হুতিরা কি লোহিত সাগর বন্ধ করে দিতে পারবে?

ইয়েমেনের আল-সালিফ উপকূলে নোঙর করে রাখা হুতি নিয়ন্ত্রিত গ্যালাক্সি লিডার বাণিজ্যিক জাহাজের পাশে সৈকতে দাঁড়িয়ে আছেন সশস্ত্র যোদ্ধারা। ফাইল ছবি : রয়টার্স
ইয়েমেনে কৌশলগত নিয়ন্ত্রণ আরও বাড়িয়ে নিচ্ছে হুতিরা। শুক্রবার পর্যন্ত পাওয়া তথ্য অনুযায়ী, দেশটির পুরো লোহিত সাগর উপকূল এখন তাদের নিয়ন্ত্রণে। গুরুত্বপূর্ণ বন্দরনগরী মোখাও দখলে নিয়েছে তারা। এর ফলে কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ বাব আল-মান্দেব প্রণালির ওপর হুতিদের নিয়ন্ত্রণ আরও জোরালো হয়েছে।
এর আগে, বৃহস্পতিবার মোখা দখল করে হুতিরা। এতে সৌদি আরব-সমর্থিত ইয়েমেন সরকারের ওপর বড় ধাক্কা এসেছে।
বিশ্লেষকদের মতে, ফেব্রুয়ারিতে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল ইরানের বিরুদ্ধে যুদ্ধ শুরুর পর মধ্যপ্রাচ্যে এটিই সবচেয়ে বড় পরিবর্তনগুলোর একটি।
হুতিদের এই অগ্রযাত্রা সবচেয়ে বেশি বিপাকে ফেলতে পারে সৌদি আরবকে। বিশেষ করে দেশটির তেল রপ্তানি ঝুঁকিতে পড়তে পারে।
এর কারণ, হুতিরা চলতি বছরের শুরুতেই সৌদি পতাকাবাহী জাহাজে অবরোধ ঘোষণা করেছে। এখন ইয়েমেনের পুরো লোহিত সাগর উপকূল তাদের নিয়ন্ত্রণে। বাব আল-মান্দেবও তাদের নিয়ন্ত্রণে চলে এসেছে।
হরমুজ প্রণালিতে ইরানের অবরোধের কারণে সৌদি আরব এখন তেল রপ্তানির জন্য লোহিত সাগরের পথের ওপর আরও বেশি নির্ভর করছে। ফলে বাব আল-মান্দেবও যদি ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে ওঠে, তাহলে সৌদির তেল রপ্তানিতে বড় ধাক্কা আসতে পারে।
এখন প্রশ্ন হচ্ছে, হুতিরা কি শেষ পর্যন্ত পুরো লোহিত সাগর নিয়ন্ত্রণ করতে পারবে?
ইয়েমেনে আসলে কী হচ্ছে
ইয়েমেনে যুদ্ধ চলছে ২০১৪ সাল থেকে। ওই বছর হুতিরা রাজধানী সানা দখল করে। একই সঙ্গে তারা বন্দরনগরী হোদেইদাহও নিয়ন্ত্রণে নেয়। এর ফলে ইয়েমেনে আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত সরকারকে ক্ষমতা ছাড়তে হয়।
ইরানের সমর্থন নিয়ে হুতিরা এরপর সৌদি আরব-সমর্থিত জোটের বিরুদ্ধে লড়াই শুরু করে। ওই জোটে উপসাগরীয় কয়েকটি দেশ ছিল। তারা ইয়েমেনের সরকারকে সমর্থন করছিল। ওই সরকারের ঘাঁটি এডেনে।
২০১৫ সালে সৌদি আরব সরাসরি যুদ্ধে নামে। তাদের লক্ষ্য ছিল ইয়েমেনের সরকারকে আবার ক্ষমতায় ফেরানো। একই সঙ্গে ইরানের প্রভাব ঠেকানো।
২০২২ সালে জাতিসংঘের মধ্যস্থতায় একটি যুদ্ধবিরতি হয়। এতে বড় ধরনের লড়াই থামে। তবে এরপরও বিচ্ছিন্ন সংঘর্ষ হয়েছে।
গত সপ্তাহে আবার বড় আকারে লড়াই শুরু হয়। কয়েক বছরের মধ্যে এটিই সবচেয়ে তীব্র সংঘর্ষগুলোর একটি।
হুতিদের লক্ষ্য ছিল লোহিত সাগরের উপকূল দখল করা। ইয়েমেনের সরকারি বাহিনীও পাল্টা হামলা চালায়। কিন্তু শেষ পর্যন্ত হুতিরাই দ্রুত এগিয়ে যায়।
বাব আল-মান্দেব কেন এত গুরুত্বপূর্ণ
বাব আল-মান্দেব খুবই গুরুত্বপূর্ণ একটি সমুদ্রপথ। এটি লোহিত সাগর ও সুয়েজ খালকে এডেন উপসাগরের সঙ্গে যুক্ত করেছে।
বিশ্বের প্রায় ১২ শতাংশ বাণিজ্য প্রতিদিন এই পথ দিয়ে যায়।
হরমুজ প্রণালি বন্ধ হয়ে যাওয়ার পর বাব আল-মান্দেবের গুরুত্ব আরও বেড়েছে। যুদ্ধ শুরুর আগে বিশ্বের প্রায় ২০ শতাংশ জ্বালানি সরবরাহ হরমুজ প্রণালি দিয়ে যেত।
এখন ওই পথ বন্ধ থাকায় অনেক জাহাজের জন্য লোহিত সাগরের পথ আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
কিন্তু এই পথের নিয়ন্ত্রণ এখন হুতিদের হাতে আরও শক্ত হচ্ছে।
সৌদি আরবের জন্য এর অর্থ কী
হুতিদের হাতে বাব আল-মান্দেবের পুরো নিয়ন্ত্রণ চলে গেলে বিশ্বজুড়ে জ্বালানি সংকট আরও বাড়তে পারে। তেলের সরবরাহ কমতে পারে। দামও বাড়তে পারে। সৌদি আরবের জন্য ঝুঁকি আরও বড়।
হরমুজ প্রণালি বন্ধ হওয়ার পর সৌদি আরব তেল রপ্তানির বিকল্প পথ হিসেবে পূর্ব-পশ্চিম তেল পাইপলাইন ব্যবহার বাড়িয়েছে।
এই পাইপলাইনটি সৌদির আবকাইক তেলক্ষেত্র থেকে দেশটির পশ্চিমাঞ্চলের ইয়ানবু বন্দরে গেছে। সেখান থেকে তেল লোহিত সাগর দিয়ে পাঠানো যায়।
পাইপলাইনটি ১৯৮০-এর দশক থেকেই চালু আছে। হরমুজ প্রণালিতে কোনো সমস্যা হলে তেল রপ্তানি সচল রাখার জন্যই এটি তৈরি করা হয়েছিল।
২০১৯ সালে হুতিদের ড্রোন হামলার সময় এই পাইপলাইন সাময়িকভাবে বন্ধ করতে হয়েছিল।
এবার যুদ্ধ শুরুর পর সৌদি আরব পাইপলাইনটির সক্ষমতা বাড়িয়ে পূর্ণ ক্ষমতায় চালু করেছে। এখন প্রতিদিন সর্বোচ্চ ৭০ লাখ ব্যারেল তেল দেশের পূর্বাঞ্চল থেকে লোহিত সাগর উপকূলে পাঠানো সম্ভব। যুদ্ধের আগে এই সক্ষমতা ছিল ৫০ লাখ ব্যারেল।
ফলে যুদ্ধ শুরুর আগের তুলনায় সৌদি আরবের ২১ শতাংশ বেশি তেল বাব আল-মান্দেব দিয়ে পাঠানো হচ্ছে।
এখন হুতিরা যদি এই সমুদ্রপথেও হামলা বাড়ায়, তাহলে সৌদির তেল রপ্তানি আরও বড় ঝুঁকিতে পড়বে।
ইতিমধ্যেই সৌদির তেলবাহী ট্যাংকার ও জ্বালানি অবকাঠামোয় হামলা চালিয়েছে হুতিরা।
শুক্রবার পাওয়া কিছু ছবিতে পূর্ব-পশ্চিম তেল পাইপলাইনের কাছে ধোঁয়া দেখা গেছে। তবে পাইপলাইনে হামলা হয়েছে কি না, সৌদি কর্তৃপক্ষ তা নিশ্চিত করেনি।
ইরানের লাভ কোথায়
হুতিদের এই অগ্রযাত্রা ইরানের জন্যও বড় সুবিধা তৈরি করেছে।
বিশ্লেষকদের মতে, হুতিরা যুক্তরাষ্ট্র-ইরান যুদ্ধের নতুন একটি বড় ফ্রন্ট খুলতে চাইছে। এর মাধ্যমে তারা তেহরানের ওপর চাপ কমাতে সাহায্য করতে পারে।
হরমুজ প্রণালির নিয়ন্ত্রণ নিয়ে ইরান ও যুক্তরাষ্ট্র দুই পক্ষই নিজেদের অবস্থান শক্ত বলে দাবি করছে। তবে জাহাজ চলাচল অনেক কমে যাওয়ায় পর্যবেক্ষকদের মতে, বাস্তবে ইরানই সেখানে বেশি সুবিধাজনক অবস্থানে আছে।
এখন বাব আল-মান্দেবেও হুতিদের নিয়ন্ত্রণ আরও শক্ত হয়েছে।
অস্ট্রেলিয়ান ন্যাশনাল ইউনিভার্সিটির আন্তর্জাতিক সম্পর্কের অধ্যাপক আলম সালেহের মতে, এর অর্থ হলো ইরান এখন হরমুজের পাশাপাশি আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ সমুদ্রপথেও প্রভাব তৈরি করেছে।
তিনি বলেছেন, ‘এটি মূলত ইরানের হাতে হরমুজ প্রণালির সঙ্গে আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ পথের নিয়ন্ত্রণ এনে দিয়েছে।’
এর ফলে যুক্তরাষ্ট্রের ওপর চাপও বাড়ছে।
ইরান যুদ্ধের কারণে যুক্তরাষ্ট্রে জ্বালানি ও খাদ্যের দাম বেড়েছে। এতে যুদ্ধের জনপ্রিয়তা কমেছে। নভেম্বরের মধ্যবর্তী নির্বাচনে এর প্রভাব পড়তে পারে। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের রিপাবলিকান প্রার্থীদের ক্ষোভের মুখে পড়ার আশঙ্কাও রয়েছে।
এ সপ্তাহে ট্রাম্প স্বীকার করেছেন, নভেম্বরের নির্বাচনের আগে যুদ্ধ শেষ হওয়ার সম্ভাবনা কম।
ওয়াশিংটন এখন ইরানের ওপর হামলার পাশাপাশি অর্থনৈতিক চাপ বাড়ানোর কৌশল নিয়েছে। তাদের লক্ষ্য, চাপের মুখে তেহরানকে সমঝোতায় আনা।
কিন্তু সময় দ্রুত ফুরিয়ে যাচ্ছে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকেরা।
আলম সালেহের মতে, হুতিদের এই জয় মধ্যপ্রাচ্যে শক্তির ভারসাম্য আরও ইরানের দিকে ঠেলে দিয়েছে। একই সঙ্গে চীন ও রাশিয়ার মতো দেশগুলোর কাছেও এটি একটি বার্তা দিয়েছে।
বার্তাটি হলো, মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক প্রভাব আগের তুলনায় কমছে।
তার মতে, ইরান এখন বিশ্ববাজারের তেল ও জ্বালানি নিরাপত্তাকে চাপ তৈরির হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করছে। বাব আল-মান্দেব হুতিদের নিয়ন্ত্রণে চলে যাওয়া তেহরানের জন্য বড় সুবিধা।
হুতিরা কি লোহিত সাগরের নিয়ন্ত্রণ ধরে রাখতে পারবে
হুতিদের দ্রুত সাফল্যের পেছনে শুধু তাদের সামরিক শক্তি কাজ করেনি। ইয়েমেনের সরকারি বাহিনীর দুর্বলতাও বড় কারণ।
ইয়েমেনের সরকারি বাহিনীতে আনুমানিক ৩ লাখ সদস্য রয়েছে। হুতিদের রয়েছে প্রায় ২ লাখ ৫০ হাজার যোদ্ধা।
তারপরও সরকারি বাহিনী দ্রুত ভেঙে পড়েছে।
ইয়েমেনের সামরিক বাহিনীর ভেতরের বিভাজন বড় সমস্যা। সৌদি আরবের চাপও পরিস্থিতিকে আরও জটিল করেছে। ফলে সরকারি বাহিনীর বিভিন্ন অংশের মধ্যে প্রয়োজনীয় সমন্বয় নেই।
অন্যদিকে হুতিরা দ্রুত সিদ্ধান্ত নিতে পারে। তারা পরিস্থিতির সঙ্গে দ্রুত নিজেদের কৌশল বদলাতে পারে।
দোহা ইনস্টিটিউট ফর গ্র্যাজুয়েট স্টাডিজের অধ্যাপক মোহামাদ এলমাসরি বলেছেন, প্রায় এক দশক আগে সৌদি বাহিনী যে হুতিদের বিরুদ্ধে লড়েছিল, বর্তমান হুতিরা তার চেয়ে অনেক বেশি শক্তিশালী।
গত কয়েক বছরে ইরানের কাছ থেকে পাওয়া অস্ত্রও তাদের শক্তি বাড়িয়েছে। এসব অস্ত্রের মধ্যে ক্ষেপণাস্ত্র, ড্রোন ও আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা রয়েছে।
তবে সবকিছু হুতিদের পক্ষে নয়।
কিংস কলেজ লন্ডনের সহযোগী অধ্যাপক আন্দ্রেয়াস ক্রিগ মনে করেন, সামরিকভাবে দ্রুত এগোলেও শাসন পরিচালনায় হুতিদের বড় দুর্বলতা রয়েছে।
তার মতে, বাব আল-মান্দেবে দীর্ঘমেয়াদি অবরোধ চালিয়ে যাওয়ার মতো সক্ষমতা তাদের নাও থাকতে পারে।
তিনি মনে করেন, হুতিদের এই সাফল্যের কারণ শুধু তাদের শক্তি নয়। সৌদি-সমর্থিত জোটের শক্তিকে বেশি করে মূল্যায়ন করাও বড় ভুল হয়েছে।
তবে আরেকটি বিষয় গুরুত্বপূর্ণ।
হুতিদের পুরো বাব আল-মান্দেব বা পুরো লোহিত সাগর দখলে রাখার দরকার নেই। শুধু এই পথকে ঝুঁকিপূর্ণ করে তুলতে পারলেই তারা বড় প্রভাব ফেলতে পারবে।
কারণ কোনো সমুদ্রপথে হামলার আশঙ্কা তৈরি হলেই জাহাজ কোম্পানি ও বিমা প্রতিষ্ঠানগুলো সেই পথ এড়িয়ে চলতে পারে।
ফলে জাহাজ চলাচল কমে যেতে পারে। তেল ও পণ্যের সরবরাহে চাপ তৈরি হতে পারে। দামও বাড়তে পারে।
সৌদি আরব কি হুতিদের থামাতে পারবে
এখন সবচেয়ে বড় প্রশ্ন এটিই। গত ২৪ ঘণ্টায় সৌদি বাহিনী হুতিদের নিয়ন্ত্রিত বিভিন্ন এলাকায় কয়েক ডজন ক্ষেপণাস্ত্র ছুড়েছে। মোখাতেও হামলা হয়েছে। কিন্তু এতে হুতিদের অগ্রযাত্রা থামেনি।
সৌদি আরবের বিমান শক্তি যথেষ্ট। কিন্তু শুধু বিমান হামলা দিয়ে হুতিদের নিয়ন্ত্রণে আনা কতটা সম্ভব, তা এখনো পরিষ্কার নয়।
সৌদি আরব, পাকিস্তান ও তুরস্কের মধ্যে সম্প্রতি একটি প্রতিরক্ষা চুক্তি হয়েছে। তবে বিশ্লেষকদের মতে, এই চুক্তি এখনই কার্যকর হওয়ার সম্ভাবনা কম।
তিন দেশই ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের চলমান যুদ্ধ আরও বড় আকার নিক—এটা চায় না।
এদিকে সৌদি আরব যুক্তরাষ্ট্রের কাছ থেকেও সরাসরি সামরিক সহায়তা চেয়েছে বলে জানিয়েছে মার্কিন সংবাদমাধ্যম অ্যাক্সিওস।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, সৌদি যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সালমান বৃহস্পতিবার দুইবার ট্রাম্পের সঙ্গে ফোনে কথা বলেছেন। তিনি হুতিদের বিরুদ্ধে মার্কিন বিমান হামলার অনুরোধ করেন।
তবে ট্রাম্প সেই অনুরোধ প্রত্যাখ্যান করেছেন। ফলে এখন সৌদি আরবকে অনেকটাই নিজের শক্তির ওপর নির্ভর করতে হচ্ছে।
আর হুতিরা যদি বাব আল-মান্দেবের নিয়ন্ত্রণ ধরে রাখতে পারে, তাহলে ইয়েমেনের যুদ্ধ শুধু ইয়েমেনের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকবে না।
হরমুজ প্রণালির পর আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ সমুদ্রপথ ঝুঁকিতে পড়বে। এতে বিশ্ববাজারে তেল সরবরাহ ও দামের ওপর নতুন চাপ তৈরি হতে পারে।
সবচেয়ে বড় কথা, মধ্যপ্রাচ্যের চলমান যুদ্ধের ভারসাম্য আরও এক ধাপ ইরান ও তার মিত্রদের দিকে চলে যেতে পারে।
সূত্র : আলজাজিরা








