মাথা গোঁজার ঠাঁই নেই, খোলা আকাশের নিচে হাজারও মানুষ
- কেউ রাত কাটাচ্ছেন পার্কে, কেউ গাড়ির ভেতরে, কেউ আবার গাছতলায়
- ভূমিকম্পের ধাক্কা একদিন থেমে যাব, কিন্তু হারিয়ে যাওয়া ঘর কি এত সহজে ফিরে পাওয়া যাবে?

ভেনেজুয়েলার লা গুয়ারিয়ায় ভূমিকম্পে ধসে পড়া একটি ভবনের ধ্বংসস্তূপে বসে আছেন এক ব্যক্তি- ছবি: রয়টার্স
এক মুহূর্তে বদলে গেছে জীবন। যে ঘরে এতদিন হাসি-কান্না, স্বপ্ন আর সংসারের গল্প জমা ছিল, সেই ঘর এখন ভাঙা কংক্রিটের স্তূপ। মাথার ওপর আর ছাদ নেই, সামনে অনিশ্চিত ভবিষ্যৎ। ভেনেজুয়েলায় পরপর দুটি ভয়াবহ ভূমিকম্পের পর এমনই কঠিন এক বাস্তবতার মুখোমুখি হয়েছেন হাজারো মানুষ।
রাজধানী কারাকাসের কুইন্তেরো পরিবারের গল্প যেন সেই বিপর্যস্ত দেশেরই প্রতিচ্ছবি। ভূমিকম্পে দুমড়ে-মুচড়ে গেছে তাদের মাথা গোঁজার ঠাঁই। বাধ্য হয়ে বেরিয়ে আসতে হয়েছে বাড়ি ছেড়ে। রাস্তার পাশের ছোট, জীর্ণ গাড়িই তাদের অস্থায়ী আশ্রয়। পরিবারের শিশুদের জন্য গাড়ির সিটগুলো বরাদ্দ। আর গাড়ির ডিকিতে ঠাঁই হয়েছে পরিবারের পোষা টিয়া পাখি ও কয়েকটি কচ্ছপের।
পেশায় সংগীতশিল্পী ফ্রান্সিসকো কুইন্তেরো জানালেন, ভুমিকম্পের পর থেকেই প্রতি রাতে তিনি ও পরিবারের অন্য প্রাপ্তবয়স্ক সদস্যরা গাড়ির আশপাশে কোথাও ঘুমানোর জায়গা খোঁজেন। যত দিন না সরকার তাদের ভবিষ্যৎ নিয়ে কোনো সিদ্ধান্ত জানাচ্ছে, ততদিন এভাবেই কাটাতে হবে।
গত বুধবার সন্ধ্যায় মাত্র ৩৯ সেকেন্ডের ব্যবধানে আঘাত হানে ৭.২ ও ৭.৫ মাত্রার দুটি শক্তিশালী ভূমিকম্প। কারাকাসসহ বিস্তীর্ণ এলাকায় অসংখ্য বহুতল ও বাড়িঘর ধসে পড়ে মারাত্মক ক্ষতিগ্রস্ত হয়। উদ্ধারকাজ এখনো চলছে। মৃতের সংখ্যা এর মধ্যেই হাজার ছাড়িয়েছে বলে বিভিন্ন সূত্রে জানা গেছে এবং সে সংখ্যা আরও বাড়ার আশঙ্কা রয়েছে।
হঠাৎ করেই গৃহহীন হয়ে পড়া হাজার হাজার মানুষ এখন পার্ক, খোলা মাঠ, এমনকি মহাসড়কের পাশে রাত কাটাচ্ছেন। তবে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে রাজধানীর উত্তরে অবস্থিত গুইরা প্রদেশ। সেখানে একটি বেসবল মাঠে চাদর পেতে নিজেদের জায়গা দখল করে বসেছে বহু পরিবার। কাপড় ও প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র ভরা প্লাস্টিকের ব্যাগই এখন তাদের সম্বল।
কেউ আবার গাছের নিচে আশ্রয় নিয়েছেন। কারাকাসের বিভিন্ন এলাকায়ও একই ছবি। চার সন্তানের মা দেজিরে গিল এখন পরিবারের সদস্যদের নিয়ে একটি ছোট ঘাসে ঢাকা চত্বরে বসবাস করছেন। তার বাড়ি পুরোপুরি ভেঙে না পড়লেও বিভিন্ন অংশে ফাটল ধরেছে। তাই আর ফিরে যেতে সাহস পাচ্ছেন না। কারণ যেকোনো সময় পুরো ভবনটি ধসে পড়তে পারে।
ফলে অনেকের মতো তিনিও অপেক্ষা করছেন সরকারি পরিদর্শকদের জন্য। তারা এসে ভবনগুলো পরীক্ষা করে জানাবেন, সেগুলো এখনো বাসযোগ্য কি না। কিন্তু কবে সে কাজ শুরু হবে, তা স্পষ্ট নয়। কারণ এ মুহূর্তে নিখোঁজ মানুষদের খোঁজ এবং উদ্ধারকাজই সরকারের প্রধান অগ্রাধিকার।
এদিকে দেশটির শিক্ষা মন্ত্রক জানিয়েছে, কিছু স্কুলকে অস্থায়ী আশ্রয়কেন্দ্র হিসেবে ব্যবহার করা হবে। তবে কতগুলো স্কুল এ কাজে ব্যবহার করা হবে, সে বিষয়ে বিস্তারিত জানানো হয়নি।
অন্যদিকে বিশেষজ্ঞদের মতে, এ বিপর্যয়ের পেছনে পুরনো নির্মাণব্যবস্থাও একটা বড় কারণ। এরই মধ্যে অসংখ্য পরিবার খোলা আকাশের নিচে নতুন দিনের অপেক্ষা করছে। কেউ সরকারি দপ্তরের সামনে, কেউ রাস্তার পাশে, কেউ আবার মাঠের কোণে রাত কাটাচ্ছেন। এক হাতে গদি, অন্য হাতে বালিশ নিয়ে ছোট্ট সন্তানকে মাঝখানে রেখে অজানা গন্তব্যে হাঁটতে থাকা পরিবারগুলোর ছবি যেন একটাই প্রশ্ন ছুড়ে দিচ্ছে— ভূমিকম্পের ধাক্কা একদিন থেমে যাবে; কিন্তু হারিয়ে যাওয়া ঘর কি এত সহজে ফিরে পাওয়া যাবে?
অনুবাদ : রুবাইয়া জেসমিন ,কলকাতা প্রতিনিধি






