মানুষের জন্য মানুষ, শ্রীলঙ্কার ‘দানসাল’ ঐতিহ্য

সংগৃহীত ছবি
মে মাস এলেই শ্রীলঙ্কায় রাস্তাঘাটের চেহারা বদলে যায়। বৌদ্ধ ধর্মাবলম্বীদের অন্যতম পবিত্র উৎসব বুদ্ধ পূর্ণিমাকে ঘিরে শহর ও গ্রামজুড়ে ঝুলে পড়ে রঙিন ফানুস, আলোকসজ্জায় সেজে ওঠে মন্দির। কিন্তু এই উৎসবের সবচেয়ে বড় আকর্ষণ আলো নয়, বরং মানুষের জন্য মানুষের হাত বাড়িয়ে দেওয়ার এক প্রাচীন ঐতিহ্য-‘দানসাল’।
দানসাল বলতে বোঝায় রাস্তার ধারে অস্থায়ী স্টল, যেখানে পথচলতি মানুষকে সম্পূর্ণ বিনামূল্যে খাবার, পানীয় কিংবা প্রয়োজনীয় সামগ্রী দেওয়া হয়। এর শিকড় বৌদ্ধ ধর্মের ‘দানা’ বা নিঃস্বার্থ দানের শিক্ষায়। বিনিময়ে কিছু পাওয়ার প্রত্যাশা নয়, বরং অন্যের উপকার করাই এর মূল কথা।
শ্রীলঙ্কার পূর্ণিমার ছুটির দিনগুলোতে এই দানসাল দেখা গেলেও মে থেকে জুলাইয়ে উৎসবের মৌসুমে এর ব্যপ্তি থাকে সবচেয়ে বেশি। কোথাও সেদ্ধ কাসাভা, কোথাও ফলের শরবত, কোথাও আবার ভাত-তরকারির পূর্ণ আহার সবই মেলে বিনামূল্যে। শিশুদের দেখা যায় রাস্তার ধারে দাঁড়িয়ে গাড়ি থামাতে, আর সাদা পোশাক পরা স্বেচ্ছাসেবকরা হাসিমুখে খাবার তুলে দেন অপরিচিত মানুষের হাতে।
তবে এ বছরের দানসাল যেন নতুন অর্থ পেয়েছে। শ্রীলঙ্কার বিভিন্ন অঞ্চলে তাপমাত্রা ৩৯ ডিগ্রি সেলসিয়াস পর্যন্ত পৌঁছেছে। দীর্ঘ খরায় কোথাও কোথাও পানীয় জলের সংকট দেখা দিয়েছে। তার সঙ্গে জ্বালানি, বিদ্যুৎ ও খাদ্যের মূল্যবৃদ্ধি সাধারণ মানুষের জীবনকে আরও কঠিন করে তুলেছে।
চলমান পরিস্থিতিতে ছোট ছোট মানবিক উদ্যোগও বড় হয়ে উঠছে। দেশটির রাজধানী কলম্বোয় তীব্র গরমের সময় বহু ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান পথচারীদের জন্য বিনামূল্যে খাবার পানির ব্যবস্থা করেছে। সিংহলি ও তামিল নববর্ষের আগে একটি বিস্কুট প্রস্তুতকারী সংস্থা প্রায় ২৫ হাজার ট্রেনের টিকিট বিনামূল্যে বিতরণ করে, যাতে উৎসবের সময়ে মানুষের যাতায়াতের খরচ কিছুটা কমে।
বর্তমানে দানসাল আগের তুলনায় অনেক বেশি প্রয়োজনমুখী। কোথাও শিক্ষার্থীদের খাতা দেওয়া হচ্ছে, কোথাও গর্ভবতী নারীদের জন্য শুকনো খাদ্যসামগ্রী। কারণ তাপপ্রবাহ ও মূল্যবৃদ্ধির এই সময়ে একে অপরের পাশে দাঁড়ানোর প্রয়োজনীয়তা আগের চেয়ে অনেক বেশি।
বৌদ্ধ ধর্মবিশারদদের মতে, এই ঐতিহ্যের ইতিহাস দুই হাজার বছরেরও বেশি পুরোনো। শ্রীলঙ্কার প্রাচীন ইতিহাসগ্রন্থ ‘মহাবংশ’-এ এর উল্লেখ পাওয়া যায়। উনিশ ও বিশ শতকে বৌদ্ধধর্ম সংস্কারের সময় মন্দির ও ধনী পরিবারগুলো তীর্থযাত্রীদের জন্য বিশ্রাম ও খাদ্যের ব্যবস্থা করত। সেখান থেকেই ধীরে ধীরে দানসাল মন্দিরের সীমানা ছাড়িয়ে সাধারণ মানুষের জীবনের অংশ হয়ে ওঠে।
আজ দানসাল কেবল বৌদ্ধদের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই। মুসলিম, খ্রিস্টান এবং হিন্দু সম্প্রদায়ের মানুষও এই উদ্যোগে অংশ নেন। কোথাও এক কাপ চা ও বিস্কুট, কোথাও আইসক্রিম, আবার কোথাও পূর্ণাঙ্গ মধ্যাহ্নভোজ-দানসালের রূপ নানা ধরনের। অনেক ক্ষেত্রে এটি সামাজিক উৎসবে পরিণত হয়, বহু মানুষ উৎসবের দিনে এক দানসাল থেকে অন্য দানসালে সপরিবারে ঘুরে বেড়ায়।
২০২২ সালে অর্থনৈতিক সংকটের সময় জ্বালানির লাইনে দীর্ঘ সময় অপেক্ষা করা মানুষদের খাবার ও পানীয় দেয়া হয়েছিল দানসালের আদর্শ থেকেই। এমনকি বিদেশেও এই সংস্কৃতির ছাপ দেখা যায়। সম্প্রতি মুম্বাইয়ে প্রচণ্ড গরমে বিপর্যস্ত মানুষদের জন্য শ্রীলঙ্কার কনস্যুলেট ঠান্ডা পানীয় বিতরণ করেছে।
আজকের পৃথিবীতে, যেখানে ব্যক্তিস্বার্থ প্রায়শই সামাজিক সম্পর্ককে ছাপিয়ে যায়, সেখানে শ্রীলঙ্কার দানসাল মনে করিয়ে দেয় এক পুরোনো সত্য-সহমর্মিতা কখনও পুরোনো হয় না। এক কাপ শরবত, এক প্যাকেট খাবার বা এক বোতল পানি হয়তো পৃথিবী বদলে দেয় না, কিন্তু তা অচেনা দুজন মানুষের মধ্যে এক মানবিক সেতুবন্ধন তৈরি করে। সেই কারণেই দানসাল শুধু একটি ধর্মীয় প্রথা নয়, এটি এক সমাজের আত্মপরিচয়।
ভাষান্তর: রুবাইয়া জেসমিন, কলকাতা প্রতিনিধি।




