এআই নির্মিত বন্যপ্রাণীর ছবির কারণে হুমকিতে গবেষণা

সংগৃহীত ছবি
বন্যপ্রাণীর একটি নান্দনিক ছবি শুধু প্রকৃতি প্রেমীদের মুগ্ধই করে না, অনেক সময় হয়ে ওঠে গুরুত্বপূর্ণ বৈজ্ঞানিক তথ্যের উৎসও। পাখিসহ বিভিন্ন প্রজাতির বিচরণক্ষেত্র কিংবা জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে তাদের আচরণ বদলাচ্ছে কি না—এসব গবেষণার ভিত্তি হয়ে ওঠে সাধারণ মানুষের তোলা ছবি। তবে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) দিয়ে বানানো মনোহরী ছবি বিভ্রান্ত করছে বণ্যপ্রানী গবেষকদের।
সম্প্রতি বিজ্ঞানবিষয়ক সাময়িকী নেচার-এ প্রকাশিত এক গবেষণায় বলা হয়েছে, এআই দিয়ে পরিবর্তিত বা তৈরি ছবি ‘আইন্যাচারালিস্ট’ ও ‘ম্যাকোলে লাইব্রেরি’র মতো জনপ্রিয় ‘সিটিজেন সায়েন্স’ বা বিজ্ঞান প্ল্যাটফর্মগুলোর নির্ভরযোগ্যতা ফেলতে পারে হুমকিতে। কারণ, এসব প্ল্যাটফর্মের তথ্য ব্যবহার করে বিভিন্ন প্রজাতির অবস্থান, বিস্তার ও আচরণ নিয়ে গবেষণা করেন বিজ্ঞানীরা।
গবেষকদের মতে, পাখি বা অন্য কোনো বন্যপ্রাণীর ছবি এখন আর শুধু স্মৃতির অংশ নয়। একটি নির্ভুল ছবি থেকেই জানা যায় কোনো প্রাণী নতুন এলাকায় এসেছে কি না, কোনো প্রজাতির বিস্তার বদলাচ্ছে কি না কিংবা জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে তাদের আচরণে পরিবর্তন হচ্ছে কি না। তাই ছবিতে সামান্য পরিবর্তনও জন্ম দিতে পারে ভুল বৈজ্ঞানিক তথ্যের।
যুক্তরাজ্যে সম্প্রতি উত্তর ওয়েলসের একটি উপকূলীয় শহরে দেখা মিলেছে ওয়েস্টার্ন রিফ হেরন বা পশ্চিমা চিলন বকের, যা সাধারণত বাস করে আফ্রিকা ও দক্ষিণ ইউরোপে। ঘটনাটি বিভিন্ন পাখিপ্রেমীদের ফোরামে বিপুল সাড়া ফেলেছিল বলে জানা যায় ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম গার্ডিয়ানের একটি প্রতিবেদনে। তবে এ ধরনের বিরল প্রজাতির ছবি যদি এআই দিয়ে পরিবর্তন করা হয়, তাহলে সেটি ভুল তথ্য হিসেবে যুক্ত হতে পারে গবেষণার ডেটাবেইসে।
বর্তমানে চ্যাটজিপিটি, গুগল জেমিনাইসহ বিভিন্ন জেনারেটিভ এআই প্রযুক্তির মাধ্যমে কয়েক সেকেন্ডেই পরিবর্তন করা যায় ছবি। অনেকেই ছবিকে আরও আকর্ষণীয় করতে সরিয়ে দিচ্ছেন পাখির সামনে থাকা ডালপালা; পরিবর্তন করছেন রঙ ও আকৃতি। আবার কখনও অজান্তেই বড় ধরনের পরিবর্তন এনে ফেলছে ছবির মূল বৈশিষ্ট্যে।
নেচার-এ প্রকাশিত গবেষণাপত্রের প্রধান লেখক এবং ম্যানচেস্টার মেট্রোপলিটন ইউনিভার্সিটির বাস্তুসংস্থানবিদ ড. আলেকজান্ডার লিস বলছিলেন, এখন ফেসবুকে বন্যপ্রাণীর বিপুল সংখ্যক ছবি সম্পূর্ণ এআই দিয়ে তৈরি। ফলে এসব ছবি ব্যবহার করে কোনো প্রজাতি কোথায় এবং কখন দেখা গেছে, তা নির্ভরযোগ্যভাবে নির্ধারণ করা ক্রমেই কঠিন হয়ে পড়ছে।
তার মতে, পুরোপুরি ভুয়া ছবি তুলনামূলকভাবে কম এবং সহজেই ধরা পড়ে—যেমন সাইবেরিয়ায় টুকান পাখি দেখার দাবি কেউ বিশ্বাস করবে না। তবে বড় সমস্যা হচ্ছে, অনেক আলোকচিত্রী ছবি ‘আরও সুন্দর’ করতে এআই ব্যবহার করছেন। এতে এআই অ্যালগরিদম কখনো কখনো যোগ করে ফেলছে অন্য প্রজাতির পাখির বৈশিষ্ট্য।
এর উদাহরণ হিসেবে গবেষণায় উল্লেখ করা হয়েছে ব্রাজিলের একটি ঘটনার কথা। সেখানে একজন আলোকচিত্রী স্থানীয় একটি সাধারণ পাখির ছবি এআই দিয়ে এডিট করায় সেটি উত্তর আমেরিকার রেড-উইংড ব্ল্যাকবার্ড হিসেবে শনাক্ত হয়। ফলে ওই অঞ্চলে কখনো না দেখা যাওয়া একটি পাখির ভুয়া উপস্থিতির রেকর্ড তৈরি হয়।
আলেকজান্ডার লিসের ভাষ্য, ‘বন্যপ্রাণীর আলোকচিত্রীরা প্রায়ই নিখুঁত ছবি তুলতে চান। কিন্তু এআই দিয়ে সম্পাদিত সেই ছবিই ভবিষ্যতে বৈজ্ঞানিক গবেষণায় বিভ্রান্তির কারণ হতে পারে।’
প্রকৃতিপ্রেমীদের জনপ্রিয় প্ল্যাটফর্ম আইন্যাচারালিস্ট, যেখানে সংরক্ষণ করা হয় উদ্ভিদ ও প্রাণীর বিচরণের তথ্য, সেখানে বর্তমানে রয়েছে ৬১ কোটির বেশি ছবি। তবে এসব ছবির মধ্যে প্রায় ১ হাজার ৪০০টি ছবি চিহ্নিত করা হয়েছে এআইভিত্তিক।
গবেষকদের মতে, সাধারণ মানুষের তোলা এসব ছবি থেকেই পাওয়া গেছে জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে প্রাণীর বিস্তার, নতুন এলাকায় স্থানান্তর, ফুল ফোটার সময়ের পরিবর্তনসহ বহু গুরুত্বপূর্ণ বৈজ্ঞানিক তথ্য। তাই এসব তথ্যের নির্ভুলতা নিশ্চিত করা এখন আগের যেকোনো সময়ের চেয়ে বেশি জরুরি। গবেষণার সহ-লেখক এবং আইন্যাচারালিস্টের কমিউনিটি সাপোর্ট ডিরেক্টর টনি ইওয়ানের মতে, বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই খারাপ উদ্দেশ্য থাকে না ব্যবহারকারীদের।
তবে তাদের সতর্ক থাকার আহ্বান জানিয়েছেন তিনি। তার ভাষ্য, ‘সাধারণ মানুষের দেওয়া তথ্যের মাধ্যমেই আমরা প্রায় রিয়েল-টাইমে জানতে পারি পৃথিবীর কোথায় কী পরিবর্তন ঘটছে। জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে কোনো প্রজাতি নতুন এলাকায় যাচ্ছে কি না বা কোনো গাছে আগেভাগে ফুল ফুটছে কি না—এসব তথ্য পরিবেশ সংরক্ষণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। তবে সেই তথ্য অবশ্যই সঠিক হতে হবে।’




