নীরবে খাবার প্লেট থেকে ‘বিষ’ সরিয়ে দিচ্ছে ইরান যুদ্ধ!

ছবি: রয়টার্স
ইরান যুদ্ধ নাড়িয়ে দিচ্ছে তেলের বাজার ও ভূরাজনৈতিক জোটগুলোকে। নিয়মিত খবরের শিরোনাম হচ্ছে এ সম্পর্কিত ঘটনা। তবে ভিন্ন দৃষ্টিতে আরেকটি দিক দেখা যায়। ইরান যুদ্ধ প্রভাব ফেলছে বিশ্ববাসীর খাবারের প্লেটেও। দীর্ঘমেয়াদে খাদ্যশৃঙ্খলে অনেক পরিবেশবাদীর ভাষায় ‘বিষ’ হিসেবে পরিচিত রাসায়নিকের ওপর বিশ্বের নির্ভরতা কমিয়ে দিতে পারে এ সংঘাত।
বৈশ্বিক খাদ্যব্যবস্থার এক গভীর দুর্বলতা জীবাশ্ম জ্বালানিনির্ভর রাসায়নিক সার। ইরান যুদ্ধ এই দুর্বলতাকেই সামনে এনে দিয়েছে। হরমুজ প্রণালিকে ঘিরে সরবরাহব্যবস্থার সংকটের কারণে বিশ্বজুড়ে বেড়েছে সারের দাম। বিশ্বজুড়ে এখন শিল্পভিত্তিক কৃষিতে দীর্ঘদিন ধরে ব্যবহৃত রাসায়নিকের বিকল্প নিয়ে ভাবতে শুরু করেছে বহু কৃষক।
জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থার (এফএও) তথ্য অনুযায়ী, ২০২৩ সাল পর্যন্ত বিশ্বে অজৈব সারের ব্যবহার প্রায় ১৯ কোটি মেট্রিক টনে পৌঁছেছে, যা ২০০২ সালের তুলনায় ৩৪ শতাংশ বেশি। এর মধ্যে শুধু নাইট্রোজেন সারই ছিল ১১ কোটি ২০ লাখ টন, যা আধুনিক শিল্পভিত্তিক কৃষির মূল ভিত্তি হিসেবে বিবেচিত হয়।
কিন্তু এই নির্ভরতার পরিবেশগত প্রভাব অত্যন্ত বেশি। কৃত্রিম সার সরাসরি জীবাশ্ম জ্বালানির সঙ্গে যুক্ত। নাইট্রোজেন সারের প্রধান উপাদান অ্যামোনিয়া উৎপাদনে প্রাকৃতিক গ্যাস অপরিহার্য।
গবেষকদের হিসাব অনুযায়ী, বিশ্বব্যাপী কৃষিখাতে মোট গ্রিনহাউস গ্যাস নিঃসরণের ৮ শতাংশেরও বেশি আসে কৃত্রিম নাইট্রোজেন সার থেকে। আরেকটি গবেষণায় দেখা গেছে, শুধু কৃত্রিম সারের সরবরাহ শৃঙ্খল থেকেই এক বছরে প্রায় ১২৫ কোটি টন কার্বন ডাই-অক্সাইড সমতুল্য গ্যাস নিঃসৃত হয়েছে—যা বৈশ্বিক বাণিজ্যিক বিমান চলাচলের মোট নিঃসরণের চেয়েও বেশি।
ইরান সংঘাত এখন সারসংকট ও মূল্যবৃদ্ধির আশঙ্কা আরও বাড়িয়ে দিয়েছে। আফ্রিকা, এশিয়া ও লাতিন আমেরিকার যেসব দেশ আমদানিনির্ভর সারের ওপর ব্যাপকভাবে নির্ভরশীল, তারা ইতোমধ্যেই চাপ অনুভব করছে। ভারত তার মোট সারের প্রায় ৬০ শতাংশ উপসাগরীয় দেশগুলো থেকে আমদানি করে, আর ব্রাজিল আমদানি করে ৮০ শতাংশেরও বেশি। সেনেগাল বছরে প্রায় ১ লাখ ২৫ হাজার টন সার আমদানি করে।
দাম বাড়তে থাকায় অনেক কৃষক এখন জৈব কম্পোস্ট, গবাদিপশুর গোবর ও বায়োফার্টিলাইজারের দিকে ঝুঁকছেন। অ্যাসোসিয়েটেড প্রেসের তথ্য অনুযায়ী, ব্রাজিলে ২০২৩ থেকে ২০২৪ সালের মধ্যে বায়োফার্টিলাইজার শিল্প ১৫ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে। ভারতে তেলেঙ্গানা ও অন্ধ্রপ্রদেশে ১৭ লাখেরও বেশি কৃষক গরুর গোবর, মূত্র ও জৈব বর্জ্য দিয়ে তৈরি উপকরণ ব্যবহার করে গ্রহণ করেছেন প্রাকৃতিক কৃষি পদ্ধতি।
সুস্থ মাটি থেকেই স্বাস্থ্যকর খাদ্য উৎপন্ন হয়। কম্পোস্টভিত্তিক কৃষি মাটিতে অণুজীবের কার্যক্রম বাড়ায়, পানি ধরে রাখার ক্ষমতা উন্নত করে এবং শেষ পর্যন্ত মানুষের খাদ্যে প্রবেশ করা রাসায়নিক অবশিষ্টাংশ কমায়।
যদিও রাসায়নিক সারকে সরাসরি ‘বিষ’ বলা রাজনৈতিকভাবে বিতর্কিত হতে পারে, তবে সমালোচকেরা মনে করেন অতিরিক্ত কৃত্রিম কৃষিনির্ভরতা পরিবেশ ও জনস্বাস্থ্য—দুই ক্ষেত্রেই হয়েছে ক্ষতির কারণ।
গবেষণায় দেখা গেছে, অতিরিক্ত সার ব্যবহারের সঙ্গে সম্পর্ক রয়েছে জীববৈচিত্র্য হ্রাস ও পানিদূষণের।
সারের দাম বাড়া এবং সরবরাহব্যবস্থার অস্থিরতার মধ্যে বিশ্বজুড়ে কৃষকেরা বুঝতে শুরু করেছেন, হয়তো অর্থনৈতিক স্বাধীনতার পথও তৈরি করতে পারে স্বাস্থ্যকর মাটি। ইরান যুদ্ধ সরকার ও কৃষকদের সামনে একটি কঠিন বাস্তবতা স্পষ্ট করে তুলছে—সম্পূর্ণ জীবাশ্ম জ্বালানিনির্ভর রাসায়নিকভিত্তিক খাদ্য উৎপাদন ব্যবস্থা ভূরাজনৈতিক অস্থিরতার ক্ষেত্রে অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ।
এর ফলে মনে হচ্ছে, সামরিক সংঘাত হিসেবে শুরু হওয়া ইরান যুদ্ধই শেষ পর্যন্ত হয়তো বদলে দিতে পারে বৈশ্বিক কৃষি ব্যবস্থাকে।
তবে জৈব বিকল্পগুলোও চ্যালেঞ্জমুক্ত নয়। এগুলোর জন্য বেশি শ্রম, শক্তিশালী স্থানীয় সরবরাহব্যবস্থা এবং প্রয়োজন হয় সরকারি সহায়তার। তবে এগুলো শেষ পর্যন্ত কৃষিশিল্পের ভবিষ্যত নিয়ে আরেকবার ভাবাবে কৃষকদের।
তাই বলাই যায়, যুদ্ধের উদ্দেশ্য কৃষিকে বদলে দেওয়া ছিল না। কিন্তু এটি হয়তো শেষ পর্যন্ত বিশ্ববাসীর খাবারের প্লেট থেকে ‘বিষ’ সরিয়ে দিতে রাখবে ভূমিকা।






