পৃথিবীর দরজায় মহাদুর্যোগ
- ৭০ বছরের রেকর্ড ভাঙছে ‘সুপার এল নিনো’

‘চরম আবহাওয়ার এক বিপজ্জনক অবস্থায়’ প্রবেশ করছে বিশ্বের জলবায়ু। গতকাল বৃহস্পতিবার এক জরুরি সতর্কবার্তায় এমনই পূর্বাভাস দিয়েছে জাতিসংঘের বিশ্ব আবহাওয়া সংস্থা (ডব্লিউএমও)। জেনেভার সদর দপ্তর থেকে দেওয়া এক বিবৃতিতে সংস্থাটি জানিয়েছে, ‘এল নিনোর প্রভাব আরও দৃঢ়ভাবে সক্রিয় হয়েছে বিশ্ব জুড়ে। এটি আগামী মাসগুলোয় আরও শক্তিশালী রূপ ধারণ করবে। এর ফলে বৃষ্টিপাত ও তাপমাত্রার ধরনে বড় ধরনের প্রভাব পড়বে। একই সঙ্গে বন্যা, খরা ও তীব্র দাবদাহের ঝুঁকি তৈরি হবে, যা সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছাবে এ বছরের শেষের দিকে এবং স্থায়ী হবে ২০২৭ সাল পর্যন্ত।’
বলা হয়েছে, গত ৭০ বছরের মধ্যে সবচেয়ে শক্তিশালী হয়ে উঠতে পারে চলমান এল নিনো। ক্রান্তীয় প্রশান্ত মহাসাগর জুড়ে অস্বাভাবিক উষ্ণ সামুদ্রিক পরিস্থিতির কারণে আগামী মাসগুলোয় এল নিনো আরও শক্তিশালী ও তীব্র রূপ ধারণ করতে পারে বলে আশঙ্কা করছেন জলবায়ুবিদরা।
এ প্রসঙ্গে জাতিসংঘের মহাসচিব আন্তোনিও গুতেরেস বলেছেন, ‘এল নিনো আমাদের চোখের সামনেই এক বিশাল রূপ নিচ্ছে। বিজ্ঞান এ বিষয়ে কোনো সন্দেহের অবকাশ রাখেনি— পৃথিবী এখন এক সম্পূর্ণ অজানা পরিস্থিতির মুখোমুখি। সমুদ্রের পানি ক্রমাগত উত্তপ্ত হচ্ছে। সমুদ্রপৃষ্ঠের তাপমাত্রা বাড়ছে, সামগ্রিক তাপমাত্রাও বেড়েই চলেছে। বিশ্ব এখন চরম আবহাওয়ার এক বিপজ্জনক অঞ্চলে অবস্থান করছে। বর্তমান প্রতিযোগিতা ক্রমবর্ধমান ঝুঁকি এবং জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবিলা ও মানুষকে রক্ষা করার জন্য আমাদের প্রতিশ্রুতির মধ্যে। এই প্রতিযোগিতায় আমাদের অবশ্যই জিততে হবে।’ ডব্লিউএমওর মহাসচিব সেলেস্তে সাওলো বলেছেন, ‘এই ব্যতিক্রমী এল নিনো মোকাবিলায় প্রয়োজন ব্যতিক্রমী প্রস্তুতি ও সাড়া। বিশ্ব আবহাওয়া সংস্থার ৫০ বছরের ইতিহাসে আমরা এত বড় প্রস্তুতিমূলক পদক্ষেপ আগে কখনো নিইনি। এল নিনো বিশ্বের অসংখ্য জনপদ ও অর্থনীতিতে বিরাট আঘাত হানতে পারে। তাই ঝুঁকিপূর্ণ মানুষদের রক্ষায় আগাম সতর্কতা জারি, চিকিৎসাসেবা নিশ্চিত করা এবং দুর্যোগ মোকাবিলার প্রস্তুতি বাড়ানো হচ্ছে।’
এল নিনো মূলত প্রশান্ত মহাসাগরে তৈরি হওয়া একটি প্রাকৃতিক আবহাওয়াগত ঘটনা। বায়ুপ্রবাহের পরিবর্তনের ফলে প্রশান্তের উষ্ণ পানি পূর্বদিকে ছড়িয়ে পড়ে এবং বায়ুমণ্ডলে অতিরিক্ত তাপ ছড়িয়ে দেয়। গত কয়েক মাসে মধ্য ও পূর্ব নিরক্ষীয় প্রশান্ত মহাসাগরের সমুদ্রপৃষ্ঠের তাপমাত্রা দ্রুত বেড়েছে এবং স্বাভাবিকের চেয়ে দুই ডিগ্রি সেলসিয়াসেরও বেশি ওপরে। পূর্বাভাস বলছে, নভেম্বর-ডিসেম্বরে মাসের তাপমাত্রা স্বাভাবিকের তুলনায় প্রায় চার ডিগ্রি সেলসিয়াস বেশি হতে পারে। তাহলে ১৯৫০ সালের পর এটিই হবে সবচেয়ে শক্তিশালী এল নিনো। সমুদ্রের ওপরিতলের নিচে কোনো কোনো জায়গায় তাপমাত্রা এরই মধ্যে স্বাভাবিকের চেয়ে আট ডিগ্রি সেলসিয়াসের বেশি। বিবিসির খবরে বলা হয়েছে, দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া, মধ্য আমেরিকা ও উত্তর দক্ষিণ আমেরিকার বিস্তীর্ণ অঞ্চলে আগামী কয়েক মাস স্বাভাবিকের চেয়ে কম বৃষ্টির আশঙ্কা করা হচ্ছে। এ ছাড়া বাড়তে পারে খরা ও দাবানল। ইন্দোনেশিয়ায় এই শুকনো মৌসুমে এরই মধ্যে ১ লাখ ৭ হাজার হেক্টরের বেশি জমিতে আগুন ছড়িয়েছে। পরিস্থিতি সামাল দিতে সেখানে বৃষ্টির জন্য মেঘবীজ ছড়ানোর বিমান নামানো হয়েছে এবং জমি পরিষ্কারের জন্য আগুন লাগানোর অভিযোগে বহু মানুষকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে।
খরার আঁচ পড়ছে বিশ্ববাণিজ্যেও। কম বৃষ্টির আশঙ্কায় পানামা খালে জাহাজ চলাচল ১০ শতাংশের বেশি কমানোর সিদ্ধান্ত হয়েছে। বছরে প্রায় ১৪ হাজার জাহাজ চলাচল করা এই জলপথ পানামার অর্থনীতিরও গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তি। প্রতি বছর প্রায় ৩ বিলিয়ন ডলার আয় হয় এখান থেকে। অন্যদিকে, চীন এ বছর সাতটি টাইফুনের স্থলভাগে আঘাত হানার আশঙ্কা করছে। পূর্ব আফ্রিকা, দক্ষিণ ব্রাজিল ও দক্ষিণ আমেরিকার কিছু অঞ্চলে আবার অতিবৃষ্টির কারণে বাড়তে পারে বন্যা। পেরু, ইকুয়েডর ও ব্রাজিলের কিছু এলাকায় অতীতে এল নিনোর প্রভাবে আকস্মিক বন্যা ও ভূমিধস হয়েছে। অস্ট্রেলিয়ার বিজ্ঞান সংস্থার প্রধান গবেষক অ্যালিস্টার হবডে বিবিসিকে বললেন, দক্ষিণ অস্ট্রেলিয়ার পরিস্থিতি নিয়ে তিনি বেশ উদ্বিগ্ন।





