পাঁচ মাসে ৮ বার পিছু হটলেন ট্রাম্প
- ইরানে ‘ভয়ংকর হামলা’ হুমকির পরই নরম সুর যুক্তরাষ্ট্রের

যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প।
ইরান-যুক্তরাষ্ট্রের যুদ্ধে শোচনীয় অবস্থায় পড়েছেন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। সকালে ‘ভয়ংকর হামলা’র ধমক দিয়ে বিকালে আবার নরম সুর। গত শুক্রবারই বলেছেন, ইরানে বড় হামলার প্রস্তুতি নিচ্ছে যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েল। পরদিন শনিবারই আবার ইউটার্ন! বললেন, ‘দ্রুত চুক্তির আশায় ইরানে হামলা স্থগিত।’ আবারও সেই আগের পুনরাবৃত্তি! বরাবরের মতো সেই ‘পিছু হটা’। ইরান ধ্বংসের হুমকিতে রাত পার হলেই ট্রাম্পের এ ভিন্ন সুর একাধিকবার শুনেছে বিশ্ব। যুদ্ধ শুরুর পর থেকে অন্তত আটবার! প্রায় প্রতিবারই ইরানে ‘আগের থেকেও ভয়ংকর হামলা চালানো হবে’ বলার পরেই তার ভাষ্য, এখন আর হামলা হবে না। শান্তিচুক্তি আলোচনায় অগ্রগতি হয়েছে।’ আলজাজিরা, রয়টার্স।
বিশ্ব বাজারে শুল্ক নিয়েও এর আগে বহুবার হুমকি-ধমকি দিয়ে পিছু হটেছেন বিশ্ব শক্তির এ বড় নেতা। ইরানের সঙ্গে বারবার এমন সুর নরম করাই বিশেষ একটি ডাকনামও পেয়েছেন তিনি। সেটি হলো ‘টিএসিও— টাকো। ট্রাম্প অলওয়েজ চিকেন্স আউট।’ অর্থাৎ ‘ট্রাম্প সবসময় শেষ মুহূর্তে পিছু হটেন।’ চলতি বছরের ২৮ ফেব্রুয়ারি ইরানে যৌথ হামলা চালায় যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েল। পাল্টা হামলায় আরও ভয়াবহ রূপ দেখায় ইরান। মধ্যপ্রাচ্যে মার্কিন ঘাঁটি নিশানা করে সেখানে চালায় হামলা। উত্তপ্ত হয়ে ওঠে উপসাগরীয় দেশগুলো। নিজেদের অবস্থানে কোনো ধরনের পরিবর্তন আনেনি ইরান। তবে ট্রাম্প প্রায় উচ্চ সুরে বড় হামলার হুমকি লেজ গুটিয়ে নিয়েছেন বহুবার। ডেভিড ক্যাম্পের বৈঠকে শুক্রবার ইরানে হামলার সিদ্ধান্ত নেন ট্রাম্প। দেশটিতে এক-দুদিনের মধ্যেই কঠোর হামলার পরিকল্পনা করে যুক্তরাষ্ট্র। তবে রাত পোহাতেই শনিবার ট্রাম্প ঘোষণা দেন তারা ইরানে হামলা চালাবেন না। নিজের ট্রুথ সোশ্যালে জানিয়েছেন, মধ্যপ্রাচ্যের অন্যান্য দেশ এমন একটি চুক্তি সম্পন্ন করার জন্য সময় চেয়েছে, যার ফলে গুরুত্বপূর্ণ হরমুজ প্রণালিটি ‘অবিলম্বে ও সম্পূর্ণভাবে’ খুলে দেওয়া হবে এবং ‘ইরানের পারমাণবিক হুমকির অবসান’ ঘটবে।
ট্রাম্পের ইউটার্ন: মার্চ ২১— এদিন ইরান হরমুজ প্রণালি ‘পুরোপুরি খুলে’ না দিলে, দেশটির বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলো ‘গুঁড়িয়ে দেওয়ার’ হুমকি দেন ট্রাম্প। পরে তিনি সময়সীমা প্রথমে পাঁচ দিন এবং এরপর আরও এক সপ্তাহ বাড়ান।
মার্চ ২৬— ইরানের সঙ্গে আলোচনা ‘খুব ভালোভাবে’ এগিয়ে চলেছে, এমনটা বলে ট্রাম্প ইরানের বিদ্যুৎ অবকাঠামোয় হামলার সময়সীমা আরও ১১ দিন পিছিয়ে দেন।
এপ্রিল ১— হরমুজ প্রণালির অবরোধ তুলে নেওয়া থেকে ইরান অস্বীকৃতি জানালে ট্রাম্প হুমকি দেন, ইরানে বোমা হামলায় যুক্তরাষ্ট্র দেশটিকে ‘প্রস্তর যুগে’ পাঠিয়ে দেবে। তবে এরপর তাৎক্ষণিকভাবে কোনো সংঘাত বা উত্তেজনা বাড়েনি। চার দিন পর, প্রণালিটি অবরুদ্ধ করার জন্য ইরানকে তীব্র সমালোচনা করে গালাগালপূর্ণ একটি বিবৃতি প্রকাশ করেন ট্রাম্প। এপ্রিল ৭— এদিন ‘আজ রাতে একটি পুরো সভ্যতা ধ্বংস হয়ে যাবে’— বলে হুমকি দেন তিনি। এটি বিশ্ব জুড়ে তীব্র ক্ষোভের সৃষ্টি করে। মানবাধিকার সংগঠনগুলো সতর্ক করে, এ হুঁশিয়ারির মাধ্যমে বেসামরিক নাগরিকদের নির্বিচারে হত্যার অভিপ্রায় প্রকাশ পেয়েছে।
৮ এপ্রিল— পাকিস্তান ইরান-যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষের মধ্যে একটি ভঙ্গুর যুদ্ধবিরতি কার্যকর করতে সক্ষম হয়।
মে ৪— ইরানের হরমুজ অবরোধের মুখে সেখানে আটকা পড়া জাহাজগুলোকে নিরাপত্তা দিয়ে নিয়ে যাওয়ার জন্য ট্রাম্প ‘অপারেশন প্রজেক্ট ফ্রিডম’ ঘোষণা করেন। এর দুদিন পর তিনি ‘ট্রুথ সোশ্যাল’-এ লেখেন, কোনো সমঝোতা হয় কি না, তা দেখার জন্য এ অভিযানটি ‘স্থগিত’ রাখা হয়েছে।
জুন ১১— ইরানকে ‘খুব কঠোরভাবে’ আঘাত করার হুমকি দেন ট্রাম্প। তার এই ধমকিতে ইরানের গুরুত্বপূর্ণ খার্গ দ্বীপ দখল এবং দেশটির তেল স্থাপনাগুলোর ওপর ‘পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ’ নেওয়া অন্তর্ভুক্ত ছিল। হুমকি দেওয়ার কয়েক ঘণ্টা পরই ট্রাম্প তার অবস্থান সম্পূর্ণ বদলে ফেলেন। কারণ হিসেবে তিনি ইরানের শীর্ষ নেতাদের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের আলোচনার কথা উল্লেখ করেন। জুলাই ২৪— এদিন পেন্টাগন হঠাৎ করেই ইরানে দুই সপ্তাহব্যাপী বোমা হামলার অভিযান স্থগিত করে। এরপর সপ্তাহান্তে আর কোনো হামলা চালানো হয়নি। সেদিন এক সংবাদ সম্মেলনে ট্রাম্প বলেছেন, ‘ইরান আলোচনায় দিন দিন আরও বেশি গুরুত্ব দিচ্ছে, সম্ভবত এর কারণটি সবারই জানা।’
সৌদির যুবরাজের সঙ্গে ট্রাম্পের ফোনালাপ: ট্রাম্পের হুমকির পরপরই শনিবার তাকে ফোন করেন সৌদি আরবের যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সালমান। সে সময় আঞ্চলিক পরিস্থিতি এবং এর সুদূরপ্রসারী আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক প্রভাব নিয়ে আলোচনা করেছেন দুই নেতা। অ্যাক্সিওস সর্বপ্রথম এ খবর প্রকাশ করে। ইরানের ওপর বড় ধরনের হামলা চালানো থেকে ট্রাম্পকে নির্বৃত্ত করতে এবং এর পরিবর্তে পরিস্থিতি শান্ত করার লক্ষ্যে তার সঙ্গে যোগাযোগ করেছিলেন সালমান।




