৎসাহ জুগিয়েছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। এবারের নির্বাচনে সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য ঘটনা মিশিগান থেকে ডেমোক্র্যাট প্রার্থী আবদুল আল-সাইয়েদের জয়। ৪২ বছর বয়সী এই চিকিৎসক ও জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ রিপাবলিকান মাইক রজার্সকে হারিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের প্রথম মুসলিম সিনেটর নির্বাচিত হয়েছেন। স্বাস্থ্য পরিষেবা, জীবনযাত্রার ব্যয় এবং করপোরেট সংস্থাগুলোর রাজনৈতিক প্রভাব ছিল তার প্রচারের অন্যতম বিষয়। ইসরায়েলকে মার্কিন সামরিক সাহায্য দেওয়ারও সমালোচনা করেছেন তিনি। নির্বাচনী প্রচারে মুসলিম পরিচয় গোপন না করে বরং নিজের ধর্মীয় বিশ্বাস ও দৈনন্দিন জীবনের কথা প্রকাশ্যে তুলে ধরেছিলেন আল-সাইয়েদ।
প্রতিনিধি পরিষদেও বেড়েছে মুসলিমদের উপস্থিতি। পুনর্নির্বাচিত হয়েছেন ইলহান ওমর, রাশিদা তালিব, আন্দ্রে কারসন এবং লতিফা সাইমন। তাদের সঙ্গে প্রথমবার কংগ্রেসে যাচ্ছেন আদম হামাউই ও দারিয়ালিজা আভিলা শেভালিয়ের। নিউ জার্সির ১২তম আসনে রিপাবলিকান গ্রেগ মেলেকে হারিয়েছেন মিসরীয় বংশোদ্ভূত হামাউই। তিনি পেশায় শল্যচিকিৎসক। ২০০৪ সালে ইরাকে মার্কিন সেনাবাহিনীর চিকিৎসক হিসেবে কাজ করার সময় হেলিকপ্টার হামলায় আহত তামি ডাকওয়ার্থের জীবন বাঁচাতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নিয়েছিলেন তিনি। পরে গাজায় ইসরায়েলি হামলায় আহত ফিলিস্তিনিদের, বিশেষত শিশুদের চিকিৎসা করতেও স্বেচ্ছাসেবী হিসেবে কাজ করেছেন তিনি। মিশিগানের ১২তম আসনে পঞ্চমবার জিতেছেন রাশিদা তালিব। মিনেসোটার পঞ্চম আসনে পঞ্চমবারের মতো জয় পেয়েছেন সোমালীয় বংশোদ্ভূত ইলহান ওমর। নিউ ইয়র্কের ১৩তম আসনে জিতে ইতিহাস গড়েছেন ৩৩ বছর বয়সী দারিয়ালিজা। তিনি কংগ্রেসে নির্বাচিত প্রথম লাতিনা মুসলিম নারী। ক্যালিফোর্নিয়ার ১২তম আসনে পুনর্নির্বাচিত হয়েছেন লতিফা সাইমন। ক্যালিফোর্নিয়ার ১৪তম আসনে এগিয়ে রয়েছেন আয়েশা ওয়াহাব। তবে শুক্রবার সকাল পর্যন্ত তার জয় নিশ্চিত হয়নি।
রাজ্যের আইন সভাগুলোয়ও মুসলিম প্রার্থীদের সাফল্য উল্লেখযোগ্য। নিউ ইয়র্কের ১২তম আসনের স্টেট সিনেটর নির্বাচিত হয়েছেন ফিলিস্তিনি বংশোদ্ভূত আবের কাওয়াস। ১৯৪৮ সালে তার পরিবার ফিলিস্তিন থেকে বাস্তুচ্যুত হয়েছিল। মিশিগানের দ্বিতীয় আসনে জিতেছেন লেবানিজ বংশোদ্ভূত আব্বাস আলাউইহ। ২০২৪ সালে ইসরায়েলকে বাইডেন প্রশাসনের সমর্থনের প্রতিবাদে গড়ে ওঠা ‘আনকমিটেড’ আন্দোলনের অন্যতম উদ্যোক্তা ছিলেন তিনি। ইলিনয়ের ২৬তম আসনে রিপাবলিকান প্রার্থীকে হারিয়ে আসনটি ডেমোক্র্যাটদের দখলে এনেছেন ভারতীয় বংশোদ্ভূত নাবিলা সৈয়দ। জর্জিয়ায় রুয়া রোমান এবং কলোরাডোয় ইমান জোদেহসহ আরও কয়েকজন মুসলিম প্রার্থী রাজ্য আইনসভায় জয় পেয়েছেন। টেক্সাসে পুনর্নির্বাচিত হয়েছেন পাকিস্তানি বংশোদ্ভূত সালমান ভোজানি ও সুলেমান লালানি। পাশাপাশি স্থানীয় প্রশাসন ও শিক্ষা পর্ষদেও জয় পেয়েছেন বহু মুসলিম প্রার্থী। সিএআইআরের হিসাবে, রাজ্য পর্যায়ে ৩৯, কাউন্টি ও পৌরসভায় ১৬, শিক্ষা ও স্কুল বোর্ডে ২৭ এবং বিচার বিভাগে আটজন জয়ী হয়েছেন।
এই সাফল্যের তাৎপর্য আরও বেড়েছে নির্বাচনের আগে মুসলিমবিরোধী প্রচারের আবহে। সেন্টার ফর দ্য স্টাডি অব অর্গানাইজড হেটের (সিএসও) ৩৬ পাতার এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০২৫ সালে রিপাবলিকান জনপ্রতিনিধিদের মধ্যে সমন্বিত ইসলামবিদ্বেষী প্রচার দেখা গিয়েছিল। ওই সময় মুসলিমদের বিরুদ্ধে ১ হাজার ১১১টি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের পোস্ট, আটটি বিল এবং ৬২ সদস্যের একটি কংগ্রেসনাল গোষ্ঠীর তৎপরতার কথা উল্লেখ করা হয়েছে প্রতিবেদনে। ক্যালিফোর্নিয়ায় মসজিদে হামলায় নিরাপত্তারক্ষীর মৃত্যু, ইলিনয়ে হিজাব পরা নারীদের গুলি করার হুমকি এবং বিভিন্ন জায়গায় ইসলামবিদ্বেষী দেয়াললিখনও উদ্বেগ বাড়িয়েছে।



