মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধবিরতি
শাহবাজ-মুনির-ইসহাক ত্রয়ীতে বাজিমাত পাকিস্তানের, চাপে দিল্লি

পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী শাহবাজ শরিফ, সেনাপ্রধান আসিম মুনির ও পররাষ্ট্রমন্ত্রী ইসহাক দার।
৪০ দিনের রক্তক্ষয়ী সংঘাতের অবসান ঘটিয়ে গত বুধবার সকালে দুই সপ্তাহের যুদ্ধবিরতিতে পৌঁছে ইরান ও যুক্তরাষ্ট্র। এই সাময়িক বিরতিকে স্থায়ী রূপ দিতে পাকিস্তানের রাজধানী ইসলামাবাদে এক বিশেষ আলোচনায় বসছে তেহরান ও ওয়াশিংটনের প্রতিনিধি দল।
গত ২৮ ফেব্রুয়ারি ইসরায়েলকে সঙ্গে নিয়ে ইরানে অতর্কিত হামলা চালায় মার্কিন বাহিনী। অভিযানের শুরুতেই দেশটির সর্বোচ্চ নেতাসহ শীর্ষস্থানীয় সামরিক কর্মকর্তাদের হত্যা করে ওয়াশিংটন।
জবাবে ইসরায়েল ও উপসাগরীয় অঞ্চলে অবস্থিত মার্কিন স্বার্থসংশ্লিষ্ট লক্ষ্যবস্তুগুলোতে পাল্টা আঘাত হানে তেহরান। একইসঙ্গে বিশ্বে জ্বালানি সরবরাহের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ পথ ‘হরমুজ প্রণালির’ নিয়ন্ত্রণ গ্রহণ করে ইরান।
এই প্রণালি দিয়ে সরবরাহ হয় বিশ্বের মোট জ্বালানির ২০ শতাংশ। হরমুজ অবরোধের ফলে বিশ্বজুড়ে দেখা দেয় চরম জ্বালানি সংকট। পুরো মধ্যপ্রাচ্যে বাড়তে থাকে বেসামরিক হতাহতের সংখ্যা।
এমন জটিল পরিস্থিতিতে সংঘাত থামাতে মধ্যস্থতাকারীর ভূমিকায় আবির্ভূত হয় একমাত্র মুসলিম পারমাণবিক শক্তিধর দেশ পাকিস্তান। বিবাদমান দুপক্ষের মধ্যে সমঝোতা স্থাপনে ইসলামাবাদের ভূমিকা বিশ্বজুড়ে হচ্ছে প্রশংসিত।
বিশ্লেষকদের ভাষ্য, এর ফলে আন্তর্জাতিক কূটনৈতিতে প্রভাবশালী অবস্থান তৈরি করেছে পাকিস্তান। বিশেষ করে দেশটির প্রধানমন্ত্রী শাহবাজ শরিফ, সেনাপ্রধান আসিম মুনির এবং পররাষ্ট্রমন্ত্রী ইসহাক দারের সফল কূটনৈতিক তৎপরতাকে দেখা হচ্ছে পাকিস্তানের এক বিশাল বিজয় হিসেবে।
শাহবাজ শরিফ : প্রধান নির্বাহীর দক্ষ যোগাযোগ
৮ এপ্রিল ভোরে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে যুদ্ধবিরতির ঘোষণা দেন প্রধানমন্ত্রী শাহবাজ শরিফ। পাকিস্তানের মধ্যস্থতায় হওয়া এ সাময়িক বিরতির পেছনে দেশটির প্রধান নির্বাহী হিসেবে পুরোটা সময় সব পক্ষের মধ্যে দক্ষভাবে যোগাযোগ রক্ষা করেছেন তিনি।
যুদ্ধের চরম উত্তেজনার সময় ব্যক্তিগত কূটনৈতিক যোগাযোগ করে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এবং ইরানের সর্বোচ্চ নেতৃত্ব ও পররাষ্ট্রমন্ত্রীর সঙ্গে সরাসরি হটলাইনে যোগাযোগ স্থাপন করেন পাক প্রধানমন্ত্রী।
তিনি দুপক্ষকে বোঝাতে সক্ষম হন যে, এই যুদ্ধ পুরো মধ্যপ্রাচ্যসহ ধ্বংস করবে বিশ্ব অর্থনীতিকে। তেহরানের ওপর যে বড় ধরনের হামলার পরিকল্পনা করেছিলেন, শাহবাজ শরিফের অনুরোধে আপাতত দুই সপ্তাহের জন্য স্থগিত করেন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প।
এক্ষেত্রে মার্কিন প্রশাসনকে একটি কূটনৈতিক সুযোগ দেওয়ার প্রস্তাব দেন তিনি। মধ্যস্থতার অংশ হিসেবে শাহবাজ শরিফ পাকিস্তানের সেনাপ্রধান জেনারেল আসিম মুনিরের সঙ্গে সমন্বয় করে কাজ করেছেন। পাকিস্তানের সামরিক ও রাজনৈতিক নেতৃত্বের এই ঐক্যবদ্ধ অবস্থান যুক্তরাষ্ট্র ও ইরান—উভয় পক্ষের কাছেই পেয়েছে গ্রহণযোগ্যতা।
এ ছাড়া ২৯ ও ৩০ মার্চে পররাষ্ট্রমন্ত্রী পর্যায়ে বৈঠক করতে ইসহাক দারকে নির্দেশ দেন তিনি।
ভারতবিরোধী অবস্থানের কারণে চীনের সঙ্গে শাহবাজ শরিফের রয়েছে পুরোনো বন্ধুত্ব। আবার বেইজিং ইরানের অন্যতম প্রধান বাণিজ্য অংশীদার। এক্ষেত্রে চীনের সমর্থন এবং যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সুসম্পর্ক- উভয়কেই কাজে লাগিয়েছেন তিনি।
ইরানকে যুদ্ধবিরতিতে রাজি করাতে চীনের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা ছিল বলে মনে করা হয়। ৯ এপ্রিল টেলিফোনে এএফপিকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে ট্রাম্পও স্বীকার করেছেন, যুদ্ধবিরতির পেছনে থাকতে পারে চীনের ভূমিকা।
বিশ্লেষকদের অভিমত, চীন, যুক্তরাষ্ট্র এবং ইরানের সঙ্গে নিবিড় যোগাযোগ করে ৩ পক্ষকে রাজি করান শাহবাজ শরিফ। তার এই পদক্ষেপ বিশ্বমঞ্চে পাকিস্তানের গুরুত্ব পুনপ্রতিষ্ঠা করেছে বলে মত আন্তর্জাতিক কূটনৈতিক বিশ্লেষকদের।
ফিল্ড মার্শাল আসিম মুনির : পর্দার পেছনের মূল খেলোয়াড়
পাক সেনাপ্রধান আসিম মুনিরকে মনে করা হচ্ছে এ যুদ্ধবিরতির মূল নায়ক। ইসলামাদের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে সেনাবাহিনী কতটা প্রভাবশালী; তা সকলেরই জানা।
নির্বাহী ক্ষমতা প্রধানমন্ত্রী বা রাষ্ট্রপ্রধানদের কাছে থাকলেও পাকিস্তানে সিদ্ধান্ত নেওয়ার বিষয় অনেকাংশেই থাকে সেনাপ্রধানের হাতে। যুক্তরাষ্ট্র এবং ইরানের মধ্যে দুই সপ্তাহের যুদ্ধবিরতি কার্যকর করার পেছনে মুখ্য ভূমিকায় ছিলেন ফিল্ড মার্শাল আসিম মুনির।
ওয়াশিংটন ও তেহরানের মধ্যে বার্তা আদান-প্রদান এবং প্রস্তাব পাঠানোর জন্য একটি বিশ্বস্ত ও নির্ভরযোগ্য মাধ্যম হিসেবে কাজ করেছেন তিনি। সরাসরি দ্বিপাক্ষিক বৈঠক ছাড়াই ইতিহাসে প্রথমবারের মতো বিবদমান পক্ষের মধ্যে সরাসরি মধ্যস্থতা করল পাকিস্তান।
এর পেছনে আসিম মুনিরের কৃতিত্ব দেন আন্তর্জাতিক বিশ্লেষকরা। ধারণা করা হচ্ছে, এ কাজে ব্যক্তিগত সম্পর্ককে ব্যবহার করেছেন তিনি। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সঙ্গে মুনিরের রয়েছে গভীর ব্যক্তিগত সখ্যতা।
ট্রাম্প তাকে ‘আমার প্রিয় ফিল্ড মার্শাল’ বলে অভিহিত করেন এবং জোর দিয়ে দাবি করেন, মুনির ও শাহবাজের অনুরোধেই ইরানের ওপর আক্রমণ স্থগিত রাখতে রাজি হয়েছেন তিনি।
গত বছরের জুন থেকে ট্রাম্প একাধিকবার নানা বিশেষণে প্রকাশ্যে প্রশংসা করেছেন পাক সেনাপ্রধানের। সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য ঘটনাটি গত অক্টোবরের। গাজায় ইসরায়েল ও হামাসের মধ্যে যুদ্ধবিরতি চুক্তি শেষে মিসরের শারম আল-শেখে ভাষণ দেন ট্রাম্প।
যুদ্ধবিরতির প্রচেষ্টার জন্য বিশ্বনেতাদের ধন্যবাদ জানানোর সময় ট্রাম্প নিজের পেছনে দাঁড়িয়ে থাকা আসিম মুনিরকে উল্লেখ করেন ‘আমার প্রিয় ফিল্ড মার্শাল’ বলে। এ বছরের শুরুর দিকে আরও বেশ কয়েকবার ফিল্ড মার্শাল মুনিরকে ‘একজন দুর্দান্ত যোদ্ধা’, ‘খুবই গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তি’ এবং ‘অসাধারণ মানুষ’- এমন নানা বিশেষণ দিয়ে প্রশংসা করেছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট।
গত বছর জুনে ভারতের সঙ্গে যুদ্ধবিরতির পর আসিম মুনিরকে একান্ত নৈশভোজের আমন্ত্রণ জানান ট্রাম্প। প্রথম বৈঠকের পর মার্কিন প্রেসিডেন্ট বলেছিলেন, পাকিস্তানি সামরিক প্রধানের সঙ্গে দেখা করতে পেরে তিনি ‘সম্মানিত’।
বিশ্লেষকেরা বলছেন, মার্কিন প্রেসিডেন্টের সঙ্গে পাকিস্তানি সেনাপ্রধানের এই প্রকাশ্য উষ্ণতা ছিলো যুদ্ধবিরতির 'কি পয়েন্ট'। ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচি এই প্রচেষ্টার জন্য মুনিরকে তার ‘প্রিয় ভাই’ সম্বোধন করে কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেছেন। প্রশংসা করেছেন যুদ্ধ বন্ধে তার অক্লান্ত পরিশ্রমের।
মধ্যস্থতার চূড়ান্ত পর্যায়ে মার্কিন ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স এবং বিশেষ দূত স্টিভ উইটকফের পাশাপাশি ইরানের শীর্ষ কর্মকর্তাদের সঙ্গে সরাসরি যোগাযোগ বজায় রাখেন মুনির। ট্রাম্পের দেওয়া সময়সীমা শেষ হওয়ার ঠিক আগে ১৫-দফা (যুক্তরাষ্ট্র) এবং ১০-দফা (ইরান) পরিকল্পনার সমন্বয় ঘটিয়ে দুই ধাপের একটি যুদ্ধবিরতি প্রস্তাব পেশ করেন আসিম মুনির, যা গৃহীত হয়ে কার্যকর হয় যুদ্ধবিরতি।
এই উচ্চ কূটনৈতিক সফলতার ফলে বিশ্ব রাজনীতিতে পাকিস্তানের মর্যাদা এবং ফিল্ড মার্শাল আসিম মুনিরের প্রভাব উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে। ওয়াশিংটন ও ইসলামাবাদের সম্পর্ক মাত্র কয়েক বছর আগেও খুব খারাপ অবস্থায় ছিল। আসিম মুনিরের কূটনৈতিক দক্ষতায় তা এখন হয়ে ওঠেছে উষ্ণ।
২০২৫ সাল থেকে দেশটির ক্রমবর্ধমান ভূরাজনৈতিক ইতিবাচক ভাবমূর্তির নেপথ্যে প্রধান চালিকা শক্তি ছিলেন মুনির। বিশ্লেষকরা ইসলামাবাদের কূটনৈতিক মর্যাদা পুনরুদ্ধার এবং ওয়াশিংটনের সঙ্গে চলতে থাকা তিক্ত সম্পর্ককে সুসম্পর্কে রূপান্তর করার কৃতিত্ব দেন পাক ফিল্ড মার্শালকে।
তাদের দাবি, এসব কারণে আঞ্চলিক প্রতিদ্বন্দ্বী ভারত আন্তর্জাতিক কূটনৈতিতে অনেক পিছিয়ে পড়েছে। বিশেষ করে যুদ্ধবিরতি ঘটনায় কার্যত ‘কর্নার’ হয়ে গেল নয়াদিল্লি।
ইসহাক দার : হাল না ছেড়ে অব্যাহত কূটনীতিক প্রচেষ্টা
যুদ্ধবিরতি কার্যকর করার ক্ষেত্রে এক অনন্য কূটনৈতিক সাফল্য দেখিয়েছেন পাকিস্তানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ইসহাক দার। তার নিরলস পরিশ্রম ও দৃশ্যমান প্রচেষ্টার কারণেই আজ থেকে দুই দেশের প্রতিনিধিদের মধ্যে চূড়ান্ত সমঝোতা বৈঠক শুরু হতে যাচ্ছে ‘ইসলামাবাদ আলোচনা’ নামে।
মার্চ মাস থেকেই তেহরান ও ওয়াশিংটনের মধ্যে প্রধান যোগাযোগের মাধ্যম হিসেবে কাজ করে আসছিল ইসহাক দারের নেতৃত্বে একটি উচ্চপর্যায়ের দল। যুদ্ধের উত্তেজনা কমিয়ে আনতে ২৯ মার্চ তুরস্ক, মিশর ও সৌদি আরবের পররাষ্ট্রমন্ত্রীদের সঙ্গে একটি গুরুত্বপূর্ণ বৈঠকে সভাপতিত্ব করেন তিনি। এ বৈঠকে আঞ্চলিক দেশগুলোর সমর্থন আদায়ের মাধ্যমে প্রথম দৃশ্যমান কূটনৈতিক সাফল্য পান ইসহাক দার।
ব্যক্তিগতভাবে যুক্তরাষ্ট্রের ১৫ দফা শর্ত এবং ইরানের ১০ দফা পাল্টাপ্রস্তাব উভয় পক্ষের কাছে পৌঁছে দিয়ে আলোচনার পথ সুগম করেছেন তিনি। যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের সংলাপ শুরুর জন্য একটি কাঠামো তৈরির কাজ শুরু করেন পাক পররাষ্ট্রমন্ত্রী।
তবে ৭ এপ্রিল তেহরানে ইসরায়েলি হামলার পর সম্ভাবনা দেখা দেয় এই শান্তি প্রক্রিয়া ভেস্তে যাওয়ার। এমন বাস্তবতায় ইসহাক দার সংসদে দাঁড়িয়ে এই হামলার তীব্র নিন্দা জানান। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে সরাসরি ইরানি পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচির সঙ্গে যোগাযোগ করেন।
কূটনৈতিক সূত্রের ভাষ্য, ইসহাক দার তখন পিছু না হটে বরং সব পক্ষের সঙ্গে আরও জোরদার করেন যোগাযোগ। পরবর্তীতে দ্রুত সময়ে ওয়াশিংটন, মস্কো, বেইজিং, ইউরোপের গুরুত্বপূর্ণ রাজধানী, উপসাগরীয় (গলফ) দেশ, তুরস্ক, মিসর, সৌদি আরবসহ একাধিক দেশের শীর্ষ নেতা ও কর্মকর্তাদের সঙ্গে কথা বলেন ইসহাক দার।
এর লক্ষ্য ছিল আনুষ্ঠানিক আলোচনার পূর্ব ধাপ হিসেবে একটি সীমিত যুদ্ধবিরতি কার্যকর। তার এই তৎপরতার ফলে আনুষ্ঠানিকভাবে ঘোষণা করা হয় দুই সপ্তাহের যুদ্ধবিরতি। আজকে অনুষ্ঠিত হতে যাওয়া ঐতিহাসিক বৈঠকটি মধ্যপ্রাচ্যে দীর্ঘস্থায়ী শান্তি প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রে হতে পারে বড় মাইলফলক।















