মিয়ানমারে আশঙ্কাজনকভাবে বাড়ছে নারী পাচার, মাদক উৎপাদন

১৭ সেপ্টর মিয়ানমারের সেন্ট্রাল কমিটির বৈঠকে মাদক ও অন্যান্য অপরাধমূলক কর্মকাণ্ড নিয়ে আলোচনা করা হয়। ছবি: এমআইটিভি
গৃহযুদ্ধ ও অর্থনৈতিক ধসে মিয়ানমারে বাড়ছে দারিদ্র্য। আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি ধারণ করেছে চরম আকার। এমন পরিস্থিতিতে দেশটিতে নারী পাচার, অনিয়ন্ত্রিত মেথঅ্যাম্ফিটামিন (মেথ) উৎপাদন এবং আন্তঃদেশীয় সাইবার অপরাধ বেড়েছে আশঙ্কাজনকভাবে। একই সঙ্গে চলমান সংকট মোকাবিলা ও নিজেদের অর্থনৈতিক স্বার্থরক্ষায় জান্তার ওপর দ্বিপক্ষীয় চাপ বাড়িয়েছে চীন ও যুক্তরাষ্ট্র।
মিয়ানমার কর্তৃপক্ষের তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের শুরু থেকে এ পর্যন্ত অন্তত ৮৩টি পাচার মামলা উদঘাটন করা হয়েছে। মামলাগুলোতে অভিযুক্ত হয়েছে ২৩৫ জন। উদ্ধার হয়েছে ১৪৩ ভুক্তভোগী। ঘটনাগুলোর দুই-তৃতীয়াংশই ছিল চীনা পুরুষদের সঙ্গে মিয়ানমারের তরুণীদের জোর করে বিয়ে দেওয়া। এ ছাড়া জোরপূর্বক শ্রম, পতিতাবৃত্তি, যৌন শোষণ, এমনকি শরীরের অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ কেটে নেওয়ার ঘটনাও রয়েছে।
২০২১ সালের সামরিক অভ্যুত্থানের আগে এসব পাচার কেবল কাচিন বা উত্তর শান রাজ্যের সংঘাতপূর্ণ এলাকাগুলোতে সীমাবদ্ধ থাকলেও, বর্তমান অর্থনৈতিক ধস ও সামাজিকমাধ্যমের প্রভাবে তা মিয়ানমার জুড়ে ছড়িয়ে পড়েছে।
দেশটিতে জান্তার শাসনের ফলে দারিদ্র্য যত গভীর হচ্ছে, পাচারের ঘটনাও তত আশঙ্কাজনকভাবে বাড়ছে। সরকারের নিজস্ব হিসাব অনুযায়ী, গত বছর তারা সারা দেশে ১৩৯টি পাচার মামলা তদন্ত করে ৪০২ জনকে অভিযুক্ত করেছিল। তার আগের বছর মামলা হয়েছিল মাত্র ৫৩টি। এর মধ্যে ৩৫টি ছিল জোরপূর্বক বিয়ের ঘটনা। আর ৩৪টি ঘটনাই চীনের সঙ্গে জড়িত। তবে প্রকৃত সংখ্যা এর চেয়ে অনেক বেশি হতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
মিয়ানমারের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী নিউন্ট উইন সুই জানান, পাচারকারীরা এখন ভুয়া চাকরির বিজ্ঞাপন এবং সামাজিকমাধ্যমে দ্রুত ধনী হওয়ার লোভ দেখিয়ে তরুণ-তরুণীদের ফাঁদে ফেলছে। জানুয়ারি থেকে জান্তাশাসিত গণমাধ্যমে একাধিক ঘটনার খবর প্রকাশিত হয়েছে, যেখানে নিম্নবিত্ত পরিবারের নারীদের চীনা পুরুষদের সঙ্গে বিয়ে কিংবা সারোগেসিরমাধ্যমে সন্তান জন্মদানে বাধ্য করা হয়েছে।
২০২১ সালের সামরিক অভ্যুত্থানের আগে অধিকাংশই ভুক্তভোগীরা ছিল কাচিন ও উত্তর শানের সংঘাতপূর্ণ এলাকার বাসিন্দা। রেস্তোরাঁ বা কারখানায় চাকরির লোভ দেখিয়ে তাদের আনা হতো। তবে অভ্যুত্থানের পর অর্থনৈতিক ধস, গণবাস্তুচ্যুতি এবং আইনশৃঙ্খলার অবনতির কারণে পাচারের ব্যাপ্তি দেশ জুড়ে ছড়িয়ে পড়েছে। আর সামাজিকমাধ্যমের কারণে এই প্রক্রিয়া আরও সহজ হয়ে গেছে।
চীনের ন্যাশনাল নারকোটিকস কন্ট্রোল কমিশন গত সপ্তাহে সতর্ক করে বলেছে, মিয়ানমার, থাইল্যান্ড ও লাওসের সংযোগস্থল গোল্ডেন ট্রায়াঙ্গেল এখনো বিশ্বের সবচেয়ে বড় মেথ উৎপাদনের কেন্দ্র, যার সিংহভাগই তৈরি হয় মিয়ানমারের শান রাজ্যে। লিয়েনইউনগাঙে অনুষ্ঠিত ‘গ্লোবাল পাবলিক সিকিউরিটি কো-অপারেশন ফোরামে’ এই তথ্য তুলে ধরা হয়।
চীনা কর্মকর্তারা জানান, ২০২৪ সালে বিশ্ব জুড়ে জব্দ করা মেথের প্রায় অর্ধেকই উদ্ধার হয়েছিল পূর্ব ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া থেকে। পরের বছর তা ৪৮ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়ে রেকর্ড ৩৪৯ টনে পৌঁছায়। জাতিসংঘের ড্রাগস অ্যান্ড ক্রাইমবিষয়ক দপ্তরও (ইউএনওডিসি) অনুরূপ সতর্কবার্তা দিয়ে জানিয়েছিল, ২০২১ সালের অভ্যুত্থানের পর থেকে শান রাজ্যে মেথ উৎপাদন জ্যামিতিক হারে বেড়েছে।
কমিশন জানায়, প্রিকারসর রাসায়নিক (মাদক তৈরির মূল উপাদান) চোরাচালানের প্রধান কেন্দ্রে পরিণত হয়েছে উত্তর মিয়ানমার। প্রতিবছর এই অঞ্চলে ১ লাখ টনের বেশি প্রিকারসর রাসায়নিক প্রবেশ করে। এ দিয়ে ১২০০ টন মেথ উৎপাদন করা সম্ভব।
বেইজিং দাবি করেছে, গত জানুয়ারিতে উত্তর শানে চালানো এক অভিযানে তাদের দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতেই মিয়ানমার কর্তৃপক্ষ ১৩টি মাদকের ল্যাব ধ্বংস করতে এবং ২.৪৭ টন মেথসহ ১৪০০ টনের বেশি প্রিকারসর রাসায়নিক জব্দ করেছে। এটি ছিল দেশটির ইতিহাসে সবচেয়ে বড় মাদকের চালান জব্দ।
অন্যদিকে, চলতি সপ্তাহে ওয়াশিংটন মিয়ানমার জান্তার বিরুদ্ধে আন্তর্জাতিক মাদক নিয়ন্ত্রণসংক্রান্ত বাধ্যবাধকতা পূরণে চরম ব্যর্থতার অভিযোগ এনেছে। যুক্তরাষ্ট্র বলেছে, মিয়ানমারের মাদক অর্থনীতি নিয়ন্ত্রণে জান্তা কোনো কার্যকর পদক্ষেপ নেয়নি, যার ফলে দেশটি বিশ্বের বৃহত্তম আফিম এবং অন্যতম শীর্ষ মেথ সরবরাহকারীতে পরিণত হয়েছে। তবে এই তালিকায় প্রতিবেশী চীন, ভারত ও লাওসকেও প্রধান মাদক উৎপাদন ও ট্রানজিট কেন্দ্র হিসেবে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে।
গত জুলাইয়ে প্রকাশিত ইউএনওডিসির এক প্রতিবেদনেও বলা হয়, ল্যানচাং-মেকং অঞ্চলের সিন্ডিকেটগুলো এখন মাদকের পাশাপাশি সাইবার প্রতারণা, মানবপাচার এবং অবৈধ হুন্ডি বা আন্ডারগ্রাউন্ড ব্যাংকিং একসঙ্গে পরিচালনা করছে। তাদের এই সমন্বয় আন্তঃদেশীয় নেটওয়ার্ক আরও জটিল করে তুলেছে, যা দমন করা অত্যন্ত কঠিন।
এর অন্যতম প্রধান কেন্দ্র হলো শান পাহাড়ের সীমান্ত শহর তাচিলেক। গত জানুয়ারি থেকে কেন্দ্রশাসিত জান্তা সরকার সেখানে অভিযান চালিয়ে ৫০০ জনের বেশি চীনা নাগরিককে গ্রেপ্তার করেছে। তারা মিয়ানমার ও অন্যান্য দেশের নাগরিকদের সঙ্গে মিলে অপারধমূলক কর্মকাণ্ড চালাচ্ছিল। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর অভিযান জোরদার হলে সহজে সীমান্ত পার হওয়ার সুবিধার জন্য অপরাধীরা সাধারণত এই দুর্গম সীমান্ত এলাকাগুলো বেছে নেয়।
জান্তা সরকারে দাবি, তারা ইয়াঙ্গুনের একাধিক টাউনশিপে পরিচালিত একটি সুবিশাল অনলাইন জুয়ার নেটওয়ার্ক উন্মোচন করেছে। এ ঘটনায় ৩৬ জন সন্দেহভাজনকে গ্রেপ্তার এবং বহু কম্পিউটার, ফোন ও ব্যাংক অ্যাকাউন্ট জব্দ করা হয়েছে। প্রায় ৪০ কোটি কিয়াত (১ লাখ ৯০ হাজার ৫২০ মার্কিন ডলার) ফ্রিজ করা হয়েছে বলেও দাবি করা হয়।
এই অপরাধচক্রের মূল হোতা এবার কোনো মূল ভূখণ্ডের চীনা গ্যাংস্টার ছিলেন না; ছিলেন পাই চিফ ইউ নামের এক তাইওয়ানি নাগরিক। তিনি ২০২৫ সালের এপ্রিল থেকে বিদেশ বসে এই ব্যবসা পরিচালনা করছিলেন বলে তদন্তে উঠে এসেছে। জুয়ার উপার্জিত অর্থ তার বিদেশি অ্যাকাউন্টে পাঠানো হতো। স্থানীয়ভাবে ৯৯ লিজেন্ডসের মতো প্ল্যাটফর্মগুলো একটি পেশাদার প্রতিষ্ঠানের মতো পরিচালিত হচ্ছিল, যেখানে মানবসম্পদ (এইচআর) কর্মকর্তা ও হিসাবরক্ষকও নিয়োগ দেওয়া হয়েছিল।
এ ছাড়া, দেশটির দ্বিতীয় বৃহত্তম শহর মান্দালয়ে দুটি আস্তানায় অভিযান চালায় জান্তা বাহিনী। সেখানে চেং শাও দাই নামের এক চীনা রিংলিডার, আরও পাঁচ চীনা নাগরিক এবং ইন্দোনেশিয়া, মালয়েশিয়া ও মিয়ানমারের নাগরিকসহ মোট ২৮ জনকে আটক করা হয়। এই চক্রটি নকল বা নিম্নমানের অ্যাঙ্কড পাথর এবং কৃত্রিম জ্যাডের 'লাইভস্ট্রিম লাকি ড্র' বিক্রির প্রলোভন দেখিয়ে ভুক্তভোগীদের কাছ থেকে বিপুল টাকা হাতিয়ে নিত। টাকা পাওয়ার পর তাদের ব্লক করে দিত।
তথ্যসূত্র : দ্য ইরাবতী






