বিশ্বের ধনীতম মানুষ জে. পল গেটি
আমি কখনোই নিজেকে অঢেল টাকার মালিক মনে করিনি

জে. পল গেটি—ছবি: সংগৃহীত
১৯৬০ সালের এক গ্রীষ্মের সন্ধ্যা। ইংল্যান্ডের সারে কাউন্টির ১৬ শতকের টিউডর স্থাপত্যের বিশাল প্রাসাদ ‘সাটন প্লেস’। যেন রূপকথার রাজপ্রাসাদ। চারদিকে আলো, অতিথিদের কোলাহল ও অভিজাত গাড়ির সারি। প্রায় দুই হাজার অতিথির সমাগম। সমাজের প্রভাবশালী ব্যক্তি, অভিজাত, তারকা—কে নেই সেখানে।
সেদিন ছিল নতুন বাড়িতে ওঠার আনন্দ উৎসব। সেই আয়োজনেই খরচ হয়েছিল প্রায় ১০ হাজার পাউন্ড। বর্তমান মূল্যে যা প্রায় ৪ লাখ ডলারের সমান।
অনুষ্ঠানটি আরও আলোচনায় আসে এক অপ্রীতিকর ঘটনার কারণে। ছবি তোলার সময় এক সংবাদ আলোকচিত্রী (ফটোগ্রাফার) অতিরিক্ত আগ্রাসী আচরণ করলে নিরাপত্তাকর্মীরা তাকে টেনে নিয়ে সুইমিংপুলে ফেলে দেন।
এই বিশাল আয়োজনের কেন্দ্রবিন্দু ছিলেন একজন মানুষ। নাম জে. পল গেটি। যিনি কয়েক বছরের মধ্যেই পৃথিবীর সবচেয়ে ধনী ব্যক্তি হিসেবে ইতিহাসে নাম লেখান। কিন্তু আশ্চর্যের বিষয়, এই মানুষটিই একদিন বলেছিলেন—‘আমি কখনোই মনে করিনি যে আমার হাতে অঢেল টাকা আছে।’
তেলের গন্ধে বদলে যাওয়া জীবন
জে. পল গেটির জন্ম কোনো রাজপরিবারে হয়নি। তার বাবা পরিশ্রম করে তেল ব্যবসা দাঁড় করিয়েছিলেন। ১৯০৩ সালে মাত্র পাঁচ হাজার ডলারে ওকলাহোমার প্রায় ১,১০০ একর জমির ইজারা নেন। সেখানেই মেলে তেলের বিশাল ভাণ্ডার। এই একটি সিদ্ধান্ত পুরো পরিবারের ভাগ্য বদলে দেয়।
ছোটবেলা থেকেই গেটি ব্যবসার পরিবেশে বড় হয়েছেন। বয়স মাত্র ২৪ বছর। নিজের মালিকানাধীন একটি জমিতে তেল পাওয়া গেল। সেখান থেকেই তিনি জীবনের প্রথম এক মিলিয়ন ডলার আয় করেন। তারপর আর পেছনে ফিরে তাকাতে হয়নি।
বিশ্বের সবচেয়ে ধনী মানুষ
১৯৬৬ সালে ‘গিনেস ওয়ার্ল্ড রেকর্ডস’ তাকে বিশ্বের সবচেয়ে ধনী মানুষ হিসেবে স্বীকৃতি দেয়। মৃত্যুর সময়, ১৯৭৬ সালে। তার সম্পদের পরিমাণ ছিল প্রায় ৪ বিলিয়ন ডলার। আজকের মূল্যে যা ২৩ বিলিয়ন ডলারেরও বেশি। লোকমুখে প্রচলিত ছিল, একজন সাধারণ মানুষ সারাজীবনে যত টাকা আয় করেন, গেটি প্রায় প্রতিদিনই তার চেয়ে বেশি আয় করতেন।
তার বিখ্যাত একটি উক্তি ছিল— ‘ভোরে উঠুন, কঠোর পরিশ্রম করুন, আর তেলের খনি খুঁজে বের করুন।’
কিন্তু সফল হলেন কীভাবে?
১৯৬৩ সালে বিবিসির জনপ্রিয় সাংবাদিক অ্যালান হুইকার তার সাক্ষাৎকার নেন। প্রশ্ন ছিল সহজ— ‘আপনি এত সফল হলেন কীভাবে?’ গেটির উত্তর ছিল অবাক করার মতো। তিনি বলেছিলেন, ‘আমি নিজেও ঠিক জানি না।’ তার ভাষায়, বড় সাফল্যের জন্য হয়তো ৩৭টি গুণ প্রয়োজন। কারও যদি ৩৫টি গুণ থাকে, তিনি সফল হতে পারেন। কিন্তু সেই বাকি দুই গুণ কী—তা তিনি নিজেও জানেন না।
তিনি আরও বলেছিলেন, ‘আমার মধ্যে এমন বিশেষ কোনো গুণ আছে বলে আমি মনে করি না, যা অন্যদের নেই। বরং নিজের সমালোচনাই বেশি করতেন। ইচ্ছা করত, আমি যদি আরও ভালোভাবে মানুষের সঙ্গে কথা বলতে পারতাম। আরও প্রাণবন্ত হতে পারতাম। অনেক সময় নিজেকে খুবই নিরস মানুষ বলে মনে হতো।’
বাবার প্রতি কৃতজ্ঞতা
নিজের সাফল্যের কৃতিত্ব তিনি পুরোপুরি নিজের কাঁধে নেননি। তিনি বলেছিলেন, ‘আমার বাবা একটি সফল ব্যবসা গড়ে তুলেছিলেন। আমি ছিলাম তার একমাত্র সন্তান। সেই ব্যবসার দায়িত্বই আমাকে নিতে হয়েছিল।’
তবে বাবার সঙ্গে সম্পর্ক সব সময় সহজ ছিল না। ধর্মপ্রাণ বাবা ছেলের ব্যক্তিগত জীবন নিয়ে সন্তুষ্ট ছিলেন না। কারণ গেটি একাধিকবার বিয়ে ও বিচ্ছেদ করেছিলেন। ১৯৩০ সালে বাবা মারা গেলে তার মোট সম্পদের বড় অংশ অন্যত্র দান করা হয়। গেটি পান মাত্র পাঁচ লাখ ডলার।
পৃথিবীর সবচেয়ে ধনী, কিন্তু সবচেয়ে কৃপণ?
গেটিকে নিয়ে সবচেয়ে বেশি যে গল্পটি ছড়িয়ে আছে, তা হলো—তিনি ছিলেন ভয়ংকর কৃপণ। তার বিশাল প্রাসাদে অতিথিদের জন্য বসানো ছিল ‘কয়েন দিয়ে চালানো টেলিফোন।’
অতিথিরা যেন বেশি দূরত্বের ফোন করে তার বিল না বাড়াতে পারেন। তিনি নিজেই বলেছিলেন—‘কুকুরের প্রদর্শনীতে প্রবেশমূল্য দুই-তিন শিলিং কমার অপেক্ষায় বাইরে দাঁড়িয়ে থাকতেন। রেস্তোরাঁয়ও যেতেন একটু দেরি করে। কারণ নির্দিষ্ট সময়ের আগে গেলে অর্কেস্ট্রার জন্য অতিরিক্ত টাকা দিতে হতো। তবু তিনি বলতেন—‘আমি কখনোই নিজেকে ধনী মনে করিনি। যদি সব ব্যবসা বিক্রি করে দিতাম, তাহলে হয়তো হাতে কিছু টাকা থাকত।’
প্রাসাদ, শিল্পকর্ম আর নিরাপত্তার দুর্গ
১৯৫৯ সালে তিনি ইংল্যান্ডের ঐতিহাসিক ‘সাটন প্লেস’ কিনে নেন। ৭২ কক্ষের এই প্রাসাদ একসময় ছিল ইংল্যান্ডের রাজা অষ্টম হেনরির গ্রীষ্মকালীন আবাস। গেটি সেটিকে শুধু বাড়ি হিসেবে রাখেননি। তিনি সেটিকে প্রায় দুর্গে পরিণত করেছিলেন। প্রতিটি কক্ষে নিরাপত্তা ব্যবস্থা। ১৪টি বাথরুমও ছিল নিরাপত্তা নেটওয়ার্কের আওতায়। জানালা-দরজায় বিশেষ সুরক্ষা। চারদিকে ‘প্রবেশ নিষেধ’ বোর্ড।
৭০০ একর জমি। দুটি সুইমিংপুল। ৩০টি কটেজ। টেনিস কোর্ট। ট্রাউট মাছের ঝরনা। এমনকি পাহারায় থাকত জার্মান শেফার্ড কুকুর। আর ছিল একটি পোষা সিংহ। নাম—‘নেরো’।
তিনি কাকে ভয় পেতেন?
সাংবাদিক জানতে চেয়েছিলেন—আপনার এত নিরাপত্তা কেন? গেটি সরাসরি উত্তর দেননি। শুধু বলেছিলেন, ‘বিশেষ কাউকে ভয় পাই না। তবে সতর্ক থাকা দরকার।’ পরে যোগ করেন, কেউ যদি এসে জায়গাটা উড়িয়ে দিতে চায়?
তার নাতি জন পল গেটি পরে বলেছিলেন, দাদু সব সময় ভয় পেতেন। তাই তিনি প্রাসাদের ভেতরেই থাকতেন।
নাতির অপহরণ
১৯৭৩ সালে ভয়টি বাস্তব হয়ে যায়। তার ১৬ বছর বয়সী নাতি জন পল গেটি ইতালিতে অপহৃত হন। মুক্তিপণ চাওয়া হয় ১ কোটি ৬০ লাখ ডলার।
গেটি টাকা দিতে রাজি হননি। তার বিখ্যাত মন্তব্য ছিল—‘আমার আরও ১৪ জন নাতি-নাতনি আছে। আজ যদি এক পয়সাও দিই, কাল সবাই অপহৃত হবে।’
পাঁচ মাস বন্দি থাকার পর অপহরণকারীরা নাতির একটি কান কেটে সংবাদপত্রে পাঠায়। এরপর অবশেষে মুক্তিপণ দেওয়া হয়। তবে কত টাকা গেটি নিজে দিয়েছিলেন, তা কখনো প্রকাশ করা হয়নি।
টাকা কি সুখ কিনতে পারে?
এই প্রশ্নটি বহুবার শুনেছেন গেটি। তার মুখে হাসি খুব কমই দেখা যেত। সাংবাদিক একবার সরাসরি বলেছিলেন—‘আপনাকে এত বিষণ্ন দেখায় যে মানুষ বিশ্বাসই করতে চায় না, টাকা আপনাকে সুখ দিয়েছে।’ গেটি কিছুক্ষণ চুপ ছিলেন। তারপর বললেন, ‘বাবা মারা যাওয়ার পর থেকেই ব্যবসার সব দায়িত্ব আমার ওপর আসে। তারপর থেকে আগের মতো হালকা মন নিয়ে আর বাঁচতে পারিনি।’
তিনি আরও বলেছিলেন, ‘বড় সম্পদের সঙ্গে বড় দায়িত্বও আসে। আর সেই দায়িত্ব আনন্দ কেড়ে নেয়।’
সবচেয়ে সুখের মুহূর্ত
জীবনের সবচেয়ে আনন্দের সময় কোনটি? এই প্রশ্নের উত্তরে তিনি এমন একটি কথা বলেছিলেন, যা আজও মানুষের মনে দাগ কেটে যায়।
তিনি বলেছিলেন, ‘আমার জীবনের সবচেয়ে সুন্দর মুহূর্তগুলোর অনেকগুলোতেই এক পয়সাও খরচ হয়নি।’ তারপর স্মৃতির দরজা খুলে বলেছিলেন—
‘সমুদ্রের ঢেউয়ের অপেক্ষায় সার্ফবোর্ড নিয়ে বসে থাকা… বিশাল একটি ঢেউ আসবে… সেটিতে চড়ে তীরে ফিরে আসা… সেখানে কোনো টাকা লাগে না।’
তার শেষ কথাটি ছিল আরও গভীর— ‘ঢেউ বিনামূল্যে আসে। সূর্যের আলোও বিনামূল্যে পাওয়া যায়।’
জে. পল গেটির জীবন এক অদ্ভুত বৈপরীত্যের গল্প। পৃথিবীর সবচেয়ে ধনী মানুষ হয়েও তিনি নিজেকে কখনো ধনী ভাবেননি। শত কোটি ডলারের মালিক হয়েও প্রতিটি খরচ হিসাব করে করতেন। বিশাল প্রাসাদে থেকেও নিজেকে নিরাপদ মনে করতেন না। আর শেষ পর্যন্ত বুঝেছিলেন—জীবনের সবচেয়ে বড় আনন্দ কখনো টাকায় কেনা যায় না। কখনো কখনো সমুদ্রের একটি ঢেউ, কিংবা সকালের রোদই পৃথিবীর সব সম্পদের চেয়েও মূল্যবান হয়ে ওঠে।
জে. পল গেটি ১৫ ডিসেম্বর ১৯৭৬ সালে ইংল্যান্ডের সারের সাটন প্লেস প্রাসাদে ৮৩ বছর বয়সে মারা যান। মৃত্যুর সময় তিনি বিশ্বের অন্যতম ধনী ব্যক্তি ছিলেন।









