সাবেক মুখ্যমন্ত্রীসহ পিটিআইয়ের শত শত নেতা–কর্মীকে ধরপাকড়
- ঝিমিয়ে পড়েছে ইমরান খানের লংমার্চ
- খাইবার পাখতুনখাওয়ায় সেনা মোতায়েন

পাকিস্তানের খাইবার পাখতুনখোয়া প্রদেশে জরুরি অবস্থা জারি এবং ইমরান খানের দল পিটিআইয়ের নেতৃত্বাধীন প্রাদেশিক সরকার স্থগিতের পরদিন পেশোয়ারে বিক্ষোভ চলাকালে এক বিক্ষোভকারীকে আটক করছেন পুলিশ সদস্যরা।
ইসলামাবাদের দিকে এগোনোর কথা ছিল মিছিলের। কিন্তু পথেই থমকে গেছে ইমরান খানের সমর্থকদের কাফেলা। সড়কে পুলিশ। মোড়ে মোড়ে প্রতিবন্ধক। আর রাজনৈতিক ঘাঁটি খাইবার পাখতুনখাওয়ায় এখন কেন্দ্রের শাসন। পাকিস্তানের সাবেক প্রধানমন্ত্রীর মুক্তির দাবিতে শুরু হওয়া লংমার্চে নেমে এসেছে গভীর অনিশ্চয়তা।
সোমবার (১২ অক্টোবর) এক্সপ্রেস ট্রিবিউন জানিয়েছে, রবিবার সোয়াবি জেলায় বড় সমাবেশের পরিকল্পনা ভেস্তে যায়। স্থানীয় নেতৃত্বের অনুপস্থিতিতে জমায়েত গতি পায়নি। পুলিশ সোয়াবিতে পিটিআইয়ের ৫৯ কর্মী এবং খাইবার জেলায় আরও ছয়জনকে আটক করেছে। কয়েকটি এলাকায় মুঠোফোন ও ইন্টারনেট সংযোগও বন্ধ রাখা হয়।
প্রদেশটির মুখ্যমন্ত্রী সোহেল আফ্রিদিসহ কারাবন্দী সাবেক প্রধানমন্ত্রী ইমরান খানের দল পাকিস্তান তেহরিক-ই-ইনসাফের (পিটিআই) শত শত নেতা-কর্মীকে আটক করা হয়েছে। প্রদেশটিতে জরুরি শাসন জারির পর এই ধরপাকড় শুরু হয়।
এমন পরিস্থিতিতে পিটিআইয়ের আট নেতাকে প্রতিরোধমূলক হেফাজতে নেওয়ার কথা নিশ্চিত করেছে পুলিশ। তাদের মধ্যে রয়েছেন সদ্য ক্ষমতাচ্যুত মুখ্যমন্ত্রী সোহেল আফ্রিদি, প্রাদেশিক পরিষদের স্পিকার বাবর সেলিম সোয়াতি এবং প্রাদেশিক সভাপতি জুনায়েদ আকবর। সোমবার (১২ অক্টোবর) ডনের প্রতিবেদনে এ তথ্য জানানো হয়।
বার্তা সংস্থা রয়টার্সকে পাকিস্তানের স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী তালাল চৌধুরী বলেছেন, ‘মুখ্যমন্ত্রী ও তার মন্ত্রিসভার কয়েকজন সদস্যকে প্রতিরোধমূলক হেফাজতে নেওয়া হয়েছে, তা নিশ্চিত করছি।’ তিনি জানিয়েছেন, রবিবার তাদের আটক করা হয়। যাদের বিরুদ্ধে মামলা রয়েছে, তাদের বিচারের মুখোমুখি করা হবে। অন্যদের ছেড়ে দেওয়া হবে।
এর আগে রবিবার (১১ অক্টোবর) প্রধানমন্ত্রী শাহবাজ শরিফের পরামর্শে খাইবার পাখতুনখাওয়ায় জরুরি অবস্থা ও গভর্নরের শাসন জারি করেন প্রেসিডেন্ট আসিফ আলী জারদারি। সরকারি ঘোষণায় সন্ত্রাসী হামলা বৃদ্ধি এবং আইনশৃঙ্খলা নিয়ন্ত্রণে প্রাদেশিক প্রশাসনের ব্যর্থতার অভিযোগ তোলা হয়েছে। পিটিআই অভিযোগ অস্বীকার করেছে।
প্রেসিডেন্টের দপ্তরের বিবৃতিতে বলা হয়েছে, ‘মন্ত্রিসভার সিদ্ধান্ত, প্রধানমন্ত্রীর পরামর্শ, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে সংশ্লিষ্ট সংস্থার প্রতিবেদন এবং সরকারি প্রতিনিধিদের সঙ্গে আলোচনা ব্যর্থ হওয়ার পরই প্রেসিডেন্ট প্রস্তাবে সই করেছেন।’ সরকারের দাবি, সন্ত্রাসী হামলায় সাধারণ মানুষের জীবন ও সরকারি স্থাপনা বিপন্ন। বিরোধীদের অভিযোগ, নিরাপত্তার অজুহাতে নির্বাচিত সরকারকে সরানো হয়েছে।
জরুরি ব্যবস্থায় প্রাদেশিক সরকারের ক্ষমতা পেয়েছেন গভর্নর ফয়সাল করিম কুন্ডি। তাকে সহায়তা করছে ১১ সদস্যের উপদেষ্টা পরিষদ। প্রাদেশিক পরিষদের ক্ষমতা প্রয়োগ করতে পারবে ফেডারেল পার্লামেন্ট বা তার অনুমোদিত সংস্থা। মুখ্যমন্ত্রী, মন্ত্রী ও উপদেষ্টাদের দায়িত্ব স্থগিত করা হয়েছে। আল-জাজিরার সোমবারের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, গভর্নরের শাসন স্থায়ী নয়। সংসদের অনুমোদনসাপেক্ষে সর্বোচ্চ ছয় মাস চলতে পারে।
সোমবার গভর্নর কুন্ডি বলেছেন, ‘উন্নয়নের ক্ষেত্রে ছাড় দেওয়া যায়, কিন্তু নিরাপত্তায় নয়।’ পুলিশ ও সেনাবাহিনীর সমন্বয়ে সন্ত্রাস দমনের অঙ্গীকার করেন তিনি। মঙ্গলবার (১৩ অক্টোবর) পাকিস্তানের জাতীয় পরিষদ ও সিনেটের অধিবেশন বসার কথা। জরুরি অবস্থার অনুমোদনও দিতে হবে পার্লামেন্টকে।
সংবিধানের ২৪৫ অনুচ্ছেদে বেসামরিক প্রশাসনকে সহায়তার জন্য সেনা মোতায়েনের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। সেনাসদস্যের সংখ্যা নির্ধারণ করবেন গভর্নর ও সামরিক কর্তৃপক্ষ। নতুন মুখ্যসচিব হয়েছেন মুহাম্মদ ফখর আলম ইরফান। প্রশাসনিক দায়িত্বে যুক্ত হয়েছেন ইয়াহিয়া আখুনজাদা। সোমবার প্রাদেশিক অ্যাডভোকেট জেনারেলের দপ্তরের ৭১ আইনজীবীর নিয়োগও বাতিল হয়েছে।
শনিবার প্রেসিডেন্ট ও প্রধানমন্ত্রীর বৈঠকের পর থেকেই কঠোর পদক্ষেপের আভাস মিলেছিল। দ্য নিউজের সোমবারের প্রতিবেদনে দলীয় সূত্রের দাবি, ব্যর্থ আলোচনায় ইমরানের সঙ্গে সাক্ষাৎ, তার তিন বোনের মুক্তি ও চিকিৎসার সুযোগ নিয়ে সমঝোতার সম্ভাবনা ছিল। কিন্তু চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হয়নি।
৪ অক্টোবর শুরু হওয়া লংমার্চ এখনও ইসলামাবাদ পৌঁছায়নি। রাজধানীতে বসানো প্রতিবন্ধক সরানোর নির্দেশ দিয়েছে পুলিশ। পেশোয়ারে সাত দিনের জন্য সভা-মিছিল নিষিদ্ধ করা হয়েছে। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ রয়েছে কয়েকটি জেলায়।
পিটিআই চেয়ারম্যান গওহর আলী খান প্রশ্ন তুলেছেন, ‘সন্ত্রাসের সমস্যা যদি ১২ জেলায় হয়, তবে পুরো প্রদেশে গভর্নরের শাসন কেন?’ আদালতে সিদ্ধান্ত চ্যালেঞ্জের ঘোষণা দিয়েছেন তিনি। একই সঙ্গে বলেছেন, ‘আমরা আনুষ্ঠানিকভাবে লংমার্চ প্রত্যাহার করিনি।’
রাজপথ আপাতত স্তব্ধ। কিন্তু যে দাবি নিয়ে মিছিলের শুরু, কারাবন্দি ইমরান খানের মুক্তি, তার মীমাংসা এখনও বহু দূর।



