বোমা-নিষেধাজ্ঞাতেও নত নয় ইরান, যুদ্ধে পথ ফুরোচ্ছে ট্রাম্পের
- সাত মাসেও মেলেনি নিষ্পত্তি, বিশ্লেষকের চোখে শেষ ভরসা কূটনীতিই

ছবি: রয়টার্স
কয়েক সপ্তাহের অভিযান বলেই শুরু হয়েছিল। ডোনাল্ড ট্রাম্প নিজেই একে বলেছিলেন, 'ছোট্ট এক অভিযান।' কিন্তু সেই যুদ্ধ এখন সপ্তম মাসে। বোমা পড়েছে, বন্দর অবরুদ্ধ হয়েছে, নতুন নিষেধাজ্ঞায় ইরানকে অর্থনৈতিকভাবে শ্বাসরুদ্ধ করার চলছে চেষ্টা। তবু নত হয়নি তেহরান। উল্টো হরমুজ প্রণালীকে হাতে রেখে চাপ বাড়িয়েছে ওয়াশিংটনের ওপর। ফলে ইরানের সঙ্গে এমন এক যুদ্ধে আমেরিকা জড়িয়ে পড়েছে, যা ট্রাম্পের পক্ষে সহজে জেতাও কঠিন, ছেড়ে বেরিয়ে আসাও কঠিন।
মঙ্গলবার (১ সেপ্টেম্বর) অস্ট্রেলিয়াভিত্তিক সংবাদমাধ্যম দ্য কনভারসেশনে প্রকাশিত বিশ্লেষণে এমনই মূল্যায়ন করেছেন মধ্যপ্রাচ্যবিষয়ক বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক আমিন সাইকাল। তার মতে, ফেব্রুয়ারির শেষ দিকে যুদ্ধ শুরুর সময় ট্রাম্প প্রশাসন ইরানের প্রতিরোধক্ষমতা এবং বাইরের হামলার মুখে দেশটির সমাজ কতটা এককাট্টা হতে পারে–দু’টিই খাটো করে দেখেছিল।
ট্রাম্প বারবার সামরিক বিজয়ের দাবি করলেও ইরান প্রত্যাশার চেয়ে দ্রুত আক্রমণক্ষমতা পুনর্গঠন করেছে বলে লিখেছেন সাইকাল। মে মাস নাগাদ তেহরান যুদ্ধবিরতি, জব্দ করা অর্থ ছাড়, যুদ্ধের ক্ষতিপূরণ, হরমুজ প্রণালী পরিচালনার অধিকার এবং ভবিষ্যতে মার্কিন-ইসরায়েলি হামলা বন্ধের নিশ্চয়তা–এমন কয়েকটি শর্ত সামনে আনে। জুনে দুই পক্ষের মধ্যে একটি অস্পষ্ট সমঝোতা স্মারকও হয়। কিন্তু রিপাবলিকান মহল ও ইসরায়েলের চাপ বাড়ার পর ট্রাম্প সেখান থেকে সরে গিয়ে ফের হামলার পথে হাঁটেন, এমনটাই ওই বিশ্লেষণের বক্তব্য।
তার পর থেকে ইরানি তেল রপতানি ঠেকাতে বন্দর ও নৌপথে চাপ বাড়িয়েছে ওয়াশিংটন। গত ২৪ আগস্ট মার্কিন অর্থ মন্ত্রণালয় শুরু করেছে ‘অপারেশন ইকোনমিক আউটকাস্ট’। অর্থমন্ত্রী স্কট বেসেন্ট এর নাম দিয়েছেন 'ইকোনমিক ডি-ডে।' লক্ষ্য, ইরানের তেল, ব্যাংকিং ও আন্তর্জাতিক আর্থিক সংযোগ একে একে বিচ্ছিন্ন করা। প্রথম দফায় ৬০টিরও বেশি ব্যক্তি, প্রতিষ্ঠান ও জাহাজকে নিশানা করা হয়।
কিন্তু এখানেও প্রশ্ন ফল নিয়ে। সাইকালের বিশ্লেষণ বলছে, চীন ও রাশিয়া এই চাপ মানতে রাজি নয়; নিষেধাজ্ঞা কার্যকর করার প্রতিশ্রুতি দেয়নি পাকিস্তান, ইরাক কিংবা তুরস্কও। দীর্ঘ ৪৭ বছর ধরে মার্কিন নিষেধাজ্ঞার সঙ্গে মানিয়ে বেঁচে থাকার অভিজ্ঞতা আছে ইরানি ব্যবস্থার। মূল্য সবচেয়ে বেশি দিয়েছে সাধারণ মানুষ, কিন্তু সরকার টিকে গেছে। নতুন নিষেধাজ্ঞাতেও একই ছবি দেখা যেতে পারে।
বাস্তবতাও সেই অচলাবস্থাই দেখাচ্ছে। শনিবার (৫ সেপ্টেম্বর) রয়টার্সের খবরে বলা হয়েছে, মার্কিন ও ইরানি বাহিনী ফের হরমুজের আশপাশে পাল্টাপাল্টি হামলা চালিয়েছে। অর্থাৎ নিষেধাজ্ঞা ও সামরিক চাপ কোনওটিই এখনও যুদ্ধের শেষ টানতে পারেনি।
সাইকালের মতে, পথ তাই আবার আলোচনার টেবিলেই। পাকিস্তান ও কাতার এখনও মধ্যস্থতায় যুক্ত। উপসাগরীয় দেশগুলোও দীর্ঘ যুদ্ধ চায় না; তারা ইরানকে অঞ্চলের স্থায়ী শক্তি হিসেবেই মেনে নিয়ে নিরাপত্তার জন্য শুধু আমেরিকার ওপর নির্ভরতা কমাচ্ছে।
যুদ্ধ যত দীর্ঘ হচ্ছে, ট্রাম্পের সামনে বিকল্প ততই সংকীর্ণ। বোমা ইরানকে ভাঙতে পারেনি, নিষেধাজ্ঞাও এখনও নত করতে পারেনি। শেষ পর্যন্ত যে দরজাটি খোলা থাকছে, তার নাম কূটনীতি।





