আমেরিকার নারীমুক্তির আন্দোলনের প্রতীক গ্লোরিয়া স্টাইনামের মৃত্যু

গ্লোরিয়া স্টাইনাম- রয়টার্স
নারী অধিকার আন্দোলনের অন্যতম প্রধান মুখ, লেখক ও সাংবাদিক গ্লোরিয়া স্টাইনাম মারা গেছেন। নিউইয়র্কে নিজ বাড়িতে বুধবার ৯২ বছর বয়সে শেষ নিশ্বাস ত্যাগ করেন তিনি। নারীর সমান অধিকার, প্রজনন অধিকার ও সমান মজুরির দাবিতে দীর্ঘদিনের সোচ্চার এই আন্দোলনকর্মীর মৃত্যুতে যুক্তরাষ্ট্রজুড়ে শোক নেমে এসেছে। পাঁচ দশকের বেশি সময় ধরে নারীমুক্তি আন্দোলনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছেন স্টাইনাম।
ইন্সটাগ্রামে এক পোস্টে তার ফাউন্ডেশন লিখেছে, ‘বুধবার নিউইয়র্ক সিটির নিজ বাড়িতে ‘শান্তিপূর্ণভাবে’ মৃত্যুবরণ করেছেন তিনি। এ সময় ‘তাকে ভালোবাসতেন এমন অনেকেই’ তার পাশে ছিলেন।’
লিঙ্গবৈষম্য বিরুদ্ধে কাজ করা সংগঠন উইমেন্স অ্যাকশন অ্যালায়েন্সের সহ-প্রতিষ্ঠাতা স্টাইনাম। ৫০ বছরেরও বেশি সময় আগে সংগঠনটি যাত্রা শুরু করে।
স্টাইনাম সাংবাদিক হিসেবে নিউ ইয়র্কে তার কর্মজীবন শুরু করেন। এর পর তিনি প্রতিষ্ঠা করেন মিস ম্যাগাজিন। এটি গৃহস্থলী কাজ কিংবা রূপচর্চার বাইরে নারীদের সমস্যা নিয়ে কাজ করা প্রথম ম্যাগাজিনগুলোর একটি।
১৯৭০-এর দশকে স্টাইনাম নারীদের প্রজনন অধিকারসহ বিভিন্ন ইস্যুতে সক্রিয় প্রচার চালিয়েছেন।
২২ বছর বয়সে তিনি নিজেই লন্ডনে অবৈধভাবে গর্ভপাত করিয়েছিলেন। বহু বছর পর, ১৯৭৩ সালে ‘রো বনাম ওয়েড’ মামলায় যুক্তরাষ্ট্রের সুপ্রিম কোর্টের সেই রায়কে তিনি স্বাগত জানান। ওই রায়ে নারীদের গর্ভপাতের সাংবিধানিক অধিকার দেওয়া হয়েছিল। প্রায় অর্ধশতাব্দী পর তিনি এই সিদ্ধান্তের উল্টো সিদ্ধান্তও প্রত্যক্ষ করেন।
তিনি সমলিঙ্গের বিয়ের বৈধতা, নারীদের সমান অধিকার ও সমান বেতনের পক্ষে সোচ্চার ছিলেন। পাশাপাশি মৃত্যুদণ্ড ও নারীদের যৌনাঙ্গ বিকৃতকরণের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করেছেন।
ওহাইও টলেডোতে ১৯৩৪ সালের ২৫ মার্চ জন্মগ্রহণ করেন। তার শৈশব ছিল সঙ্কটপূর্ণ। ১২ বছর বয়স হওয়ার আগে তিনি নিয়মিত স্কুলেও যেতে পারেননি।
বিশ্ববিদ্যালয়ের পাট চুকিয়ে ১৯৫০ এর দশকে তিনি ভারতে পারি জমান। গবেষণা বৃত্তির অংশ হিসেবে তিনি সেখানে দুই বছর অবস্থান করেন। সেখানে বিভিন্ন ধরনের কাজে যুক্ত ছিলেন তিনি। এর মধ্যে ছিল সরকারি নীতির বিরুদ্ধে অহিংস প্রতিবাদ সংগঠিত করতে গ্রামের নারীদের সহায়তা করা। এই অভিজ্ঞতাই তৃণমূল পর্যায়ের আন্দোলনে তার আগ্রহ তৈরি করে।
১৯৬০ এর দশকের শুরুর দিকে তিনি নিউ ইয়র্কে চলে যান। সেখানে তিনি ফ্রিল্যান্স লেখক হিসেবে কাজ শুরু করেন। প্লেবয় বানিদের কর্মপরিবেশ নিয়ে একটি অনুসন্ধানী প্রতিবেদন প্রকাশের মাধ্যমে তার বড় ধরনের পরিচিতি পান তিনি।
এর পর ১৯৭২ সালে মিস ম্যাগাজিন প্রতিষ্ঠার আগ পর্যন্ত নিউ ইয়র্ক ম্যাগাজিনে কলামিস্ট হিসেবে লিখতেন।
প্রথম জীবনে বিয়ে এড়িয়ে চললেও, ২০০০ সালে তিনি দক্ষিণ আফ্রিকায় জন্ম নেওয়া উদ্যোক্তা ও পরিবেশবাদী ডেভিড বেলের সঙ্গে বিয়ের বন্ধনে আবদ্ধ হন। ডেভিড বেল ছিলেন অভিনেতা ক্রিশ্চিয়ান বেলের বাবা। তিন বছর পর ব্রেন লিম্ফোমায় তার মৃত্যু হয়।
২০১৩ সালে তাকে যুক্তরাষ্ট্রের সর্বোচ্চ বেসামরিক সম্মাননা প্রেসিডেন্সিয়াল মেডেল অব ফ্রিডম তুলে দেন তৎকালীন মার্কিন প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামা।
তার ফাউন্ডেশন বলেছে, ‘শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত তিনি সমতার জন্য কাজ করে গেছেন।’
তারা লিখেছে, ‘গ্লোরিয়ার সবচেয়ে বড় গুণ ছিল অন্যদের কথা শোনার ক্ষমতা এবং অন্যদের এমন অনুভূতি দেওয়া যে তাদের দেখা ও শোনা হচ্ছে। তার কথা, কাজ ও দৃষ্টান্ত মানুষকে নিজেদের সবচেয়ে সত্যিকারের রূপে প্রকাশ করার সাহস দিয়েছে। গ্লোরিয়া তার স্বাধীনচেতা সত্তার প্রতি সবসময় সত্য ছিলেন।’
ফাউন্ডেশনটি জানিয়েছে, জীবনের শেষ বছরগুলোতে তিনি মানুষের সঙ্গে সময় কাটানো এবং লেখালেখি করে গেছেন। নিজের বাড়িতে অতিথিদের স্বাগত জানিয়ে ‘টকিং সার্কেলস’ আয়োজন করতেন তিনি। এই ঐতিহ্য অব্যাহত থাকবে।
ফাউন্ডেশন বলেছে, সামাজিক ন্যায়বিচারের আন্দোলনের কেন্দ্র হিসেবে তার বাড়িকে গড়ে তোলার প্রতি তার অঙ্গীকার এবং শিগগির প্রকাশিতব্য বই ‘অ্যান আনএক্সপেক্টেড লাইফ’ হলো ‘বিশ্বকে গ্লোরিয়ার দেওয়া অসংখ্য উপহারের’ মধ্যে দুটি। এগুলো ভবিষ্যৎ প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে প্রভাব ছড়িয়ে দেবে—এমন আশাই ছিল তার।
তার মৃত্যুর খবর ছড়িয়ে পড়ার পর বৃহস্পতিবার শ্রদ্ধা ও ভালোবাসা জানাতে শুরু করেন অনেকে। লেখক ও নারীবাদীরা ইনস্টাগ্রামে তার প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেন। তাদের কেউ কেউ বলেছেন, গ্লোরিয়া তাদের জীবন বদলে দিয়েছিলেন।
সূত্র: বিবিসি






