সম্মিলিত অংশগ্রহণ ছাড়া জান্তার শান্তি আলাপে বসবে না মিয়ানমারের বিরোধীরা

কম্বোডিয়া সফরে মিয়ানমারের প্রেসিডেন্ট মিন অং হ্লাইং। ছবি: রয়টার্স
সেনা অভ্যুত্থান ঘটিয়ে আসেন ক্ষমতায়। তারপর নির্বাচনের মাধ্যমে হয়েছেন প্রেসিডেন্ট। সেই মিন অং হ্লাইং এবার প্রতিশ্রুতি দিলেন আগামী পাঁচ বছরের মধ্যে শান্তি প্রতিষ্ঠা হবে মিয়ানমারে। এ লক্ষ্যে নতুন একটি শান্তি উপদেষ্টা কমিটিও গঠন করেছেন তিনি। এতে জায়গা পেয়েছেন দেশটির সাবেক প্রেসিডেন্ট জেনারেল থেইন সেইনের আমলের শান্তি উদ্যোগে সংশ্লিষ্ট কর্মকতারা। কমিটির প্রধান হিসেবে নিয়োগ পেয়েছেন সাবেক মন্ত্রী মেজর জেনারেল (অব.) অং মিন। তবে জান্তার এই শান্তি সংলাপে আলাদাভাবে কোনো গোষ্ঠীই বসতে রাজি নয়। সম্মিলিতভাবে জান্তা বিরোধী রাজনৈতিক জোটগুলোকে আলোচনার টেবিলে ডাকা হলে বিবেচনার ইঙ্গিত দিয়েছেন সংশ্লিষ্ট দুই মুখপাত্র।
গত রবিবার ভিয়েতনাম থেকে ৩ দিনের রাষ্ট্রীয় সফর শেষে দেশে ফিরেছেন মিয়ানমারের প্রেসিডেন্ট মিন অং হ্লাইং। প্রেসিডেন্ট হিসেবে দায়িত্ব নেওয়ার পর এটি ছিল তার ষষ্ঠ বিদেশ সফর। তবে এই সফরের বিশেষ কোনো কিছুই ছিল না। সমালোচকদের মতে, পাতানো নির্বাচনের মাধ্যমে তিনি দেশটির প্রেসিডেন্ট হন। এর পর থেকে তিনি গত পাঁচ মাসে ভারত, চীন, লাওস, থাইল্যান্ড, রাশিয়া এবং সর্বশেষ ভিয়েতনাম সফর করেছেন। শুক্রবার তিনি সপ্তম দেশ হিসেবে কম্বোডিয়া সফরে গেছেন। লক্ষ্য একটাই, আন্তর্জাতিকভাবে বিচ্ছিন্ন মিয়ানমারকে আবারও ট্র্যাকে ফিরিয়ে আনা। এ লক্ষ্যে অভ্যন্তরীণ বিদ্রোহী গোষ্ঠীগুলোর সঙ্গেও বৈঠক করার চেষ্টা করছে জান্তা।
সিডনিভিত্তিক গবেষণা প্রতিষ্ঠান লোই ইনস্টিটিউটের দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া প্রোগ্রামের প্রধান হান্টার মার্সটন ডয়চে ভেলে বলেন, ‘ডিসেম্বর-জানুয়ারির নির্বাচন এবং সেনাপ্রধানের পদ ছেড়ে মিন অং হ্লাইংয়ের প্রেসিডেন্ট হিসেবে আত্মপ্রকাশের পর থেকে তিনি কূটনৈতিক অংশীদারত্ব বাড়াতে এবং অঞ্চলে সরকারের মিত্রদের সঙ্গে সম্পর্ক সুসংহত করার ওপর বাড়তি নজর দিয়েছেন।’
মিয়ানমারের রাজধানী নেপিদোর কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন, ‘যদিও আঞ্চলিক বন্ধু ও মিত্র দেশগুলোতে এসব সফর তুলনামূলকভাবে সংক্ষিপ্ত, তবুও এটি প্রমাণ করে যে নেপিদো তাদের অংশীদারত্বের বৈচিত্র্য আনা এবং দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক স্বাভাবিক করার কৌশল বেশ জোরেশোরেই চালাচ্ছে।’
তার এই সফরগুলো মূলত আঞ্চলিক ফোরাম ও আন্তর্জাতিক মহলে জান্তা গ্রহণযোগ্যতা ও সরকারের ভাবমূর্তি বাড়ানোর প্রচেষ্টার অংশ। কারণ জান্তার বিরুদ্ধে যুদ্ধাপরাধের নজিরবিহীন অভিযোগ রয়েছে। আর এসবের মূলে দায়ী করা হচ্ছে মিন অং হ্লাইংকে।
তথাকথিত এই শান্তি উদ্যোগগুলো প্রকৃতপক্ষে জান্তার রাজনৈতিক ও সামরিক ব্যর্থতারই বহিঃপ্রকাশ- জিন মার অং
২০২১ সালে নোবেল বিজয়ী অং সান সু চির গণতান্ত্রিকভাবে নির্বাচিত সরকারকে জোরপূর্বক উৎখাত করার পর দেশটিতে চলমান গৃহযুদ্ধে প্রায় ১ লাখ মানুষ প্রাণ হারিয়েছেন। বাস্তুচ্যুত হয়েছেন ৩০ লাখের বেশি। গত মাসে জাতিসংঘ জানায়, দেশটির মানবাধিকার পরিস্থিতির চরম অবনতি ঘটেছে। বিরোধী ও সাধারণ মানুষের নিয়ন্ত্রণে থাকা অঞ্চলগুলোতে সামরিক বাহিনী জোরপূর্বক সেনাবাহিনীতে নিয়োগ, অগ্নিসংযোগ এবং নির্বিচারে বিমান হামলা অব্যাহত রেখেছে। এসব কারণে মিয়ানমার বিশ্বের অন্যতম সর্বোচ্চ নিষেধাজ্ঞাপ্রাপ্ত দেশে পরিণত হয়েছে। হেগ ও অন্যান্য আন্তর্জাতিক আদালতে গণহত্যা, যুদ্ধাপরাধ ও মানবতাবিরোধী অপরাধের একাধিক মামলা দায়ের হয়েছে।
এদিকে জান্তার বিরুদ্ধে শক্তিশালী রাজনৈতিক ও কূটনৈতিক অবস্থান তৈরি করতে বিরোধীরা গঠন করেছে ‘স্টিয়ারিং কাউন্সিল ফর দ্য ইমার্জেন্স অব আ ফেডারেল ডেমোক্রেটিক ইউনিয়ন (এসসিইএফ)’। এটি মূলত মিয়ানমারের জাতিগত বিপ্লবী দল, জনগণের প্রতিনিধি ও নারীদের নিয়ে গঠিত একটি শক্তিশালী যৌথ রাজনৈতিক প্ল্যাটফর্ম। এই পরিষদের মূল উদ্দেশ্য হলো একটি স্থিতিশীল ও ফেডারেল গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা গড়ে তোলা, সাধারণ নাগরিকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং সুশাসন প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে দেশকে ভেঙে পড়ার হাত থেকে রক্ষা করা। কাচিন ইনডিপেনডেন্ট অর্গানাইজেশন (কেআইও), কারেন ন্যাশনাল ইউনিয়ন (কেএনইউ), চীন ন্যাশনাল ফ্রন্ট (সিএনএফ), কারেন্নি, কমেনিটি রিপ্রেজেন্টিং পিডাউংসু হ্লুত্তাও (সিআরপিএইচ) এবং ন্যাশনাল ইউনিটি গভর্নমেন্ট (এনইউজি)— এই ৬টি গোষ্ঠী সম্মিলিতভাবে এসসিইএফ জোট গঠন করেছে।
জান্তার এই শান্তি প্রক্রিয়ার উদ্যোগকে সামরিক ও রাজনৈতিক ব্যর্থতা হিসেবে আখ্যা দিলেন ন্যাশনাল ইউনিটি গভর্নমেন্টের (এনইউজি) পররাষ্ট্রমন্ত্রী ও এসসিইএফের মুখপাত্র জিন মার অং। আগামীর সময়কে তিনি বলেছেন, ‘তথাকথিত এই শান্তি উদ্যোগগুলো প্রকৃতপক্ষে জান্তার রাজনৈতিক ও সামরিক ব্যর্থতারই বহিঃপ্রকাশ। শান্তির প্রতি কোনো সততা বা সুনির্দিষ্ট প্রতিশ্রুতি দেখানোর বদলে জান্তা বাহিনী তাদের সেই পুরনো ছকই নতুন করে বাস্তবায়নের চেষ্টা করছে।’
আমরা অংশগ্রহণমূলক আলোচনা চাই— সিএনফের মুখপাত্র হেত নি
গত ২৭ আগস্ট গঠিত শান্তি উপদেষ্টা কমিটির কাজ হবে লেফটেন্যান্ট জেনারেল ইয়ার প্র্যায়ের নেতৃত্বাধীন জান্তার ‘জাতীয় সংহতি ও শান্তি আলোচনা কমিটি’কে (এনএসপিসি) পরামর্শ দেওয়া। পাঁচ সদস্যের এই উপদেষ্টা দলে রয়েছেন সাবেক প্রেসিডেন্টের দপ্তরবিষয়কমন্ত্রী অং মিন, সাবেক যোগাযোগমন্ত্রী থেইন জাও, অং নাইং উ, ড. মিন জাও উ এবং থেত নাইং।
বিশ্লেষকদের মতে, অং মিনের নেতৃত্বাধীন এই কমিটি তৈরির পেছনে মূল উদ্দেশ্য হলো জান্তার চিরচেনা ‘ডিভাইড অ্যান্ড রুল’ নীতির অংশ হিসেবে বিদ্রোহীদের মধ্যে ফাটল ধরানো। একই মত জিন মার অংয়েরও। ‘জান্তা সরকার বেছে বেছে কিছু পক্ষের সঙ্গে আলোচনার ভান করে বিপ্লবী শক্তিগুলোর মধ্যে ফাটল ধরাতে চায়। তারা চায় আমাদের সম্মিলিত অবস্থানকে দুর্বল করতে। শুধু তাই নয়, সংঘাতের মূল কারণ সমাধান না করে আলোচনার একটি কৃত্রিম নাটক সাজাতে চায় জান্তা,’ আগামীর সময়কে বলছিলেন তিনি।
তবে এখন পর্যন্ত এসসিইএফের অংশিদারদের মধ্যে শান্তি আলোচনার আনুষ্ঠানিক আমন্ত্রণ পেয়েছে কেআইও। এনইউজে আনুষ্ঠানিক আমন্ত্রণ পায়নি বলে আগামীর সময়কে নিশ্চিত করেছেন জিন মার অং।
সিএনএফও কোনো আমন্ত্রণ পায়নি। সিএনফের মুখপাত্র হেত নি আগামীর সময়কে বলেছেন, ‘আমরা এনসপিএনসি থেকে আনুষ্ঠানিক কোনো আমন্ত্রণপত্র পাইনি।’ জান্তার এই শান্তি আলোচানার উদ্যোগ ডিভাইড অ্যান্ড রুল পলিসির অংশ কিনা জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘এটিই তাদের গতানুতিক পলিসি। আমরা অংশগ্রহণমূলক আলোচনা চাই।’
জান্তার শান্তি প্রক্রিয়ায় এখন প্রধান প্রতিবন্ধকতা হয়ে দাঁড়িয়েছে স্থানীয় বিদ্রোহীগোষ্ঠীগুলো। গত ৪ সেপ্টেম্বর আনুষ্ঠানিকভাবে কাচিন ইন্ডিপেনডেন্স অর্গানাইজেশন (কেআইও)-কে আমন্ত্রণ জানায় এনএসপিসি। তবে জান্তা চেয়েছে গোষ্ঠীটি যেন রাজধানী নেপিদোতে এসে বৈঠকে বসে। কেআইও হলো কাচিন ইন্ডিপেনডেন্স আর্মির (কেআইএ) রাজনৈতিক শাখা। গোষ্ঠীটি কাচিন রাজ্যের বেশিরভাগ অংশ নিয়ন্ত্রণ করে।
সংবাদ মাধ্যম দ্য ইরাবতী জানিয়েছে, জান্তার এই আমন্ত্রণ প্রত্যাখ্যান করেছে কেআইও। এনএসপিসি চেয়ারম্যান ইয়ার প্র্যায়ের স্বাক্ষরিত এই আমন্ত্রণে কোনো পূর্বশর্ত রাখা হয়নি। তবে কেআইও জোর দিয়ে জানিয়েছে, যেকোনো আলোচনা মিয়ানমারের বাইরে অনুষ্ঠিত হতে হবে। নেপিদো বা কাচিন রাজ্য— কোনো জায়গাতেই নয়।
সম্প্রতি কাচিন রাজ্যে বিমান ও গানবোট হামলা বাড়িয়েছে জান্তা বাহিনী। এর মধ্যেই আঞ্চলিক গোষ্ঠীটিকে শান্তি আলোচনার আমন্ত্রণ জানানো হয়েছে। কাচিন বিদ্রোহীরা এর আগেও স্পষ্ট করে জানিয়েছিল, তারা এই জান্তাকে অবৈধ মনে করে এবং তাদের সঙ্গে কোনো আলোচনায় বসবে না।
কাচিন বিপ্লবের ৬৫তম বার্ষিকীতে কেআইএ নেতা লেফটেন্যান্ট জেনারেল গান মউ বলেন, আসল বিষয় হলো জান্তা সরকার এনইউজি সঙ্গে আলোচনা করতে ইচ্ছুক কি না। কেআইএ নেতার এই মন্তব্য এইনইউজি এবং সিএনএফ নেতার বক্তব্যের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ। তারা তিনজনই বুঝাতে চেয়েছেন আলোচনায় বসতে হলে বিরোধী রাজনৈতিক জোটের সকল অংশীদারকেই আমন্ত্রণ জানাতে হবে। কেআইও বক্তব্য অনুযায়ী তারা যেকোনো আলোচনা মিয়ানমারের বাইরে চায়। সেক্ষেত্রে জান্তার প্রতি বিরোধী রাজনৈতিক দলের অনাস্থার ইঙ্গিত পাওয়া যায়। তাই জান্তা যদি প্রকৃত শান্তি প্রতিষ্ঠা করতে চায় তাহলে অবশ্যই বিরোধীদের আস্থা অর্জনের দিকে মনোযোগ দিতে হবে।
এদিকে, এনইউজি শান্তি আলোচনা প্রক্রিয়ার ক্ষেত্রে কেআইএর সঙ্গে একমত পোষণ করে কিনা জানতে চাইলে জিন মার অং আগামীর সময়কে বলেন, ‘স্টিয়ারিং কাউন্সিল ফর দ্য ইমার্জেন্স অব আ ফেডারেল ডেমোক্রেটিক ইউনিয়ন (এসসিইএফ)-এর অধীনে সহাবস্থান করছে এনইউজি এবং কেআইএ। এই যৌথ নেতৃত্ব ব্যবস্থার মাধ্যমে অভিন্ন কৌশলগত অবস্থান তৈরিতে কাজ করে যাচ্ছি আমরা। এই বিষয়ে আমাদের দুই পক্ষের ভাবনার জায়গায়ও পুরোপুরি এক।’
এসসিইএফ গত ৩০ মার্চ আনুষ্ঠানিকভাবে আত্মপ্রকাশ করেছে। জান্তার স্বৈরশাসন উৎখাত, সশস্ত্র বাহিনীকে সিভিলিয়ান নেতৃত্বের অধীনে আনা এবং সর্বসম্মতিক্রমে একটি নতুন ফেডারেল গণতান্ত্রিক সংবিধান প্রণয়নের এর লক্ষ্য। ‘এক কমান্ড, এক নীতি ও এক কৌশল’ নীতির ভিত্তিতে একটি সমন্বিত সামরিক কাঠামোও প্রতিষ্ঠা করেছে এসসিইএফ।
পাশাপাশি আসিয়ানসহ আন্তর্জাতিক কূটনীতিতে প্রতিরোধ বাহিনীর একক ও জোরালো কণ্ঠস্বর নিশ্চিত করতে সক্ষম হয়েছে জোটটি। তবে ‘থ্রি ব্রাদারহুড অ্যালায়েন্স’-কে এখনো নিজের ছাদের তলায় আনতে না পারা এবং আঞ্চলিক ভৌগোলিক-রাজনৈতিক সীমাবদ্ধতা জোটের মূল চ্যালেঞ্জ হিসেবে রয়ে গেছে। কিন্তু বিশ্লেষকদের মূল্যায়নে জোটটি মিয়ানমারের বসন্ত বিপ্লবকে সুস্পষ্ট প্রশাসনিক ও সামরিকভাবে ঐক্যবদ্ধ করার ক্ষেত্রে শক্তিশালী নিয়ন্ত্রক হয়ে উঠতে পারে।






